ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সদ্য স্নাতক পরীক্ষা দিয়ে ২০১০ এ ছোট একটা চাকুরী নিয়ে একটা অফিসে ঢুকেছি মাত্র। আমার চাকুরীর দ্বায়িত্বের মধ্যে ছিল কোম্পানীর কিছু ক্লাইন্টসদের সাথে কিছু বিষয়ে যোগাযোগ রাখা। খুব বেশি কাজ না থাকায় এবং সমবয়সী কিছু কলিগ থাকায় আমরা মাঝে মাঝে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে খুব আলোচনা করতাম। তো, ঐ সময় টাতে স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী কাজ যারা করেছে প্রতিদিন তাদের কে নিয়ে খুব লেখা আসতো। তাদের তালিকা, কে কোন এলাকায় তাদের কর্মকান্ড চালাতো সেসব নিয়ে খুব লেখা হতো। আর আমরা সবাই এগুলো নিয়ে খুব উত্তেজনায় ভুগতাম, অবশেষে আমাদের কপালের কলঙ্ক মুছার শুভ সূচনা হচ্ছে বলে। বিষয়টা নিয়ে আমার ভিতর একটু বেশিই উত্তেজনা কাজ করতো। কারণ টা আগেই বলে রাখি। আমার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় ছাত্র ছিল। অন্য লক্ষ কোটি বাংঙালীর মত আমার বাবাও বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশের জন্য জীবন দিতে ছুটে গিয়েছিল এবং ৮নং সেক্টর এ সরাসরি যুদ্ধে নেমেছিল। আর এটার চেয়েও বেশি যে ব্যাপারটা আমাকে দাগ কেটেছিল সেটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার দের হাতে আমার দুই দাদু (মায়ের বাবা এবং মামা) একই দিন একই জায়গায় শহীদ হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে আমি খুব আগ্রহী ছিলাম। আর প্রতিদিন একবার আমাকে আমার দাদু মারা যাওয়ার ঘটনাটা মায়ের মুখে শুনতেই হতো। আমি দেখতাম আমার স্নেহময়ী মা এই ঘটনাটা বলতে বলতে প্রতিবার ই কান্না করতো। আর আমার ভিতর একটু একটু করে রাজাকার, আল-বদর সহ পাকিস্তানী সেনাদের উপর ঘৃনা বাড়তে থাকতো। মা সব সময় বলতো, “তোর দাদু বেঁচে থাকলে তোকে মাথায় করে রাখতো।” আর তখন আমি আমার ন্যায্য ভালোবাসা আর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছি বলে কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যেতে চাইত। কিন্তু মাকে কিছু বলতাম না। ভাবতাম আমার ছোট মামার কথা, যে তার বাবার মৃত্যুর সময় মায়ের গর্ভে ছিল। ভাবতাম আমার দিধা (মায়ের মা) এর কথা। যে এক সাথে স্বামী এবং ভাইয়ের মৃত্যু খবর পেয়েছে, কিভাবে তার পরও সে বঁচে ছিল?

হয়তো এই বাস্তবতা আর না পাওয়ার কষ্টগুলোর জন্যই আমি ২০১০ এ খুব বেশি উত্তেজিত থাকতাম। এরকমই একটা দিনে আমাদের অফিস এ একজন লোক আসল, যিনি আগেও কিছুদিন বিভিন্ন কাজে এসেছে। (ছেলেটি আমাদের সমবয়সী ই হবে)। তো,ঐদিন আমারা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কথা বলছিলাম তখন তিনি এসে হঠাৎ বলা শুরু করলেন, “ম্যাডাম এই সব আপনাদের লীগ সরকারের বানানো গল্প, বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। সরকার কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারবে না। শুধু জামায়েত ইসলামীদের ধ্বংষ করার জন্য এটা একটা চাল”। শুনে আমি তো থ। বলে কি ছেলেটা? এই যুগের একটা ছেলের মুখে এই নতুন প্রজন্মের মুকে আমি এইসব কি শুনছি? এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমি এমন কথা এর আগে কখনো কারো মুখেই শুনি নাই, আর এমন দৃঢ়তার সাথে কেউ এমন বলতে পারে শুনে অবাক না হয়ে ই পাররাম না। যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা আর বঙ্গবন্ধু সহ জাতীয় চার নেতা, এদের কে অপমান করে কেউ কথা বললে স্বভাবতই আমি খুব কষ্ট পাই। তো আমি ছেলেটাকে প্রথমে বললাম, “ভাইয়া আপনার ভাবনা গুলো ঠিক নয়, সত্যিকার ইতিহাসটা আপনার জানা উচিত।” সে উল্টা আমাকেই আক্রমণ করলো এটা বলে যে, আমি নাকি যতসব আজগুবি কিছু গল্প জেনেছি আর সেটা বিশ্বাস করে বসে আছি। আমি তখন আমার দাদুদের নিহত হওয়ার ঘটনা বললাম, কিভাবে আমার মামা বড়ীর প্রতিটা ঘর জ্বালানো হয়েছে, কিভাবে আমার মামা বাড়ীতে একই দিনে একটা পুকুর পাড়ে ৭ জনকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে কিছু নেপিশাচ বাঙ্গালীদের সহযোগিতায়, যার কিছু স্বাক্ষী এখনো জীবিত আছে। কিন্তু আমি তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম। খুব কষ্ট হচ্ছিল এটা ভেবে, এই স্বাধীন দেশে থেকে, স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের সব সুবিধা ভোগ করে (যতটুকু আমাদের দেশে পাওয়া যায়) কিভাবে কিছু লোক এর শিকড় গুলোকেই কেটে ফেলছে! আমার খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন, যেদিন ২০০১ এ নতুন সরকার এ কিছু যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রীসভায় অংশগ্রহণ করেছিল। খুব কষ্ট হয়েছিল তারা যখন আমাদের স্মৃতিসৌধে গিয়ে সেটাকে কালিমালিপ্ত করেছিল। তারা ঐ ৫টা বছর বহু প্রাণ আর রক্তে অর্জিত আমাদের পতাকা যখন তাদের গাড়িতে উড়াতো তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো কেন জানিনা।

