ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

গতকাল এর প্রকাশিত খবর “একুশে বইমেলায় নিষিদ্ধ রবীন্দ্রনাথ, সুনীল, সমরেশের বই”। লেখাটি পড়ে হতবাক হয়ে গেলাম। বাংলাএকাডেমী নির্দেশ দিয়েছে এবার একুশে বইমেলায় কোন বিদেশী লেখকের বই বিক্রি হতে পারবেনা। এবার প্রকাশিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩-এর নীতিমাল ও নিয়মাবলির ৬.১ ধারায় বলা হয়, ” অমর একুশে বই গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকরা কেবল বাংলাদেশের মুদ্রিত ও প্রকাশিত বাংলাদেশের লেখকদের মৌলিক/অনূদিত/সম্পাদিত/সংকলিত বই বিক্রি করতে পারবেন।এই ধারা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের কোনো লেখকের বই একুশে গ্রন্থমেলায় বিক্রি হবে না। সেটি বাংলাদেশের কোনো প্রকাশক প্রকাশ কররেও না”।

ব্যাপারটা সত্যিই আমার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। আর সেই সাথে অযুক্তিকও। বাংলাসাহিত্যের ধারক ও বাহক হিসিবে আমরা বাংলা একাডেমীকে মনে করি। আর সেই সাথে বাংঙ্গালী জাতিকে সঠিক, সুন্দর এবং সুষ্ঠ সাহিত্যের ধারায় প্রবাহিত কারার দ্বায়িত্বও বাংলা একাডেমীর উপর বর্তায় বলে আমি মনে করি। কিন্তু এমন একটি ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলা একাডেমী কি বুঝাতে চাইছে এটা আমার জানা নেই। কিন্তু এটা যে একটা খুবই বাজে সিদ্ধান্ত এটাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। সব সময় সাহিত্য সম্পর্কে একটা কথা শুনে আসছি। সাহিত্যের কোন দেশ কাল সমাজ নেই। পৃথিবীর সব সাহিত্যই মানুষের ভাবনাকে আলোড়িত করে, প্রসারিত করে, আর সেই সাথে উদার করে। সব বাঙ্গালী সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু অনন্য উচ্চতায় আসীন। তাদের একটি বিশাল পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে আমাদের বাংলাদেশে। আর রবীন্দ্রনাথের কথা বলার তো কোন অপেক্ষাই রাখেনা বলে আমি মনে করি। আমি মনে করি প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ের মণিকোঠায় রবীন্দ্রনাথের অবস্থান। সেখানে তাদের লেখা একুশে বই মেলায় বিক্রি নিষিদ্ধ করে আমার মনে হয় লাভ এর চেয়ে লোকসান টাই বেশি হবে। কারণ, এই সব লেখকদের লেখা যারা পড়ে তারা এই লেখকদের বই কিনবেই। যেখানে আর যেভাবেই পাক। এখানে পাইরেসি বলে কিছু থাকবেনা বলে মনে হচ্ছে। ব্যাপারটা সাহিত্যের, আর কোন লেখকের এটা। আমি আমার কথাই বলি, আমার পছন্দের লেখকের বই আমি প্রয়োজনে ফুটপাত থেকেই কিনব। প্রয়োজনে পাইরেসি বই ই কিনব। সেটা তো আর বাংলা একাডেমী রোধ করতে পারবেনা। আর আমার বিশ্বাস পাঠকরা (যারা নিষিদ্ধকরা লেখকদের বইয়ের পাঠক) আমার মত কাজটাই করবে। মাঝখান থেকে ভাল মানের প্রিন্টকৃত বই থেকে পাঠক বঞ্চিত হবে। আর কিছুই না।

বাংলা একাডেমীর নিতিনির্ধারকদের কাছে আমার যেটা জানতে চাওয়ার সেটা হলো, তারা এই নিষিদ্ধকরণের দ্বারা কি চাইছে? এটাই কি যে, দেশীয় লেখকদের বইয়ের প্রসার? যদি সেটা হয়, তাহলে আমার তো মনে হয় যে, সাহিত্যের মান ভালো হলে সব প্রতিরোধের ভিতর দিয়ে সেটা তার আলো ছড়াবেই। যেমন আমি আমার পছন্দের কোন বই বারবার কিনি। আমার নিজের জন্য, ভাইবোনদের জন্য, বন্ধুদের জন্য। আর সেটা চলতেই থাকবে।তাই সবার আগে সাহিত্যের মান দেখতে হবে। সাহিত্যের মান ভালো হলে পাঠকরা সেটার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে, নিশ্চিত।

দ্বিতীয় কথা, বাংলাএকাডেমী কি চাইছে দুই দেশের লেখকদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে? যদি সেটা হয়, তাহলে সেটাতো কিছুতেই সম্ভব নয় বলে মনে হয়। বাংলাদেশেরররর বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল বিভিন্ন সময় পশ্চিম বাংলার লেখকদের উপন্যাস নিয়ে ধারাবাহিক বানিয়ে প্রচার করছে। সেটাকি পারবে বাংলাএকাডেমী বন্ধ করতে? নাকি সেটার জন্য চেষ্টা চালাবে?

যেটাই করুক, সেটা ঠিক হবে বলে মনে করছি না। কারণ, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক চলেনা। তার লেখা আমাদের ভাবায়, মনের অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়, জ্বলাবে অনন্তকাল। অন্যান্য লেখকগনও আমাদের কাছে অনেক শ্রদ্ধার। তাদের লেখাও আমাদেরকে অনেক কিছু শিখায়।

তাই শুধু শুধু নিজেদেরকে বিতর্কের মধ্যে রেখে এমন একটা সিদ্ধান্ত বহাল না রাখার জন্য বাংলা একাডেমীকে অনুরোধ করছি।

তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।