ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আমার পতাকা শীর্ষক ছড়ায় আমাদের স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধকে আবু সালেহ তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘আমার পতাকা নিরাপদ নয় কেন/ আমার পতাকা ওদের শত্রু যেন/ আমার পতাকা সীমান্তে খায় গুলি/ আমার পতাকা দেখছে মাথার খুলি।/ আমার পতাকা ‘ ফেলানীর’ লাশ হয়/ আমার পতাকা কেন উড্ডীন নয়/ আমার পতাকা টেনে ধরেছে কারা/ আমার পতাকা কেড়ে নিতে চায় তারা।’ এই তারা আমাদের দেশ বিরোধী চক্র। যারা স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছর পার হয়ে এসেও রয়ে গেছে অন্ধকারের সাথে। সেই তারা আজো দেশের ভেতরে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে দেশ বিরোধী শিবির। এই শিবির ভাঙার সময় এসেছে বলেই সবাই সোচ্চার হয়ে উঠছে। স্ব স্ব অবস্থান থেকে সোচ্চার হয়ে ওঠা এই সূত্রর সাথে সাথে আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে দেশ রক্ষার জন্য। তা না হলে দেশ পরিণত হবে অন্ধকারের আতুর ঘরে। যা আমাদের কারোই কাম্য নয়। কাম্য ছিল না, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বা কবি সুফিয়া কামালেরও। আর এ কারনেই তারা লড়েছেন রাজপথে। লিখেছেন সাহসকথা। যেই দেশ বিরোধীদের জন্য যুদ্ধ করেও, যোদ্ধা হয়েও আবু সালেহর মত বরেণ্য ছড়াকারদেরকে লিখতে হচ্ছে,‘আমার পতাকা আমারই হওয়ার কথা/ আমার পতাকা পেলো না স্বাধীনতা!’ এই কথা যেন আর লেখা না লাগে, সে জন্য আসতে হবে সবাইকে স্বাধীনতার স্বপক্ষের প্লাটফর্মে। কেননা, আমাদের দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মন এখনো কাঁদে । আর তাই একজন মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন, আজও চোখ ছলছল করে। মুক্তিযোদ্ধা ইউ কে চিং লিখেছেন, সেটা ছিল ১৯৫২ সাল। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ইপিআর বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অস্ত্র দেখলেই ঘৃণা লাগত। মনে হতো এই মানুষ মারার যন্ত্র চালানো শেখার দরকারটা কি? ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার এই মনোভাব একই রকম ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বুঝলাম অস্ত্রশিক্ষাটা দরকার ছিল। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমি ছিলাম রংপুর জেলার পাটগ্রাম সীমান্তের হাতিবান্ধা বিওপিতে। ওপাশে ভারত। এই পাশে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছিলাম ১২ জন ইপিআর। যাদের একজন পাঞ্জাবি এবং দুইজন বিহারি। দেশব্যাপী টানটান উত্তেজনা। যার সূত্রপাত আসলে সত্তরের নির্বাচনেই হয়েছিল। একাত্তরের কয়েক মাস তো ছিল আগুন ঝরানো দিন। এরই মধ্যে এল ৭ মার্চ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই দিয়েছেন। ঐতিহাসিক ওই বক্তৃতায় তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। ভাবলাম, আমরা দুর্গ গড়ব কোথায়? ঘর ছেড়ে নিজেরাই তো দুর্গবাসী! দ্বিতীয়বার