ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

মাগো, ওরা বলে, শীর্ষক কবিতায় কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ একজন মায়ের মমতাময় সন্তানের ভালোবাসার কথা তুলে এনেছেন নয়নতারা ফুলের মত করে। তাঁর স্বপ্নজ কবিতায় তিনি তুলে এনেছেন কাব্যজ কথা। লিখেছেন ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে/ নুয়ে পরেছে লতাটা,/ সজনে ডাঁটায়/ ভরে গেছে গাছটা, আর আমি/ ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।/ খোকা তুই কবে আসবি ?/ কবে ছুটি?/ চিঠিটা তার পকেটে ছিল/ ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।/ মাগো, ওরা বলে/ সবার কথা কেড়ে নেবে।/ তোমার কোলে শুয়ে/ গল্প শুনতে দেবে না।/ বলো, মা,/ তাই কি হয়?/ তাইতো আমার দেরি হচ্ছে।/ তোমার জন্যে/ কথার ঝুরি নিয়ে/ তবেই না বাড়ি ফিরবো।/ ল?হ্মী মা,/ রাগ ক’রো না,/ মাত্রতো আর ক’টা দিন।’

আমাদের আলোকিত আগামী গড়তে কবি-ছড়াকাদের ছন্দজ সময়ে উঠে এসেছে আলোর কথা, ভালোর কথা। আমাদের বাংলাদেশের মানুষ এখনও তারা সম্পূর্ণ অধিকার পায়নি। এই সংগ্রাম যতদিন চলবে ততদিন ছড়ার সংগ্রাম চলবে। ভাষার ছড়াগামী নিয়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অবকাঠামো মনের রঙিন আলোয় আরো সুন্দর হয়ে উঠছে ছন্দিত তানে। ছড়াকার বা কবিদের কলমে যখনই একুশ উঠে এসেছে, হয়ে উঠেছে ছন্দ-মাত্রাময়। সেই সুন্দরের সাথে সাথে উঠে এসেছে ভাষার ছড়া। ছড়াকার আবু সালেহ’র ছড়া গড়িয়ে গেছে এভাবে, ‘ভাষার জন্য যারা দান করেছেন জান/ তারাই যে হলেন জাতির অমর শহীদান/ একুশ তারিখ কেনো অমর যে হবে/ ঐতিহাসিক দিন যে তাকে সবাই কবে/ আল্লাহ মহান প্রভু দ্বিতীয় মহান নেই/ এমন বাড়াবাড়ি যে চলছেই চলছেই/ প্রাণী কূলের মাঝে শ্রেষ্ঠ মানুষ বটে/ তাদের কর্মকান্ডে ঘৃনাও রটে/ সকল মৃত্যুই ওহে হয়না শহীদ জানি/ শহীদ নামের মানে কোথায় যে টানি।’ ছড়াকার আবু সালেহ মানেই মনের কথাগুলো অকপটে বলে যাওয়া। এই জীবনমুখি মানুষের লেখায় উঠে এসেছে আজন্মকালের আন্দোলনকথা। লিখেছেন, ‘পেরিয়ে সিঁড়ি রক্তের সেই ফেব্রুয়ারি/ স্বাধীনতা লাভ করলাম যেই/ দেখতে পেলাম বাপ দাদাদের হায়/ আকূল করা সেই ভাষা আর নেই।/ মুখে মুখে ভিন দেশীদের ভাষা/ দেশ ত্যাগের রয় মনের ভিতর আশা/ ভাবতে গেলেই হারিয়ে ফেলি খেই।’

যেভাবে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই আমি খেই হারিয়ে ফেলছি। যখন দেখছি বাংলা একাডেমীর মত দেশের সর্বোচ্চ ভাষা-স্বাধীনতার কেন্দ্রস্থলে বসে -স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। শুধু এখানেই শেষ নয় ওরা আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ধূলিস্যাৎ করার জন্য এই ভাষার মাসে এসে ‘মাস্তুল’ ‘উর্দু’ ‘দিশারী’ ‘কাণ্ডারী’ ‘টিন এট টিন’ ডাকটিকিটসহ পাকিস্তান ও আমেরিকার আঞ্চলিক ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশ করছে একাধিক কাগজ। কিছু কিছু কাগজ বাংলা নাম প্রকাশ করলেও ভেতরে রয়েছে অসংখ্য সংবাদ যার অধিকাংশই উর্দু ভাষার পক্ষে এবং আমাদের স্বাধীনতা আর স্বাধীকারের বিরুদ্ধে। এমতবস্থায় নির্বিকার বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ও তথাকথিত কবিতা পরিষদের তথাকথিত কবিগণ। নির্বিকার থেকেই ক্ষান্ত নন এই প্রচার বিলাসী সাম্রাজ্যবাদের দালালরা। তারা এই সব দেশ বিরোধী, ভাষা বিরোধী কাগজগুলোতে সাক্ষাৎকার ও লেখা দিয়ে সহায়তাও করছেন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’।

