ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে অস্ত্র পরিদর্শন অনুষ্ঠানে দেশী-বিদেশী শত শত সাংবাদিকদের সামনে একজন ক্ষুদে মুক্তিজদ্ধাকে কুলে নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “এরাই আমার মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সকল কৃতিত্ব, সকল প্রশংসা এদের। ঐদিন মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন- আমি তোমাদেরকে সালাম জানাই, ত্রিশ লক্ষ মা, ভাই, বোন শহীদ হয়েছে, আমি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আমি তোমাদেরকে অস্ত্র দিয়ে যেতে পারিনি, শুধু হুকুম দিয়ে গিয়েছিলাম। তোমরা হানাদার বাহিনীর হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছ, তোমাদের তুলনা হয়না। তোমাদের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক, রক্তের বন্ধন। তোমরাই সত্যিকারের দেশ গঠনের উপযুক্ত সৈনিক। সরকারী কর্মচারী এবং পুলিশের কথা আমি শুনব না। তোমরা যে খবর দিবা তাই আমি সত্য বলে ধরে নেব। সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ দেব, যারা স্কুল কলেজে পড়তে চাই সরকার তাদের সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে, যারা চাকরী চাই তাঁরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরী পাবে। যারা কৃষি কাজ সহ অন্যান্য কাজ করতে চাই তাদেরকে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়া ছাড়া জাতি বড় হতে পারে না।

সে সৌভাগ্য আমার হয়নি, কারন- স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স সবে দুই আড়াই বছর। তখনো মায়ের বুকের দুধ পান করছি, যুদ্ধ কাকে বলে বুঝার কথা নয়। আস্তে আস্তে মায়ের বুকের দুধ ছেড়ে ভাত খেতে শিখলাম। মাকে মা ডাকতে শিখলাম। মা কি বলছে সেটা বুঝতে শিখলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক বছর পরও গ্রামীণ মহিলারা কয়েকজন একসাথে জড়ো হলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলা শুরু করতেন। মায়ের আঁচল ধরে বসে থাকতাম বলে মা-দের কথাগুলো শুনতাম। শুনতে শুনতে শুনার আগ্রহটা বেড়ে যাচ্ছিল, যতই শুনি ততই শুনতে ইচ্ছে করতো। একসময় মায়ের কাছে বায়না ধরতাম “মা যুদ্ধের কথা বল না, সেদিন কি হয়েছিল” তখন মা বলতে শুরু করতেন, জানিস তখন কি ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল, চারিদিকে প্রচণ্ড গুলাগুলি, আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে, একের পর এক পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প, কামান, গুলাবারুদ ধ্বংস করছে। এলাকার সাধারণ মানুষ নারী-পুরুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে এই গ্রাম থেকে ঐ গ্রামে। তুই তখন দুধের শিশু, তুকে বুকে জড়িয়ে গ্রামের অনেক মানুষের সাথে রাতের অন্ধকারে আমিও ছুটেছি, গেছি এই গ্রাম থেকে ঐ গ্রামে, তুর নানার বাড়ীতে। পথে যখন প্রচণ্ড গুলাগুলি শুরু হয়ে জেত তখন তুকে বুকে জড়িয়ে মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে থাকতাম আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম “হে আল্লাহ তুমি আমার সন্তানকে বাঁচাও, প্রয়োজনে আমার গায়ে গুলি লাগুক, কিন্তু আমার সন্তানের গায়ে যেন গুলি না লাগে” কিন্তু কোথায় যাব, কোথাও তো নিরাপদ নয়, সব গ্রামের একই অবস্থা। অবশেষে বাড়ীতে ফিরে পিচনের পুকুরে বাড়ীর পুরুষরা একটা গর্ত কুঁড়ে বাঙ্কার বানিয়েছেন, যেটা একেবারে কবরের মত, গর্তের উপর বাঁশের টেঁস আর বেড়া দিয়ে তার উপর সামান্য মাটি আর ঘাস দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন, যেন পাকিস্তানী বাহিনীরা বাড়ীতে ঢুকে পড়লেও বুঝতে না পারে এখানে কোন মানুষ আছে। বাঙ্কারের ভিতর ঢুকা আর বাহির হওয়ার জন্য সামান্য একটা পথ রেখেছেন। সেই পথ দিয়ে বাহির হতাম আর ঢুকতাম। এই বাঙ্কার নামক কবরে কাটালাম দীর্ঘ নয় মাস। যখন যুদ্ধ শেষ হল, তখন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বাড়ীতে আসতে লাগল তখন কি যে, আনন্দ লেগেছিল, ভাষায় বুঝাতে পারব না। মায়ের মুখে স্বাধীনতার ইতিহাস শুনতে শুনতে বড় হলাম। আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার করলাম। মায়ের বলার বাইরেও স্বাধীনতা যুদ্ধের আরও অনেক কাহিনী শুনলাম জানলাম। জানলাম আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, দেশপ্রেম, আত্মদানের কথা। জানলাম স্বাধীনতা যুদ্ধে আ’লীগের নেতৃত্বের কথা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতীর জনক বংবন্ধুর অবদানের কথা। বুঝলাম মুক্তিযোদ্ধাদের অকাতরে আত্মদানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল… একটি স্বাধীন দেশ, একটি পতাকা, সুসংহত গণতন্ত্র, দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার। এর বাইরে তাঁরা কিছুই চায়নি। আজো চাচ্ছেনা আমার বিশ্বাস।