ভাবলাম শুরুটা করব কোথা থেকে? দিন এগুতে লাগল। পাঞ্জাবি সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে প্রায় সময়ই ফিসফিস করে কথা বলে। বুঝলাম ওরা আঘাত হানার ষড়যন্ত্র করছে। ওই ক্যাম্পে আমি সবচেয়ে তরুণ সৈনিক। সবে মাত্র নায়কে প্রমোশন পেয়েছি। আমাদের কম্পানি কমান্ডার সুবেদার আরব আলী। একদিকে আমি নন-বেঙ্গলি পাহাড়ি মানুষ, অন্যদিকে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের খেলোয়াড়, সব মিলিয়ে সবার কাছেই ছিলাম প্রিয়। বুঝিবা আঘাতটা শুরু করতে হবে আমাকে দিয়েই-এমনটাই আমাদের পক্ষের সবার কাম্য ছিল। আমারও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল মনে মনে। এরই মধ্যে এল ২৬ মার্চ। আগের রাতে ঢাকায় গোলমাল হয়েছে বলে খবর শুনলাম। চায়ের দোকানে যাঁরা রেডিও শুনেছেনথতাঁরা বললেন, ২৫ মার্চ রাতে শেখ সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকায় চালানো হয়েছে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ জনগণের ওপর হামলা চালিয়েছে। বাঙালিরা পাল্টা যুদ্ধে নেমে গেছে। দেশে কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছেথএমন ভাবনা মাথায়; কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে যাচ্ছিলাম সীমান্তের দিকেই। পথেই দেখি গরুর গাড়িতে চড়ে কারা যেন আসছে। টর্চ মেরে জিজ্ঞেস করলাম ‘কারা যায়?’ ভেতর থেকে জবাব-‘আগ বাড়ো।’ বললাম, ‘আগ তো বাড়েবাই। লেকিন তৌম কৌন হ্যায়? বাহার ছে নিকালো।’ কোন সাড়া শব্দ নেই। আমার সহকর্মী এক সৈনিক লাফিয়ে উঠে দেখে এক পাঞ্জাবি হাবিলদার। সঙ্গে এক বাঙালি জওয়ান। ওরা পালাচ্ছিলো রংপুর হেড কোয়ার্টারে। মাথাটা গরম হয়ে এল। আমার দেশের পরাধীনতার ছবি ভাসছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ’যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো’। শব্দগুলো কিসের যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল। রক্তে এ কিসের চঞ্চলতা? ধরে নিয়ে এলাম বিওপিতে। তারপর ওই ক্যাম্পে থাকা অন্য তিন অবাঙালিকেও নিরস্ত্র করা হলো। পরদিন তিন সাহসী সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিধন করা হলো ওদের। ঠা- ঠা- ঠা। লুটিয়ে পড়লো শত্রু সেনার দল। সেই যে বিদ্রোহের সূচনা, আর পেছন ফিরিনি।’ কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের মত করেই হয়তো ইউ কে চিং বলতে চেয়েছেন, ফিরিনি অবাধ্য আমি। আমাদের দেশের বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা তিনি। কেন ফিরবেন? ফেরার কোন তাগিদ ছিল না সেই সাহসী সময়গুলোতে। আর তাই অনেক প্রানের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছি। এই দেশের জন্য আমাদেরকে আরো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কেননা, এখন শুধু সারাদেশে যুদ্থাপরাধী-ই নয় আছে যুদ্ধাপরাধী সমর্থক ছাত্র শিবিরের মত জঘণ্যগোষ্ঠি। এদেরকে রুখতে হলে এগিয়ে আসতে হবে কবি শাহাবুদ্দীন নাগরীর কবিতার মত করে। যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আহা! মেঘেরা বুঝি ঠোঁট দিয়ে কাঁদে, সারাক্ষণ কাঁদে?/ আমরা পাহাড় পেঁচিয়ে ক্রমেই উঠে যাচ্ছি ওপরে/ সাপের মতো, মেঘের রাস্তা ফেলে নির্ভার উচ্চতায়/ ছুটে যাচ্ছি উল্লাসে, নিচে মেঘ হেঁটে বেড়াচ্ছে/ শীতার্ত মালয় বালিকার মতো, পাহাড়ের কোলে। ( গেনটিং হাইল্যান্ড )

