ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যত দিন যাচ্ছে তত যেন আমি আরো বেশি করে ভীত-সন্ত্রস্ত, শংকিত হচ্ছি। আজ আরো বেশি শংকিত হলাম বিবিসির শ্রোতাদের সরাসরি অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ফোন ইন অনুষ্ঠান শুনে। যেখানে বিষয় ছিল, ব্লগার হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপরে সরকারের বর্তমান ভূমিকা এবং এটার জন্য ভবিষ্যতে অবস্থা কোন দিকে যেতে পারে, সেই বিষয়ে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শ্রোতাদের মন্তব্য শুনে আমি রীতিমত শংকিত। অংশগ্রহণকারী এক শ্রোতা বলল সব ব্লগাররাই নাকি ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে ব্লগিং করে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তাকে যধাসাধ্য বোঝানোর চেষ্টা করলো যে, সব ব্লগার নয় কিছু কিছু ব্লগার এমন বিষয় নিয়ে লেখে। কিন্তু, আমার মনে হয়নি যে তিনি ওই শ্রোতাকে সেটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন।বাকী শ্রোতাদের মন্তব্যও ছিল রীতিমত দুশ্চিন্তার। আমার মনে হয় ৯০% শ্রোতাই বর্তমানে ব্লগার হত্যাকান্ডের জন্য ব্লগারদেরই দায়ী করলো। তারা ব্লগারদেরকে বিভিন্নভাবে উপদেশ দিয়ে গেলো্ যে, ব্লগারদের উচিত নয় কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে কিছু না লেখা। এমন লিখলে তো পরিণতি এমন হবেই। একজন তো বলেই ফেললো যে, ব্লগারদের এমন লেখার জন্য সরকার উপযুক্ত শাস্তি না দেয়ার কারনেই এমন হত্যাকান্ডগুলো ঘটছে। একজন বললো, এসব হত্যাকান্ডে সরকারের কিছুই করার নেই। যা করার ব্লগারদেরই করতে হবে। সঞ্চালক যতজনকেই প্রশ্ন করেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে তারা অপরাধ বলে মনে করে কিনা, কেউ একজনও এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিরোধীতা করেনি। বরং একজন তো বলেই বসল যে, শুধু শুধু হত্যাকারীদের দোষারোপ করে লাভ নাই, কেন হত্যা করেছে সেটা ভালো করে আগে ক্ষতিয়ে দেখতে হবে।

এই ফোন ইন শুনে আমার মনে কিছু ভাবনা স্পষ্টতই জেগে উঠল।

১) আমি ব্লগার, কারো কোন ধর্মানুভূতি নিয়ে আমি কখোনোই কিছু লিখিনি। তবুও কি আমি ওই ধর্মান্ধদের চোখে নাস্তিক?

২) যদি তাই হয় তাহলে কি আমিও কখনো তাদের রোষানলে পরতে পারি?

৩) একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি আমার চোখে ধরা পড়া কিছু অসংগতি নিয়ে যতটুকুই লিখছি, আস্তে আস্তে কি আমার সেই স্বাধীনতা চলে যাচ্ছে?

৪) ব্লগারদের বিচারের বিষয়টি একজন তুলে কি আমাদের পাকিস্তানী বিচার ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেনা? যেখানে ব্লাসফেমি নামক এক কলঙ্কিত আইন রয়েছে যার দ্বারা চাইলে যে কাউকেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে অভিযুক্ত করা যায়।

৫) যখন অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এমন ভাবনা আসছে যে, সব ব্লগার ই নাস্তিক সেখানে একটি সুন্দর প্রগতীশীল সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ দেশ কি শুধুই দুরাশা এখন?

৬) যে ধর্মকে ধারন করে আমরা বেঁচে থাকি (যদিও পৃথিবীতে নাস্তিকের সংখ্যা এখন অনেক) সেই ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে সেটা নিয়ে কেউ স্বাধীনভাবে বিরোধী মন্তব্য করলেই ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে? ধর্মের বিশালতা তো অসীম। কেন সেই ধর্মকে রক্ষা করার নামে মানুষ খুন করে নিজ ধর্মকেই অপমান করা? কোন ধর্মই কখনো কোনো মানুষ হত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। তবু কেন এই নৃশংসতা?

৭) কেন সরকার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলোকে অপরাধ মনে না করে ধর্মের সাথে মিলিয়ে আরো বেশি অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পথ তৈরী করছে? এটা কেমন গনতন্ত্র? কেমন বাক স্বাধীনতা?

জানি প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সবারই জানা। তবুও বারবার এই প্রশ্নগুলো এসে এলোমেলো ভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়…জানি এর সমাধান চাওয়াটাও হয়তো আবার বড় কোন অন্যায় বলে পরিগনিত হবে।