ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

এবারের পয়লা ফাল্গুনের সূচনা হলো অন্যরকমভাবে। বদলে গেছে ফাগুন। তার বাসন্তী রঙ হয়ে গেছে আগুন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস ভিন্ন মাত্রা পেল। এবারের একুশে আসছে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে। বইমেলা চলছে নতুন প্রজন্মের ¯িœগ্ধ পরশে। সবই নতুন হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের এই ছোট্ট দেশে। ১২ ফেব্রুয়ারি ৩ মিনিটের দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন দেশের ইতিহাসে দাবি আদায়ের এক অভিনব আর্জি হয়ে রইল। আর ৮ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরের মহাসমাবেশ আমাদের জানিয়ে গেল তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দীপ্যমান। অথচ দেশের যুব সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ জামাত-শিবিরের তা-বে যোগ দিয়ে এখনো বিপথগামী; আবারও তাদের দেখা গেল ১২ তারিখে কাওরানবাজার-পান্থপথের গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনায়। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে কারাদ-ের রায় প্রত্যাখ্যান করে যারা সেই ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে সমবেত হয়েছিল তারা কোন রাজনৈতিক প্লাটফর্মের কর্মী নন। তারা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান; যে মধ্যবিত্ত অনেকের কাছে সুবিধাবাদী শ্রেণী হিসেবে পরিচিত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিহ্ন’ উপন্যাসে ১৯৪৬-এর আগস্ট আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে আপামর জনতা ব্রিটিশ বিরোধী মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেওয়ার কথা অসাধারণ শিল্প-আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ছাত্র-ব্লগারদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সাধারণ মানুষ, উপন্যাসেরও একটি বৃহৎ প্লট তৈরি হয়েছে এই ভাষার মাসে। মিসরের আরব বসন্তের প্রতীক তাহরির স্কয়ারের মতো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘শাহবাগ স্কয়ার’। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে যোগ দিতে শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো হয়েছে। শাহবাগের সেই আহবান ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অন্যান্য এলাকায়।
৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তাল তারুণ্যের ঢেউ দেখে মুগ্ধ হলাম। যুদ্ধাপরাধী এবং জামাত-শিবির ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমি এ পর্যন্ত বিশের অধিক কলাম লিখেছি জাতীয় পত্রপত্রিকায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শিক্ষককে কাছে পাইনি যারা নির্ভীকভাবে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে কলম ধরবে। কারণ তাদের স্বার্থপরতা, নিজেকে সুবিধাবাদী অবস্থানে রেখে চলার প্রচেষ্টা। কিন্তু আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ব্যানারে খ- খ- মিছিলে ভরে গেছে ক্যাম্পাস। শহীদ মিনারের খোলা ময়দান পরিণত হয়েছে অন্য রূপে। দেখলাম ‘জেগেছে মানুষ, ফুঁসছে দেশ। প্রাণে প্রাণে আজ একাত্তরের মৃত্যুঞ্জয়ী সাহস’ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। উজ্জীবিত অগণিত হাত আর গগণবিদারী সেøাগানে উচ্চারিত হচ্ছে একটাই দাবিÑ ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই’। তপ্ত রোদের মধ্যে বসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জাগরণের গান গেয়েছে। এরই মধ্যে তারা খরচ চালানোর জন্য সকলের কাছে চাঁদা তুলেছে। ঐক্যবদ্ধ এই প্রয়াস দেখে ছাত্রশিবির অধ্যুষিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা বর্তমান তরুণ সমাজের অন্যতম পাথেয়। দৈনিক ভোরের কাগজ লিখেছে- ‘স্বাধীনতাবিরোধী জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি হবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সবার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার ৫ তারিখ ‘মিরপুরের কসাই’ খ্যাত একাত্তরের এই ঘাতককে যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজা দেন। ফলে নিদারুণভাবে হোঁচট খায় মানুষের প্রত্যাশা। তাৎক্ষণিকভাবেই এই রায় প্রত্যাখ্যান করে ক্ষুব্ধ, হতাশ মানুষ। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, তামাবিল থেকে সুন্দরবনÑ দেশজুড়ে রাজপথে নেমে আসে প্রতিবাদী জনতা। প্রতিটি এলাকায় স্বতঃস্ফূর্ত ‘জনতার মঞ্চে’ বিক্ষুব্ধ মানুষ প্রতীকী ফাঁসি দিচ্ছেন রাজাকার কাদের মোল্লাসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ মোড়ে টানা কয়েকদিন ধরে চলছে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ৬ ফেব্রুয়ারি বুধবার এখানে ঢল নামে সকল স্তরের মানুষের। পরিণত হয় জনসমুদ্রে। মিসরের ‘তাহরির স্কোয়ার’-এর সঙ্গে তুলনা করে বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ মোড়কে ‘শাহবাগ স্কোয়ার’ নামে আখ্যায়িত করেছেন।’(৭-২-২০১৩) যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ৮ ফেব্রুয়ারির মহাসমাবেশ বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা।