এসময় গান নিয়ে কাজ করেছেন অমর সুর¯্রষ্টা আলতাফ মাহমুদ, নমিতা ঘোষ, মনোরঞ্জন ঘোষাল, বুলবুল মহলানবিশ, আবদুল জব্বার, সৈয়দ আবদুল হাদী প্রমুখ শিল্পী-গীতিকার ও সুরকারবৃন্দ। ‘গুলির ছন্দে গেয়েছি গান।’ সদ্য প্রয়াত দেশ বরেণ্য কন্ঠশিল্পী আজম খানের একটি লেখার শিরোনাম। তিনি এই লেখায় লিখেছেন, ‘এক এক রাউন্ড গুলি বেরুচ্ছে আর তার ছন্দে আমি গেয়ে চলেছি। সারাদিন বিভিন্ন অভিযান শেষে ক্লান্ত হয়ে ক্যাম্পে ফিরেছি কেবল। ক্যাম্পে ফিরলে আমার একটা অভ্যেস গান গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে যাওয়া। ঘুমটা ঠিক হতো না। হয়তো ১০ মিনিটের গভীর নিদ্রা। আবার আচমকা উঠে বসা। ঘুমের ভেতর নিদ্রালু চোখদুটো যেন পাকিস্তান আর্মিদের দেখত। এমনই এক ক্লান্ত ঘুমে আমি তখন। আমার পাশে এক সোলজার হঠাৎ বলছে, ‘স্যার ওরা যাইতাছে।’ কিছুক্ষণ পর আবার উচ্চারণ ‘স্যার ওদের নৌকা যাইতাছে।’ আমি অবচেতনে ওর কথা শুনছি ঠিকই কিন্তু ক্লান্তিতে উত্তর আসছেনা, ওই ৫ মিনিটের ঘুমে। হঠাৎ ও বলে উঠলো, ‘স্যার ওদের নাও চইলা গেল আমি এক ঝটকায় উঠে দেখি, ব্রিজের নিচ দিয়ে ১২টি নৌকা আর্মিদের রসদ নিয়ে যাচ্ছে। আমার সেনারা বলে, ‘স্যার ফায়ার শুরু করবো?’ আমি নিষেধ করলাম, ‘না, এটা আমার প্রথম অপারেশন। আমি শুরু করবো। তারপর তোরা।’ আমরা সবাই অবস্থান নিই এবং আমি শুরু করি ফায়ার, পরপরই সবাই একসাথে ফায়ার করা শুরু করি। মাত্র কয়েক মিনিটে ওদের খাবারবাহী নৌকাগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেললাম। প্রায় ৮০ জন পাক আর্মি বধ হয় আমাদের সেই অপারেশনে। এর কয়েক ঘণ্টা পরই আমাদের এই অপারেশনের খবর চলে গেল আর্মিদের কাছে। পরক্ষণেই প্রায় ৪০০ আর্মি ঘেরাও করে আমাদের ক্যাম্প জ্বালিয়ে দিলো, টেলিফোনের লাইন থেকে শুরু করে সবকিছু গুঁড়িয়ে দিলো। আমরা আগে থেকে মাটির গর্তে, ব্রিজের নিচে অবস্থান নিয়েছিলাম। এরপর সেই অভিযানে সফল হয়ে ক্যাম্প ছাড়লাম। আহ! একটা সফল অপারেশনের পর কি যে ভাল লাগতো।’ এই হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যেখানে গানে- কবিতায়-কথায় গড়ে উঠেছিল প্রতিবাদ। স্বাধীনতার এতদিন পরেও যারা পত্রিকা-টিভির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলাম আর ছাত্রশিবিরের কর্মকান্ডকে হালাল করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আবার গর্জে উঠবে বীর বাঙালি। কেননা. এই বাঙালি, সেই বাঙালি; যাদের জন্য যুদ্ধ কোন ভয় নয়, বরং জয়। যেই জয় এসেছিল সাহস-কবিতা-গান আর কথার রঙধনু হয়ে। উদাহরন স্বরুপ বলা যায়, গু ভৎরবহফ পধসব ঃড় সব,/ ডরঃয ংধফহবংং রহ যরং বুবং,/ ঐব ঃড়ষফ সব ঃযধঃ যব ধিহঃবফ যবষঢ়,/ ইবভড়ৎব যরং পড়ঁহঃৎু ফরবফ,/ অষঃযড়ঁময ও পড়ঁষফহ’ঃ ভববষ ঃযব ঢ়ধরহ,/ ও শহবি ও’ফ যধাব ঃড় ঃৎু,/ ঘড়ি ও’স ধংশরহম ধষষ ড়ভ ুড়ঁ,/ ঞড় যবষঢ় ঁং ংধাব ংড়সব ষরাবং (ইধহমষধফবংয : এবড়ৎমব ঐধৎৎরংড়হ)