সংবিধানের এ বিধান সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না দেখে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮৭ সালের আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। ভাষা সৈনিক সালাম. বরকত, জব্বার, শফিউর, রফিকের প্রাণ আর আর অসংখ্য মানুষের রক্তঘামের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার মান রাখার লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যে কোনো আদালত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ এবং উল্লিখিত আইনের অধীন আদালতসহ প্রজাতন্ত্রের সব কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় নথিপত্র বাংলা ভাষায়ই বাধ্যতামূলকভাবে সম্পাদিত হওয়ার কথা। প্রসঙ্গত, দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করা হলেও তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যা সত্যি দুঃখজনক। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬০ বছর পেরিয়ে আসার পর সেই বাংলা ভাষার অনন্য তীর্থস্থান বাংলা একাডেমী চত্বরে বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রর নেতা কর্মীদের প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে স্টল বরাদ্দ। যাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয় ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের জঙ্গিবাদী বই। তবুও এগিয়ে চলছে আমাদের বর্তমান। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি আমরা, আমাদের এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ এবং প্রিয় বাংলা ভাষা। যে ভাষার জন্য রক্তপ্রাণ, সেই ভাষাকে আজ করা হচ্ছে বলিদান। এভাবে আর কতকাল চলবে জানি না। তবে এতটুকু জানি যে সামান্য টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা-স্বাধীকারের পক্ষের অনেকেই। যা আমাদের কারো কাম্য নয়। কাম্য থাকতেও পারে না। আমাদের কাম্য প্রতিটি দিন হোক ভাষার জন্য, বাংলা ভাষার জন্য। প্রয়োজনে আমরা অন্য সকল ভাষা ব্যবহার করবো, কিন্তু উর্দু নয়। কেননা, উর্দু মানেই বাংলা ভাষার শত্রু ভাষা। আমরা প্রতিদিন চাই বাংলাকে, বাংলা ভাষাকে। আর লক্ষ্য থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়া বছরের বাকি দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করা হয় না এই অভিযোগ এনে হাইকোর্টে রিট করা হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে বিষয়টি আমলে নেন হাইকোর্ট।

শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না সে বিষয়ে রুলও ইস্যু করেন বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি নাঈমা হায়দারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ। শুনানি শেষে রায় হয় ২৫ আগস্ট। রায়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তাদের স্মৃতি রক্ষায় শহীদ মিনার গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সাংবাদিকদের জানান আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

অবশ্য কিছু কিছু পদক্ষেপ আদালতের তরফে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে সেখানে পাহারার ব্যবস্থা করা, যারা ভবঘুরে, ভাসমান পতিতা ও মাদকাসক্তদের আনাগোনা ঠেকাবে। রায়ে নির্দেশনা এসেছে ভাষা শহীদ ও ভাষাসংগ্রামীদের সম্পর্কেও। ভাষা আন্দোলনে শহীদ, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মরণোত্তর পদক আর জীবিত ভাষাসংগ্রামীদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে রায়ে। সরকারকে বলা হয়েছে তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার। কেননা, ভাষা শহীদদের নিয়ে আমরা গর্ব করি, হৃদয় নিংড়ানো আবেগে আপ্লুত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করি, কথার মালা সাজাই, সুনাম কুড়াই দেশ-বিদেশে; অথচ আচরণগতভাবে শহীদদের প্রতি এত অবহেলা কেন? ভাষা আন্দোলন ছিল সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দীপ্ত অঙ্গীকার, বাঙালি জাতির চেতনার প্রতীক। অতএব, আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সকল স্বাধীনতা বিরোধী, বাংলা ভাষা বিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে।