ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

বর্তমানে পৃথিবীর দেশে দেশে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে । সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও মুক্ত সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকরা সোচ্চার। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হবেন এটা জেনেও অনেকে সাংবাদিকতা পেশায় আসছেন । ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়া সত্ত্বেও অনেকে সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশ সেবায় ভূমিকা রাখতে গিয়ে চরম মূল্য দেন নানাভাবে। নব প্রজন্মের বিপুল সংখ্যক নতুন মুখ সরকারি-বেসরকারি উচ্চ বেতনের চাকরি না করে সাংবাদিকতা পেশায় এগিয়ে আসছেন। গত দুই দশকে দেশে অনেক নতুন পত্রিকা বের হয়েছে। বিকাশ ঘটেছে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার। ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে রেডিও-টিভি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে । রেডিও-টিভিতে এখন রিপোর্টিং ও বিশেষ প্রতিবেদন ও টক শো চালু হয়েছে । সাংবাদিকতায় প্রতিযোগিতাও বেড়েছে অনেক। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করে নতুন মুখ যারা সাংবাদিকতায় আসছেন তারা সাংবাদিকতাকে একটি দায়িত্বশীল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন বলে ধারণা করা হয়। সেই সূত্র থেকে জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারি হতে ৩০ এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে বাংলাদেশের দুইজন সাংবাদিক নিহত হন বাসভবনে, অপর একজন সড়ক দুর্ঘটনায় । গত ২১ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২৩০৭ জন গত ১২ বছরে ১০৩৬ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন । গত বছর ২০১১ সালে ১০৩ জন সাংবাদিক নিহত হন। আর বাংলাদেশে? বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নতুন কোনো বিষয়ও নয়। যুগ যুগ ধরে এদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে । ১৭৮০ সালে বেঙ্গল গেজেটে জেমস অগাস্টাস হিকি তৎকালীন ইংরেজ সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে হিকিকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। ১৭৮১ সালে তাকে দন্ড দেয়া হয়। তৎকালীন সরকার ১৭৮২ সালে বেঙ্গল গেজেট পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেন এবং প্রেস বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পে কথা বলার কারণে ১৯০৬ সালে মৌলভী মুজিবুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত দি মুসলমান পত্রিকাকে অনেক ধকল সহ্য করতে হয় ।