আজকের তরুণরা ঠিকই বুঝেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সারা বিশ্বের মিডিয়া উৎসুক হয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ আধুনিক ও সভ্য জাতির মর্যাদায় আসীন হতে পারবে। বাঙালি হিসেবে গ্লানি মুক্তির দিন শীঘ্রই আমাদের সামনে উপস্থিত হবে বলে বিশ্বের মানবতাবাদী কর্মীদেরও প্রত্যাশা। একইসঙ্গে বিশ্ববাসী দেখতে পাচ্ছে এই বিচার প্রক্রিয়া বানচালের জন্য জামাত-শিবিরের নাশকতার তা-ব। ছাত্র-শিবির ও জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা একত্রিত হয়েছে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করে বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য। এতোদিন যাদের নেতা ও ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে আদেশ পালন করে মানুষ হত্যা করেছে; বোমা-গ্রেনেড মেরে মুক্তবুদ্ধির মানুষদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে; সেই কর্মীরা জানত না কত বড় অপরাধীদের পিছনে তারা তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়ে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করছে। তাদের সেইসব তথাকথিত ধর্মপ্রাণ মুসলিম নেতারা এখন জেলে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সারা বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে। অপরাধগুলো ভয়াবহ। জামাতি নেতারা কখনো বাংলাদেশ চায়নি; তাই মুক্তিযুদ্ধের পরও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এইসব সাদা-দাড়ি-টুপির অপরাধী মানুষগুলো পাকিস্তান ও ইসলামের নামে বাঙালি জাতিকে চিরতরে অন্ধকারে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিল; তারা ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকা-ে সহযোগিতা, প্ররোচনা এবং অনেকক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে একাত্তরের নয় মাস আমাদের পবিত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। আমাদের অকুতোভয় মুক্তিসেনাদের দৃঢ়তায় তাদের সব প্রচেষ্টাই ভেস্তে যায়। দেশ স্বাধীন হয়। আর দেশ স্বাধীন হয়েছিল বলেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে সামরিক শাসকদের সমর্থনে তার সুফল ভোগ করেছে একাত্তরের অপরাধীরাও। তাদের সন্তানরা নিজেকে শিক্ষিত করার সুযোগ পেয়েছ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছে, তাদের সমর্থকরা স্বাধীন দেশে বিচরণ করছে। কেউ কেউ নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমাদের মতে, এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের সুস্থ ধারায় আসতে হবে; দায়িত্ব নিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বোঝানোর। হরতাল, পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতা ত্যাগ করতে হবে। কারণ এসব কর্মী-সমর্থকরা গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীর কবল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছে; এখন নিজেকে গড়ে তুলতে হবে সোনার বাংলা ও জয় বাংলার প্রতিধ্বনির মধ্যে দিয়ে। শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি তাদের পাথেয় হবে। কারণ তাদের নেতাদের পিছনের ইতিহাস ভয়ঙ্কর।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে তাদের দলীয় ইতিহাস পূর্বাপর নেতিবাচক। মুনতাসীর মামুনের গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকেই দেশের মধ্যে গণহত্যা, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার জন্য আল-বদরদের দায়ী করে বিচারের দাবি করা হয়েছে। একই বছর ২৫ ডিসেম্বর বেগম সুফিয়া কামাল ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ ৫২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার দাবি করেন। ২৮ ডিসেম্বর(১৯৭১) ১৩ জন লেখক শিল্পী ও আইনজীবীর যুক্ত বিবৃতিতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যায় যোগসাজশকারীদের খুঁজে বের করার আহ্বান ছিল। ১৯৭২ সালে কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা ‘শহরে বিক্ষোভ সভা ও মিছিল’ হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ ৫ জুন ১৯৭২ সালে ঘোষণা করেন- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। হত্যার তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী ভূমিকা পালনকারী জহির রায়হান নিখোঁজ হলে দাবির আন্দোলন কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তবে বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত দাবি করে ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারবর্গ শহীদ মিনারে গণজমায়েত করেছিলেন এবং মিছিল করে বঙ্গভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঘটনা তদন্তের নির্দেশ প্রদানের কথা জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলেও ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে ৩৭৪৭১ জন বাঙালি-বিহারি দালালকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭২ সালেই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদেশ জারি করা হয়েছিল। সে সময় ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২৮৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ৭৫২ জন দোষী প্রমাণিত হয়, ২০৯৬ জন ছাড়া পায়। তবে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরের দালাল আইনে আটক কিছু ব্যক্তিকে বঙ্গবন্ধু সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর হন্তারক খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে সাজাপ্রাপ্তসহ সবাইকে ক্ষমা ও খালাস করে দেন। জিয়ার নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যৌক্তিক দাবি আবার উত্থাপিত হয়। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ জাহানারা ইমামকে সভাপতি করে ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘গণআদালত’ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্মরণাতীতকালের বিশাল সভায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার গণআদালতের সঙ্গে জড়িত ২৪জনকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় জড়িয়ে দেয়; নাজেহাল করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ব্যক্তিবর্গকে।