মাঝে বেশকিছু দিন আর যাই হোক না কেন আমার কোন খারাপ লাগতো না। কিন্তু গত তিন দিন ধরে সারাদেশে জামাত কর্মীদের তান্ডব দেখে আমার ভয় হচ্ছে। ভয় হচ্ছে এটা ভেবে যে, আবার নতুন করে কোন অরাজকতা শুরু হচ্ছে নাতো? যদিও এটাও এক ধরনের অরাজকতা। তারপরও এর চেয়ে আর জেন না এগোয়। টেলিভশন খবর আর পত্রিকার পাতায় স্থির চিত্র দেখে আমি সত্যিই সঙ্কিত। খুব বেশি অবাক হচ্ছি, একটা সভ্য দেশের নাগরিক হয়ে ওরা কিভাবে এমন অন্যায় করতে পারে? নাকি ওদের কে আমরা সভ্য দেশের নাগরিক না বলে বলব ওরা জামাত-শিবির কর্মী। ওরা এখনো ভিতরে ভিতরে এদেশটা কে পাকিস্তান মনে করে। আর তাই এদেশের সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য বর্তমান পাকিস্তানের সমকক্ষ জায়গায় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ওরা এমন করছে, যাতে সারা বিশ্বের মানুষ দেখে স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও এ দেশের মানুষ গুলো কত অসভ্য!

২/৩ দিন আগেই প্রবীর বিধান দাদার একটি লেখায় কেউ মন্তব্য করেছিল, জামাতের এই আন্দালন অথবা রাজনৈতিক কর্মকান্ড এটা তাদের গণতান্তিক অধিকার। সেই ভদ্রলোক কি এটা বলতে পারবে যে, পুলিশের হাতের অস্ত্র নিয়ে পুলিশকেই আহত করা কোন দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনুমতি দেয়? আর জামাতের এই আন্দোলন কোন ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিতর পরে?

আর আমার ছোট্ট ভাবনা আমাকে যে সমাধান দেয় তাতে আমি এটা বলব, জামাত-শিবির মানে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত আর ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের হোলিখেলা হায়নার দল। যারা দিন দিন বেড়েই চলছে। যারা বাঙালি নয়, জামাতি। যারা গনতন্ত্রী নয়, অত্যাচারি। আরা তাদের কে বাংলার মাটি থেকে দূর করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে ফেলতে হবে। আর গনতান্ত্রিক অধিকার এর দোহাই দিয়ে তারা যে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাওয়াটাকে বন্ধ করতে হবে কঠোর ভাবে। বাংলাদেশ কে স্বাধীন করার জন্য ৩০লক্ষ শহীদ হয়েছে, ২লক্ষ মা-বোন তাদের অমূল্য সম্পদ বিসর্জন দিয়েছে। বাস্তুহারা হয়েছে ১কোটি বাঙালী। এত ত্যাগ তিতিক্ষার পরে যদি আমরা আমাদের স্বাধীনতা কে অর্জন করতে পারি, তাহলে আমাদের দেশের অধিকাংশ সভ্য মানুষ গুলোর সুস্থ, সুন্দর আর নিরাপদ জীবনের জন্য জামাতের মত একটি স্বাধীনতা বিরোধী মানসিকতার সংগঠনকে সরকার নির্মুল করতে পারবে না?