রক্তই যদি স্বাধীনতার মূল্য বলে বিবেচিত হয়, তাহলে এটাই বলতে হবে ‘বাংলাদেশ অনেকে বেশি পরিমাণ রক্ত দিয়েই স্বাধীনতা কিনে নিয়েছে।’ দেশের নানা সেক্টরে বুক হিমকরা অসম যুদ্ধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশীদের ন্যায়সঙ্গত লড়াইয়ের অনুকূলে সমর্থন আদায় করে নিতে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বড় মাপের ভূমিকা রেখেছে। আবার পাকিস্তানের পক্ষের দেশ আমেরিকায় এ জাতীয় একটি অনুষ্ঠান আয়োজন ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়েই ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশী শরণার্থীদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন প্রাঙ্গণে দ্য বিটলব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন ও ভারতীয় সেতারবাদক পন্ডিত রবিশঙ্কর আয়োজিত দু’টি দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠানই হলো ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এই সঙ্গীতানুষ্ঠান দু’টি আয়োজিত হয় ১ আগস্ট ১৯৭১ সালে। এই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের এক বিশাল দল অংশ নিয়েছিল, যাদের মধ্যে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল, ব্যাড ফিঙ্গার এবং রিঙ্গো রকস্টার ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তবে ম্যাডিসন স্কয়ারের সেই কনসার্ট থেকে প্রায় ২৪৩,৪১৮.৫০ ইউএস ডলার সংগৃহীত হয়, যার পুরোটাই ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের জন্য দিয়ে দেয়া হয়। সিডি ও ডিভিডি থেকে প্রাপ্ত অর্থও ইউনিসেফের ফান্ডে জমা করা হয়। সাহসআলোয় আলোকিত হতে হতে তাই বাংলাদেশের স্বাপ্নিক মানুষেরা নতুন সমাজকাঠামো গড়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক বিপ্লবের সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে রেখেছিলেন গান- কবিতা-কথা-গল্প-নাটক-চিত্রকলা চলচ্চিত্র ইত্যাদি। শিল্পসাহিত্য বিপ্লবকে দেয় ভাষা, আর বিপ্লব শিল্পসাহিত্যকে দেয় মুক্তি। কখনো কবিরা তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছেন, কখনো শিল্পীরা গেয়েছেন গান; ক্ষুব্ধ সমাবেশে, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, রেডিও, টেলিভিশনে, শহীদ মিনারে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, সুপ্রভাত, প্রশ্ন থেকে শুরু করে যদি তোর ডাকা শুনে, কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিদ্রোহী, মানুষ, সাম্যবাদী, কান্ডারী হুঁশিয়ার, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, নমঃ নমঃ নমো বাংলাদেশ মম, প্রলয়োল্লাস, চল চল চল, একবৃন্তে দুটি কুসুম, ইত্যাদি আমাদের স্বাধীনতার সময়ের সাহসকাব্য হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। পাশাপাশি, কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা, কবি জসীম উদ্দীনের নিমন্ত্রণ, সিকান্দার আবু জাফর এর বাংলা ছাড়, সংগ্রাম চলবেই, সুকান্ত ভট্টাচার্য ’র উদ্যোগ, দুর্মর, ছাড়পত্র, উচ্চারিত হয়েছে বারবার। কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি শামসুর রাহমান, কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আসাদ চৌধুরীসহ দেশ বরেণ্য প্রায় সকল কবিই এসময় লিখেছেন দেশ, মাতৃকা আর মমতামাখা বাংলাদেশের জন্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে স্বরচিত গল্প-কবিতা-কথিকা পাঠ করেছেন সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল গাফফার চৌধুরী, টি এইচ শিকদার, মাহবুব তালুকদার, বুলবন ওসমান, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, বিপ্লব দাশ, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, রফিক নওশাদ, অরূপ তালুকদার, ফতেহ লোহানী, আশরাফুল আলম, উম্মে কুলসুম, নিখিল রঞ্জন দাশ, মোস্তফা আনোয়ার, আশফাকুর রহমান খান, কাজী রোজী, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ। পুঁথিপাঠ করতেন মোহাম্মদ শাহ বাঙালী। কাজী সব্যসাচী অতিথি আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে প্রায়ই আবৃত্তি করতেন কাজী নজরুল ইসলামের উদ্দীপনামূলক কবিতা। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল। স্বাধীনতার স্বপক্ষের স্বপ্নজ বর্তমানে দেখা যায়, আমাদের দেশ মাটি আর মায়ের প্রতি ভালেঅবাসা থেকে লিখেছেন, জসীমউদদীন- দগ্ধগ্রাম, মুক্তিযোদ্ধা, আমার বাড়ি, নিমন্ত্রণ, সুফিয়া কামাল- উদাত্ত বাংলা, আজকের বাংলাদেশ, আবুল হোসেন- পুত্রদের প্রতি, আহসান হাবীব- সার্চ, স্বাধীনতা, আমি কোন আগন্তুক নই, সিকান্দার আবু জাফর-বাংলা ছাড়, সংগ্রাম চলবেই, শামসুর রাহমান -স্বাধীনতা তুমি, তুমি বলেছিলে, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, অভিশাপ দিচ্ছি, বন্দী শিবির থেকে, হাসান হাফিজুর রহমান- তোমার আপন পতাকা, আবদুল গাফফার চৌধুরী -আমার দুঃখিনী বাংলা, আলাউদ্দিন আল আজাদ -স্বাধীনতা ওগো স্বাধীনতা, সৈয়দ শামসুল হক- গেরিলা, জগন্নাথ হল, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ঃ আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য পার্থনা, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান – জর্নাল, সহজে নয়, আবু হেনা মোস্তফা কামাল- ছবি, আমার সত্তা এই দেশ, ফজল শাহাবুদ্দীন – বাংলাদেশ একাত্তরে, এপ্রিলের একটি দিন ১৯৭১, আল মাহমুদ – ক্যামোফ্লাজ, কারফিউ, শহীদ কাদরী – নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা বেলাল চৌধুরী – মর্মে মর্মে স্বাধীনতা, একদিন চিরদিন জয় বাংলা, আবদুল মান্নান সৈয়দ- মুক্তিযুদ্ধ, আসাদ চৌধুরী -রিপোর্ট ১৯৭১, শহীদদের প্রতি, তখন সত্যি মানুষ ছিলাম, বারবারা বিডলারকে, রফিক আজাদ – নেবে