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পরে পাকিস্তানবাদী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির যে তৎপরতা শুরু হয়েছিল তারই অনিবার্য ফল হচ্ছে বিএনপির মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনঃউত্থান। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের অপরাজনীতি শেকড় গেড়ে বসে। উল্লে¬খ্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালে জামাত-শিবিরের রাজনীতি উন্মুক্ত করতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন(বিশেষ অধ্যাদেশ ০৪ মে ১৯৭৬ এবং বাংলাদেশ সংবিধান, ৫ম সংশোধনী, ২২ এপ্রিল ১৯৭৭)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের জামাতের অপরাজনীতি শুরু হয় এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের কতিপয় নেতা ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে ঢাকায় সমবেত হয়ে পরিবর্তিত নাম ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ ধারণ করে নতুনভাবে কর্মকা- শুরু করে। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের মতো বাংলাদেশকে পরিচালনা করা। এলক্ষ্যে শিবির দেশের ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশের পরিকল্পনা করে। এবছরের(২০১৩) শুরুতে এবং গত কয়েক বছর তাদের তা-বলীলা দেখে আমরা বুঝতে পারছি কতটা সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়ে শক্তিশালী তারা আজ। বাংলাদেশে আইএসআই/তালেবান ও আল-কায়দার স্থানীয় সদস্য হিসেবে এদেশে আইএসআই/এলইটির(লস্কর-ই-তৈয়বা) এজেন্ট হয়ে কাজ করে তারা আজ বর্তমান সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর স্পর্ধা দেখাচ্ছে। মূলত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পথ চলা শুরু হলে তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত করার জন্য। আর ২০১০ সালে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভিন্ন পন্থার সন্ধানে চলতে থাকে জামাত-শিবির। তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্যে ব্যাপক সহিংস সংঘর্ষ ও বিএনপির চুপ করে থাকা আমাদের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। উপরন্তু নাশকতা সৃষ্টিকারীদের সংগঠনের রয়েছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আল-কায়দা, লস্কর-ই-তৈয়বা, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টসহ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে জামাত-শিবিরের সম্পর্ক বহুদিনের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে পৃথিবীব্যাপি সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত সংগঠনগুলো এদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইচ্ছে। এজন্যই কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন শাস্তির রায় তাদের এক ধরনের বিজয়ের হাসিও বটে(!)। আমাদের সান্ত¦না ৪১ বছর পরেও বিচার চলছে এবং রায় ঘোষিত হচ্ছে। যার মাধ্যমে আমরা জামাতে ইসলামী নেতাদের একাত্তরে অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাচ্ছি। যুদ্ধকালীন সংগঠিত মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত ব্যক্তিরা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলেই তাদের সমর্থকরা আজ হরতাল করছে, অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসররা দিশেহারা হয়ে নিজেদের বাঁচানোর জন্য দেশে অরাজকতাসহ অস্থির অবস্থা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ২০০১ সালে জোট সরকারের আমলে ৭১-এর রাজাকার-আলবদরদেরকে মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদে আসন পেতে সাহায্য করেছিল বিএনপি। পাকিস্তানপ্রেমী গণধিক্কৃত যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ নিয়ে ভিত আরও শক্ত করে নিয়েছে। তারা কেউ কেউ আবার আত্মস্বীকৃতিতে ১৯৭১-এ তাদের কর্মকা- প্রচার করেছিল।
মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় আপিল সংশোধনের কাজ এগিয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদেও পাস হয়েছে বিলটি। জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিধানও চূড়ান্ত পর্যায়ে। কাদের মোল্লাসহ অন্যদের ফাঁসির দিন আসন্ন। এজন্য সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারভিত্তিক পলিটিক্সকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। আর দরকার বর্তমান তরুণ প্রজন্মের এই উদ্দীপনা। যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক জামায়াত-শিবিরকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাদের অপতৎপরতা বন্ধের জন্য আমাদের ঐক্যের প্রয়োজন। বাংলাদেশের মাটিতে এই প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীদের স্থান হবে না। তাদের শেকড় যতো গভীরে থাকুক আমরা তা উৎপাটন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কাদের মোল্লার রায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ করেনি বলেই বাংলাদেশের সকল মিডিয়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার হয়েছে; জনতা জেগে উঠেছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের শেষ কথা তারা আজই শুনতে চায়। দেখতে চায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ-ের মতো কঠোর শাস্তি। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে শেষ কথা প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে। তরুণরাই সেই দায়িত্ব পালন করছে। প্রজন্ম চত্বরের সমাবেশের অঙ্গীকার আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মিলেই আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।