ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর ইত্যাদিকে নাশকতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে জামাত। গুলশানে গোপন বৈঠকের সময় ৭ জামাত নেতাকে ১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে এসব তথ্য জানা গেছে। জামাত-ই-ইসলামের পূর্ববর্তী গঠনতন্ত্রে ‘আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসন’ ছিল। তার দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীদের রগ কেটে হত্যায় মেতে উঠত তারা। বর্তমানে তারই প্রকাশ দেখা গেল আরো ভয়ঙ্কররূপে হরতালের নামে নাশকতায়। গতবছর(২০১২) নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দলটি ‘আল্লাহ-রসুল’ শব্দ বাদ দিয়ে দলীয় গণতন্ত্রে ব্যাপক সংশোধন আনে। সংবিধান সংশোধনের পরে তারা রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতায় মেতে ওঠে। কেবল নিবন্ধন বাঁচাতে দলীয় গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনেছে এটা স্পষ্ট। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বাদ দিলেও তারা সংযুক্ত রয়েছে একাধিক জঙ্গি ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী দলের সঙ্গে। তাদের জঙ্গি আচরণের প্রকাশ রয়েছে একাধিক ঘটনায়। ৩১ জানুয়ারি সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা (ঢাকা ও চট্টগ্রামে আধাবেলা) হরতাল চলাকালে জামায়াত-শিবির আবারও ভয়াবহ তা-ব চালিয়েছে। কর্মীদের হিং¯্রতা আতঙ্কিত করে তুললেও একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের নেতাদের ষড়যন্ত্রকে বেশি করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। কুখ্যাত বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় ঘোষিত হয়েছে। সাঈদীর রায় যে কোন দিন ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। আর অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হতে চলেছে। দেশে নির্বাচিত সরকার, বিভিন্ন আইন-শৃংখলা বাহিনী ও আইন-কানুন থাকা সত্ত্বেও জামায়াত-শিবির ভয়ানক নাশকতা চালাতে পারছে কেবল বিএনপির সমর্থনে। এর আগেও জামায়াত-শিবির বেশ কয়েকবার একই ধরনের সহিংসতা দেখিয়েছে। জামায়াত-শিবির রাষ্ট্রযন্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নিশ্চয় নয়। তবে তাদের মতো একটি সংঘবদ্ধ শক্তিকে মোকাবেলা করতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও শৃংখলাবদ্ধভাবে সক্রিয় হতে হবে। অবশ্য জামায়াত-শিবিরের কর্মকা- এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জনগণের পক্ষ থেকেই এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার দাবি উঠছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি আজকে জামাতের অযৌক্তিক হরতালকে আমরা চিহ্নিত করি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে। ২০১০ সাল থেকে দেশ-বিদেশে একটি গোষ্ঠী যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত করতে সচেষ্ট। এ গোষ্ঠীর মধ্যে দেশে সক্রিয় জামাত-শিবির-বিএনপি। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া তাদের নিয়মিত কুরাজনৈতিক কর্মে পরিণত হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ইসলামী দলগুলোর অবস্থানকে মনে রাখলে এদের উগ্র ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সুবিধা হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তারা কখনো সহজভাবে নিতে পারেনি। স্বাধীনতার পরেও পাকিস্তানপ্রীতি তাদের মানসিকতার পরিচয় বহন করে। বর্তমানে রাষ্ট্রের আইনের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড়ানোটা স্বাভাবিক। কারণ তারা এই রাষ্ট্র চায়নি। কারাগারে আটক প্রত্যেক জামাত নেতার বিরুদ্ধে অপরাধের সত্যতা রয়েছে। তথ্য প্রমাণ যাচাই করেই বলা যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি তাদের পেতেই হবে। দুর্ভাগ্য হলো এরা তাদের কৃতকর্মের জন্য কখনো অনুশোচনা ব্যক্ত করেনি। আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের শাস্তি হলে সে সাজা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য গণবিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিতে পিছ পা হচ্ছে না জামাত-শিবির-বিএনপি। একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দিবালোকের মতো পরিষ্কার। হিংস্রতার ও ব্যাপক সহিংসতা মোকাবেলায় সরকারকে কঠোর হতে হবে এ প্রত্যাশা সকলের।

সংবাদপত্রসহ সকল মিডিয়াতে বলা হচ্ছে, জামাতের সব আচরণই হিংস্র ও গণতান্ত্রিক আচরণের পরিপন্থী। এর আগে হরতাল ঘোষণার দিন ৩০ জানুয়ারি তারা গাড়ি ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। একই দিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর আক্রমণ করে এবং ব্যাপক নাশকতার পরিবেশ তৈরি করে জামাত আসলে সংবিধানপরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয়েছে। যা থেকে বোঝা যায় তাদের নেতারা যেমন বাংলাদেশ চায়নি তেমনি সেই যুদ্ধাপরাধী নেতাদের রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়ে দেশের মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেবে এবং একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সন্তুষ্ট হতে দেবে না তারা। আদালতে তারা আইনি লড়াই করছে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবু তারা কেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে মেতে উঠেছে এটা আমাদেও কাছে স্পষ্ট। তারা বর্তমান সরকারকে নাজেহাল করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে অকার্যকর করতে চাইছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকলে এই বাহিনীর প্রতি আস্থা কমে যাবে এবং জনগণ তাদের দ্বারা নিজেদের নিরাপদ মনে করবে না। ফলে আস্থাহীনতায় প্রশাসনও ভেঙে পড়বে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তারা সংবিধান স্বীকৃত একটি ট্রাইব্যুনালকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাতিল এবং আটক নেতাদের মুক্তি দাবিতে জামাতের ডাকা হরতাল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, হরতাল করে বিচার ঠেকানো যাবে না। সেই সময় হরতালে ছাত্রাবাসে আগুন লাগিয়েছে মৌলবাদীরা। পুলিশ আগুন নেভাতে গেলে জামাত-শিবির কর্মীরা পুলিশের ওপর গুলি ও বোমা ছুঁড়েছে। পুলিশ এই প্রথম পাল্টা গুলি ছুড়লে নিহত হয় দুজন। তবে তারা চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে নাকানি-চোবানি খাইয়েছে পুলিশকে। এসবের মূল কারণ জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু জনগণ তাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ট সম্পর্কও জনগণ জানে। তাদের অর্থায়নের উৎস অজানা নয়। বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক অর্থায়নে কি করেছে তারও রিপোর্ট আছে। এই দুটি ব্যাংক সম্পর্কে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ অর্থের লেনদেন ও সন্ত্রাসবাদে অর্থের জোগান দেওয়ার মত গুরুতর অপরাধের সঙ্গে ব্যাংক দুটির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলে এই ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া সম্ভব এ ধরনের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে এই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। উপরন্তু যে ব্যাংকের অর্থ জঙ্গিদের সাহায্যার্থে ব্যবহৃত হয় সেই ব্যাংকগুলো বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয় বলে আমরা মনে করি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার জঙ্গি দমনে অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে। আমরা চাই না সরকারের এই বিশাল অর্জনটি কিছু ব্যাংকের কুকীর্তির জন্য ম্লান হয়ে যাক।

মূলত গত বছর থেকে জামাত-শিবিরের দেশজুড়ে সহিংসতা ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর উপর্যুপরি হামলার একাধিক ঘটনা এই রাজনৈতিক সংগঠনটির জঙ্গি কানেকশনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত বছর(২০১২) ২৩ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জঙ্গি আতঙ্কে জামায়াত’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জামাত নেতারা মনে করছে, সরকার তাদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করতে জেএমবিসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। যে কারণে জেএমবির বোমা হামলার সঙ্গে জামাতকে জড়িত করা হয়েছে। একই সংবাদে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসগুলো জামাতের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১ শীর্ষনেতার গ্রেপ্তার ও সরকারের যুদ্ধাপরাধের বিচার আয়োজনের প্রেক্ষাপটে জামাত কোন পথে এগোচ্ছে- তা পর্যবেক্ষণে রেখেছে দূতাবাসগুলো। সংবাদটি প্রকাশের আগে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এদেশ সফরে এসে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অবস্থানের প্রশংসা করে গেছেন। অন্যদিকে ৬ নভেম্বর বারাক ওবামা দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতি যে অপরিবর্তিত থাকবে এটাও মৌলবাদী সংগঠনগুলোর কাছে পরিষ্কার। এমন সময় জামাত-শিবিরের নাশকতার তৎপরতার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হতে চলেছে; আর বর্তমান সহিংসতা তাদের দ্বারা সংঘটিত পূর্বের অনেক ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের মধ্যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জামাত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা অনেক আগেই প্রমাণিত। একই বছর ১৮ মে ‘দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ওই রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ ভিত্তিক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হুজি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়তে ‘ভারতীয় সংখ্যালঘু তরুণীরা(মুসলিম) অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেবে বাংলাদেশে’। সূত্রমতে, এ রিপোর্ট বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এতে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামাতের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে গত বছর জামাত-শিবির শীর্ষনেতাদের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ করলেও জোরালো কোনও প্রতিবাদ করতে পারেনি। এমনকি জামাতের সব জেলা ও উপজেলা কেন্দ্র ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু গত বছর থেকেই শিবির ১১৭টি সাংগঠনিক শাখার মধ্যে প্রায় সবকটি শাখায় শক্তভাবে বিক্ষোভ করেছে। জামাতের বর্তমান নেতৃত্ব দলের অনুগত ছাত্রশক্তি ছাত্রশিবিরের ওপর ভরসা করেই সরকারকে পর্যুদস্ত করার স্বপ্ন দেখছে তারা। উপরন্তু তাদের যে জনশক্তি আছে, ইচ্ছা করলে দেশ অচল করে দিতে পারে বলে শিবির সভাপতি সংবাদপত্রকে জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকা-ের মধ্যে দিয়ে যে পাকিস্তানবাদী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির তৎপরতা শুরু হয়েছিল তারই অনিবার্য ফল হচ্ছে জামাত-শিবিরের উত্থান। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের অপরাজনীতি শেকড় গেড়ে বসে। উল্লেখ্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালে জামাত-শিবিরের রাজনীতি উন্মুক্ত করতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন(বিশেষ অধ্যাদেশ ০৪ মে ১৯৭৬ এবং বাংলাদেশ সংবিধান, ৫ম সংশোধনী, ২২ এপ্রিল ১৯৭৭)। ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে ঢাকায় সমবেত হয়ে পরিবর্তিত নাম ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ ধারণ করে নতুনভাবে কর্মকা- শুরু করে। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের মতো বাংলাদেশকে পরিচালনা করে। এলক্ষ্যে শিবির দেশের ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশের পরিকল্পনা করে। ১৯৮০-এর দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আমেরিকা ও পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সহায়তা করে। এই যুদ্ধে আফগানিস্তানের পক্ষে শিবিরের সদস্যসহ বেশ কিছু বাংলাদেশী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এরা পাকিস্তানে আইএসআই-এর অধীনে এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী প্যালেস্টাইন ও চেচনিয়া যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করে। এরা প্রায় সকলেই বাংলাদেশে ফিরে আসে। এসব যুদ্ধ ফেরত সদস্যরাই পরবর্তীতে বাংলাদেশে আইএসআই/তালেবান ও আল-কায়দার স্থানীয় সদস্য হিসেবে এদেশে আইএসআই/এলইটির(লস্কর-ই-তৈয়বা) এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। এভাবে আশির দশকের পর জামাতসহ মৌলবাদী সংগঠন ও তালেবানপন্থী গোষ্ঠী সংগঠিত হয়ে রাজনীতির আড়ালে ও ইসলামের নামে জঙ্গি সন্ত্রাসী কর্মকা-সহ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও তালেবান রাষ্ট্র বানানোর একই অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। ১৯৯১-এ জামাতের সমর্থনসহ বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সালে জামাতের সহযোগিতায় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ’ আত্মপ্রকাশ করে প্রকাশ্যে জিহাদের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে কথিত জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন চালুর অভিন্ন আদর্শে জামাত ও ইসলামী জঙ্গি সংগঠনসমূহ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ শুরু করে।

এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কার্যক্রম গোপনে চলতে থাকে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলেও। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পরে ২০০৬ পর্যন্ত সারা দেশ জুড়ে জঙ্গিবাদের বিস্ময়কর উত্থান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। কারণ জোট প্রশাসন জঙ্গিদের প্রত্যক্ষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ২০০৪ সালে সারা দেশ ব্যাপী বোমা বিস্ফোরণের কথা আমরা ভুলিনি। সে সময় বিদেশি পত্রিকা থেকে আমরা জেনেছিলাম লাদেন এদেশে এসেছিল। ২০/৯/০৪ তারিখে ‘যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক একটি দৈনিকে ছাত্র শিবিরের সঙ্গে আল কায়দা বা হামাসের সম্পর্ক খতিয়ে দেখার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আজকের কাগজে’র এই সংবাদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষকম-লীর মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জঙ্গিরা যে অধিকাংশই জামাতের সদস্য সে পরিচয় স্পষ্ট পাওয়া যায় তখন থেকেই। শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার কথা এ সূত্রে মনে রাখা দরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৯ মার্চ ২০০৭ সালে যে শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করে তাদের সকলেরই জামাত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই অতীতে জামাত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৫ জুন ২০০৭ সালে দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত কয়েকজন জেএমবি সদস্য অতীতে জামাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হামলার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফজ্জামান বাবর এবং ইসলামী ঐক্য জোট নেতা মুফতী শহিদুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ‘ইসলামী সমাজ’, ‘আল্লাহর দল’ বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন। জামাতে ইসলামে একাংশ বের হয়ে তৈরি হয়েছিল ‘ইসলামী সমাজ’ আর ‘আল্লাহর দলে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিল ছাত্রশিবিরের কর্মী। ২০০০ থেকে ২০১০ এর শুরুতে(৯বছরে) সারাদেশে ছাত্র শিবির ১০০ হিংসাত্মক ঘটনায় খুন করেছে ৫০জনকে। ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম শহরে শিবিরের হামলায় এক ছাত্রলীগ নেতা ও সাতকর্মীসহ ৯জন মারা যায়। (কালের কণ্ঠ, ১০/২/১০) এসব খুনের ঘটনায় কারো কোন শাস্তি হয় নি। ফলে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পথ চলা শুরু হলে তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত করার জন্য। আর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভিন্ন পন্থার সন্ধানে চলতে থাকে জামাত-শিবির। তারা এখন ‘হিযবুত তাহরীর উল্লাই’য়াহ বাংলাদেশ’, ‘হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ’(হুজি)সহ আরও অনেক জঙ্গি সংগঠনকে তাদের পতাকাতলে একত্রিত করেছে। আর কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মগজ ধোলাই করার জন্য ধর্মভিত্তিক বিচিত্র কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কর্মসূচি হলো বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো; ধর্মের নামে ভুুল শিক্ষা দিয়ে সশস্ত্র কর্মকা-ে উদ্দীপনা জাগানো, পুলিশের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মনোবল ভেঙে ফেলা।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জঙ্গিবাদ নির্মূল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়া জরুরি। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ হবে ঐসব দেশবিরোধী ও মানবতাবিরোধী শত্রু শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসররা দিশেহারা হয়ে নিজেদের বাঁচানোর জন্য দেশে অরাজকতাসহ অস্থির অবস্থা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারই ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত দেখা গেছে ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ও ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের তা-বে। গোলাম আযমকে গ্রেফতারের পরে ১২ জানুয়ারি(২০১২) ঢাকায় এবং একইবছর নভেম্বরের ৫ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত ছাত্রশিবিরসহ জঙ্গিগোষ্ঠীর ঝটিকা আক্রমণ ও পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনাও ভাবনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তারই ভয়ঙ্কর নাশকতার চিত্র দেখা গেল এ বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহজুড়ে।

বস্তুত জামাত-শিবিরের মৌলবাদিতা এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদ পাকাপোক্তভাবে খুঁটি গেড়ে বসেছে দেশের মাটিতে। কারণ ২০০১ সালে জোট সরকারের আমলে ৭১-এর রাজাকার-আলবদরদেরকে মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদে আসন পেতে সাহায্য করেছিল বিএনপি। পাকিস্তানপ্রেমী গণধিক্কৃত যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ নিয়ে ভিত আরও শক্ত করে নিয়েছে। তারা কেউ কেউ আবার আত্মস্বীকৃতিতে ১৯৭১-এ তাদের কর্মকা- প্রচার করেছিল। জঙ্গিদের জন্য জামাতের পক্ষ থেকে মাসিক নির্ধারিত বরাদ্দ প্রায় ২ কোটি টাকা। জামাতের বরাদ্দ করা অর্থ নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির ৫০ হাজার সদস্যকে জনপ্রতি ৪শ টাকা করে দেয়া হয়। যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে জেএমবির জন্য বরাদ্দ করা হয় এই অর্থ। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে জামাতের সাবেক কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেএমবি আমির মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমানের দেয়া জবানবন্দিতে জানা যায় এসব তথ্য। জেএমবি জঙ্গি সংগঠনের দলীয় তহবিল, কর্মী কল্যাণ তহবিল ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা তহবিল নামে তিন স্তরে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে জামাত। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতেও বিশেষ বরাদ্দ তহবিল রয়েছে জামাতের। বর্তমান সরকার ক্ষমতা লাভের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালে মাঠে থাকার শর্তে সম্প্রতি জেএমবির জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছিল জামাত। সরকারের সকল পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের মতো অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে। কারণ জামাত-শিবির বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে বিডিআর সদর দপ্তরে রোমহর্ষক ঘটনা, মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা দেয়ার নামে জঙ্গি হামলা, সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সব কিছু একইসূত্রে গাঁথা। এখন সব জঙ্গি কর্মকা-ের গডফাদাররা জামাতের হাতে। এজন্য দেশের প্রতিটি সচেতন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি সচেতন মানুষের সহযোগিতায় জামাত-শিবিরের হিং¯্র তৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস। যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের এগিয়ে চলার দিন আগত, তাই সংঘাত অনিবার্য। এই সংঘাতে অশুভ শক্তির প্রতীক জামাত-শিবির ও জঙ্গি গোষ্ঠীর পরাভব সময়ের ব্যাপার। এজন্য আমরা প্রতিরোধ চেতনায় উদ্দীপ্ত। শাহবাগে সেই চেতনাই উচ্চারিত হচ্ছে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে। এ চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বাংলাদেশে। আমাদের ভয় নেই রাজাকারদের ও তাদের সমর্থকদের জঙ্গিপনায়। আমরা এগিয়ে যাব দেশপ্রেমের ঝা-া উড়িয়ে। জয় বাংলা।