স্বাধীনতা, একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমপর্ণ, খালেদা এদিব চৌধুরী – স্বাধীনতা কোমল পাথর, নির্মলেন্দু গুণ-আগ্নেয়াস্ত্র, হুলিয়া, স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল, মহাদেব সাহা- তোমার জন্য, একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরিতে, আবুল হাসান- উচ্চারণগুলি শোকের, রবিউল হুসাইন-প্রিয়তম বাংলাদেশ, হুমায়ুন আজাদ-মুক্তিবাহিনরি জন্যে, আবু কায়সার-জার্নাল ’৭১, মুহম্মদ নূরুল হুদা- আমরা তামাটে জাতি, অসীম সাহা-পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতি রক্তপাত, মাহবুব সিদ্দিক-যুদ্ধ ভাসান, খোন্দকার আশরাফ হোসেন – বাউসী ব্রিজ ’৭১, হেলাল হাফিজ-নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, অস্ত্র সমর্পণ, আবিদ আজাদ- গ্রেনেড, আমার অক্ষমতার গল্প, এখন যে কবিতাটি লিখব আমি, হাসান হাফিজ- না, মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথোপকথন, জাহিদ হায়দার- খোলা জানালার দিন, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ -বাতাসে লাশের গন্ধ, নাসিমা সুলতানা- যুদ্ধে যাওয়ার গল্প, কামাল চৌধুরী -ক্রাচের যুবক, নাসির আহমেদ – বুকের ভেতরে বাজে, মিনার মনসুর – কী জবাব দেব, মাশুক চৌধুরী – মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, ইকবাল আজিজ – বাঙালির অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, মারুফ রায়হান – সবুজ শাড়িতে লাল রক্তের ছোপ, রেজাউদ্দিন স্টালিন – একজন মুক্তিযোদ্ধার মহত্তম ক্ষমা, আল মুজাহিদী -আমারই বাংলাদেশ, মাটি বড় প্রিয়, ফরহাদ মজহার -আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে, মাহবুব হাসান – টগর তোর স্বাধীনতা, শান্তা ফারজানা- স্বাধীনতার সিঁড়িসহ অসংখ্য কুবতা জমাট বেঁধেছে জীবনের যুদ্ধে। এই যুদ্ধ ছিল জীবনের-স্বপ্নের আর রঙধনুময় আগামীর; যেখানে কোন কালোমেঘ থাকার কথা ছিল না। কিন্তু এখনো আছে, কালোমেঘের ঘণঘটা চারপাশে স্বাধীনতার এতদিন পরেও। স্বাধীনতা দিবসের কবিতা মূলত মুক্তিযুদ্ধ কথা ও দেশপ্রেমে আবেগসঞ্জাত বীররসের এক বাণীভুবন। এই ভূবনের বাসীন্দারা স্বপ্ন গেঁথে গেঁথে এগিয়ে চলছে, চলবে আগামীর আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ থেকে। সেই লক্ষ থেকেই কবি হাসান হাফিজ লিখেছেন, কোথা হইতে আসিতেছ স্বাধীনতা তুমি?/ মানুষের আত্মার অর্গল ভেঙে/ রক্তনদী পার হয়ে/ আকাঙ্ক্ষার পতাকা উড়িয়ে/ মানুষকে শৃঙ্খলিত পদানত/ রেখে কে আনন্দ লোটে?/ মনুষ্য নামীয় প্রাণী, অন্য কেউ নয়।/ নির্যাতিত শোষিত বঞ্চিত করে/ চরিতার্থ হয় কার মনোবৃত্তি?/ তারাও মানুষ। কলঙ্কিত ঘৃণিত প্রজাতি।/ বাংলাদেশ, তুমি এক আশ্চর্য অঙ্কুর/ লাখো শহীদের প্রাণ, নারীর সম্ভ্রম/ তার মূল্যে সঞ্জীবনী জীবন পেয়েছো/ তোমার তৃষিত সত্তা আত্মার পিপাসা/ মিটিয়েছে শোণিতের সুউষ্ণ এ পুণ্যধারা/ সেজন্যেই এতোটা মহার্ঘ তুমি।

www.banglareport24.com;

email: mominmahadi@gmail.com