ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

যানজট, ঢাকা শহরে নিত্যদিনের সঙ্গী। সাধারণ জীবন-যাত্রা সে কারণে হয়ে উঠেছে দূর্বিষহ। সেই দূর্বিষহ জীবন আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যখন রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তা দখল করে সভা-সেমিনার, মিটিং-মিছিলের আয়োজন করে। তবে সাধারণ জনগণের করার কিছু থাকে না; চুপ থাকতে থাকতে, দেখতে দেখতে স্বাধীনতার ৪১ বছরের ব্যবধানে অভ্যাসটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, রাজনীতিতে এমন কিছু না ঘটলেই যেন ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হয়। সে কারণে জনমনে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

তবে এই শঙ্কা-ভয়-অনাস্থা, ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈ কমছে না। আগামী পাঁচ বছরে ঢাকা শহরে যানজট কোন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তা নিয়ে জনমনে হাজার প্রশ্ন। রাস্তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন তো বটেই, সেই সঙ্গে রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, ছাত্র সমাজ এবং সাধারণ জনগোষ্ঠী সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে এ সমস্যা অনেকখানি কমে আসতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই।

সেক্ষেত্রে, বাস্তব চিত্র সত্যিই উদ্বেগজনক। ব্যাক্তিগত অথবা মুষ্টিমেয় লোকের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সুশীল সমাজের বাতাবরণে বিভিন্ন এনজিও, পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনের ব্যানারে যেকোন কর্মসূচি অনেক সময়ই ব্যস্ততম দিনগুলোতে (অফিস চলাকালীন সময়) পালন করা হয়, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। এই সমস্ত কর্মসূচি ছুটির দিনগুলোতে পালন করে অনেকখানি যানজট নিরসন করা সম্ভব।

সম্প্রতি ঢাকা প্রেসক্লাবের বিপরীত পার্শ্বে বিএমএ ভবনের সামনের অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর নির্বাচন। যেটা ছিল বাংলাদেশের টপ ক্লাস সিভিল সোসাইটির এক মহা সম্মেলন। শুধু তাই নয়, ‘ডাক্তার’ শব্দটার মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মবিশ্বাস আর বেঁচে থাকার প্রেরণা। মানুষ রোগে-শোকে, জ্বরায়-যাতনায় যখন অতিষ্ট হয়ে পড়ে, যখন সে বোঝে তার বাঁচার আর কোন পথ নেই, তখনই ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। তাই এ সমাজের প্রতি ডাক্তারদের দায়বদ্ধতা অনেক।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএমএ ভবনের সামনে অফিস চলাকালীন সময়ে রাস্তা ঘিরে পেন্ডেল করার প্রয়াস হতাশ করেছে সাধারণ মানুষকে। জানা গেছে, যারা মতিঝিল, গুলিস্তান, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিল তাদের ৫ মিনিটের রাস্তা পার হতে সময় লেগেছিল ১ ঘন্টারও বেশি। ফলে রাজনীতিবিদদের সাথে আমাদের সুশীল সমাজের আদৌ কোন পার্থক্য রয়েছে কিনা, তা নিয়ে নানা মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে?

দেখা যায়, রাস্তার উপরে যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং-এর মত ঘটনা, যা আজকাল ঢাকা শহরে অহরহই ঘটছে। বাসার অদূরে মাছের বাজারে গেলেও সরু গলিটার ভেতর দিয়ে প্রাইভেট কারে না চড়ে গেলে আমাদের স্ট্যাটাস থাকেনা। কেউ কেউ আছেন, যাদের ব্যস্ততা এতটায় প্রকট আকার ধারণ করে যে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে যত্রতত্র ওভারটেকিং, লেইন চেন্জ, ব্যাক টার্ন, ইউ টার্ন করতে গিয়ে রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি আটকে পড়েন। এগুলোই যানজটের অন্যতম কারণ।

মাঝে মধ্যে রাস্তার রং সাইড দিয়ে রিক্সা বা গাড়ি নিয়ে যেতে দেখা যায়।। যিনি রিক্সা বা গাড়ি চালান, আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা তার থাকতেই পারে। কিন্তু যে ভদ্রলোক রিক্সা বা গাড়িতে বসে থাকেন, বোবার মত বসে থাকা তার পক্ষে কতটা যুক্তিসঙ্গত?

ঢাকা শহরে কিছু সুনামধন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের অতীত ঐতিহ্য আকাশচুম্বী। দেশের যেকোন সংকটে এসকল প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। সাধারণ মানুষ আশা করে, আগামী দিনের চরম সংকটের মূহুর্তে এসব প্রতিষ্ঠানের তরুণ নেত্রীত্ব দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। হতাশা এখানেও পিছু ছাড়ে না। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা মেলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাসগুলোর ক্ষমতার দাপট। কীভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে সবার চাকা থামিয়ে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, সেসব শিখতে স্কুল-কলেজে যাবার প্রয়োজন পড়বে না, রাস্তার কলেজবাসগুলোর উচ্চশিক্ষিত মেধাবী শিক্ষার্থীগুলো দেখে শিখে নেওয়া সম্ভব।

মনে রাখা দরকার, সুশীল সমাজ জাতির বিবেক। সেই বিবেককে সমুন্নত হতে হবে। যারা শিক্ষায়-চেতনায়, জ্ঞানে-মানে উচ্চতম স্থানে বিচরণ করেন, তাদের কাছে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অনেক। ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে টক-শো, পত্র-পত্রিকা এমন কি রাস্তা-ঘাটেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পাওয়া যায়, বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ কোথায়? রাজনীতি সম্পর্কে অনেক তর্ক, অনেক সমালোচনা। বলা হয় ঘুণেধরা বস্তা পঁচা রাজনীতি। সেই রাজনীতির জলেই’ত সবাই হাবুডুবু খাচ্ছি। তাহলে আমরা যারা নিজেদের মস্তবড় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলে ব্যাখ্যা করি, তাদের মাহাত্ম্য কোথায়? তারপরও এদেশের মানুষ হতাশা সাগরে নিমজ্জিত হতে চায় না, চোখে গভীর স্বপ্ন নিয়ে বারবার ফিরে তাকায় সুশীল সমাজের দিকে। কিন্তু সুশীল সমাজ যেন কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাদের দেবার কিছুই থাকেনা। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই আবার ফিরে যেতে হয় সেই রাজনীতিবিদদের কাছেই। এটাই বাঙালির নিয়তি।