মুক্তিযোদ্ধারা যা চেয়েছেন তা আমাদেরকে দিয়েছেন কিন্তু বিনিময়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কি দিয়েছি সেটা ভাবতে গেলে লজ্জা লাগে, নিজের উপর ঘৃণা হয়। যে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন।

কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে কোন কটূক্তি, অবহেলা সহ্য করা হবে না।

জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দিয়েছেন। আজ জাতীর জনক বেঁচে নেই। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী আ’লীগ সরকার ক্ষমতায়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিয়ে জাচ্ছেন। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। দেশের স্বাধীনতার পক্ষের মানুষরাও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করেন। এরপরও মুক্তিযোদ্ধারা কেন আত্মহত্যা করছে, সমস্যা কোথায়?

অতীতের কথা বাদ দিলাম চলতি বছরে গোপালগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম খান বিষ পানে আত্মহত্যা করেছেন, কারন বিভিন্ন কারনে হতাশাগ্রস্থ। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খান বিষ পানে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার কারন চিরকুটে লিখে গেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের গলাধাক্কা খাওয়ার অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। অথচ ঐ সচিব বলেছেন তিনি কিছুই জানেন না। তার কার্যালয়ে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চাক্তাই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা অরুন বিকাশ দাশ বিষ পানে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার কারন চিরকুটে লিখে গেছে ‘মুক্তিযুদ্ধে জিতে গেছি, কিন্তু জীবনযুদ্ধে হেরে গেছি, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আজ যখন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, একের পর এক ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে, তখনই একের পর এক মুক্তিযোদ্ধা জীবনযুদ্ধে হেরে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছেন। যুদ্ধাপরাধীদের জন্য কাঁদার মানুষের অভাব নাই এদেশে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাঁদার কেউ নাই। যুদ্ধাপরাধীরা এদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, মুক্তিযোদ্ধারা অনাহারে, দিন কাটাচ্ছে, অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীরা বিলাস বহুল গাড়ীতে চলাচল করছে, মুক্তিযোদ্ধারা রিক্সা চালাচ্ছে কিংবা ভিক্ষা করছে। যুদ্ধাপরাধীরা আরাম আয়েসে খেয়ে আনন্দ ফুর্তি করছে, মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন কারনে হতাশায় আত্মহত্যা করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি একেমন শ্রদ্ধা আমাদের, একেমন সম্মান। আমার বুজে আসে না।

কিছুদিন আগে একজন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ব্যক্তিগত একটা কাজ নিয়ে এসেছিলেন আমার কাছে। আমি যত্নের সাথে তার কাজটা করে দিলাম। কাজ শেষে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন কত টাকা দিতে হবে। তখন আমি বললাম, মাপ করবেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন কাজ করলে আমি পারিশ্রমিক গ্রহণ করি না। সেই নীতিটা আমার বিগত ১০ বছর আগে থেকে। তিনি অবাক নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখ জোরা চলচল করছে। মনে হচ্ছে চোখ থেকে এখনই বর্ষার বারিধারা ঝরবে। কিছু বললাম না, চাচা সম্বোধন করে একটা সালাম দিলাম। বললাম যে কোন সময় আপনার এই বিষয়ে কোন কাজ থাকলে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমার যতই ব্যস্ততা থাকুক আপনার কাজ আগে করে দেব। চাচা আমাকে যা বললেন আমার চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে মুক্তিযোদ্ধাদের কেন এই করুণ কাহিনী শুনতে হবে? কেন মুক্তিযোদ্ধারা আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেবে? এই দায় আমার আপনার নয় কি? পরিশেষে বলছি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হউক। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে যা বলে গেছেন তা বাস্তবায়ন করা হউক। এই প্রত্যাশাই রইল।