১৯১৩ সালে ইংরেজ সরকার পত্রিকাটির বেশ কিছু সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করেন। ১৯২২ সালের ২২ অক্টোবর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত ধূমকেতু পত্রিকায় দুটি রচনা এবং মাওলানা আকরাম খাঁর ১৯২০ সালে সেবক নামে একটি বাংলা পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করায় তাকে এক বছর দন্ড ভোগ করেতে হয় । তিনি তখন সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন । পাকিস্তান আমলের কথা আপনাদের অনেকেরই জানা আছে। ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের সমালোচনা করায় সরকার অবজারভার পত্রিকা নিষিদ্ধ করেছিলেন । ১৯৬৬ সালের জুন মাসে ডিফেন্স অব পাকিসত্মান অ্যাক্ট নামের একটি আইনের বলে ইত্তেফাক বন্ধ ঘোষণা করে তৎকালীন সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয় । মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকহানাদার বাহিনী এদেশে সাংবাদিক নিধন অভিযান চালায় । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পুড়িয়ে দেয়া হয় ইত্তেফাক, সংবাদ ও পিপলস অফিস । বর্তমান জাতীয় প্রেস কাবে নিপে করা হয় মর্টার শেল। সংবাদ অফিসে আক্রমণের ফলে মারা যান সাংবাদিক শহীদ সাবের । মক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের সাংবাদিকদের হত্যা করা হয় নির্বিচারে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সব সরকারের আমলে সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা রাজধানীর চেয়ে বেশি ঘটছে জেলা -উপজেলা পর্যায়ে। সাংবাদিক নির্যাতন -নিপীড়ন শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন । এই হলো ইতিহাস। এই ইতিহাসের রঙধনু নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে আমরা আমাদের আগামীকে গড়ে তুলতে চাই সুন্দর সকালের মত করে। আর তাই মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সাংবাদিকরা রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য জীবন যুদ্ধে নামতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত তাদেরকেই। আন্দোলন সংগ্রাম আর রাতদিন পরিশ্রমের পর যারা গড়ে তোলেন নতুন আলোর বাংলাদেশ; সম্প্রতি সেই তাদের অধিকার আদায়ের আপাতত তিমির রাত কাটছে ‘শিগগিরই অষ্টম ওয়েজ বোর্ড’ পেতে যাচ্ছে তারা। সংবাদপত্রেই সাংবাদকদের খবর এসেছে ঠিক এভাবে, সংবাদপত্রের কর্মীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে শিগগিরই অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সদস্যরা গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অষ্টম ওয়েজ বোর্ড প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অতি দ্র“ত’ অষ্টম ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করা হবে। এটা হয়ে যাবে। আমরা এটা করে দেব। ওয়েজ বোর্ড বাদ থাকবে কেন? আমরা তো সবই করে দিয়েছি। এটাও করে দেব।’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ প্রধানমন্ত্রীকে জানান, অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠনের জন্য সব কিছুই চূড়ান্ত হয়ে আছে। শুধু মালিক পরে প্রতিনিধিদের নাম পাওয়া যাচ্ছে না বলে বোর্ড ঘোষণা করা যাচ্ছে না। তথ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বলেন, ‘মালিক পক্ষ নাম না দিলে আমরা দিয়ে দেব।’ অসচ্ছল সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য ‘সাংবাদিক সহায়তা ভাতা/অনুদান নীতিমালা-২০১২’ প্রণয়নের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে জানান তথ্যমন্ত্রী। এই নীতিমালার আওতায় সাংবাদিকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নকে (বিএফইউজের) সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ারও আশ্বাস দেন শেখ হাসিনা। ডিইউজের একাংশের সভাপতি ওমর ফারুক, সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীসহ কমিটির সব সদস্য এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ছিলেন ডিইউজের সাবেক সভাপতি শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজের) একাংশের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও মহাসচিব আবদুল জলিল ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইকবাল সোবহান চৌধুরী, আবদুল জলিল ভূঁইয়া, ওমর ফারুক ও শাবান মাহমুদ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা শোনেন এবং সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। তথ্যমন্ত্রী এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেই অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠনের আশ্বাস দিলেও তা না হওয়ায় সম্প্রতি আন্দোলনের ঘোষণা দেয় সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যপরিষদ। এ দাবিতে আগামী ২৭ মে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর তথ্য মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কথা রয়েছে। সরকার ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রের সপ্তম ওয়েজ বোর্ড গঠন করেছিল। ওয়েজ বোর্ড মানেই অধিকার, এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন নতুন মত নতুন পথ নিয়ে এসেছে কিন্তু অধিকার থেকে গেছে অন্ধকারেই। সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার আগামীতে আমরা পেয়েছি প্রত্যয়ের পথ। জীবনের জন্য সাংবাদিকদেরকে এগিয়ে আসতে হবে সেই বাংলাদেশের জন্য; যেই বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মায়ের মমতার মত করে সাংবাদিকদের পাশে সরকারের দাঁড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজনের আয়নায় আবার মুখ রাখতে হবে সময়ের প্রয়োজনে। যাতে করে সাংবাদিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়। ফিরে পায় প্রত্যয়ের রঙিন আলো। সরকার সাংবাদিকদেরকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অধিকারের রঙধনু তুলে দেবেন। যাতে করে কালোমেঘ দূর হয়ে যায় জীবন থেকে, দেশ থেকে মাটি থেকে; পাশাপাশি অনৈক্য ও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং আক্রোশ থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের শুধু নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক নির্যাতন বাড়ছে । সাংবাদিকদের আর্থিক, সামাজিক ও দৈহিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিকদের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিকরা দেশ ও সমাজের কোনো কল্যাণমূলক কাজে সফলতা অর্জন করতে পারবে না। সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সাংবাদিকদের বিরাট দায়িত্ব ও ভূমিকা রয়েছে । এ দায়িত্ব পালন করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া । যা এখন সময়ের দাবি…

মোমিন মেহেদী : কলামিস্ট ও মেয়র প্রার্থী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন

wedsite:mominmahadi.com; email: mominmahadi@gmail.com

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: http://www.bangla.se , http://www.sangbad24.net