ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার গোলাগুলির শব্দ এবং টিভিতে সংবাদ শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। তখনো ভাবতে পারিনি সেখানে ঘটে গেছে ‘এক ক্ষমাহীন বর্বরতা’। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে; জিম্মি করা হয়েছে তাদের পরিবারকে; নির্যাতন করা হয়েছে আরো অনেককে। ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর হত্যাকারীরা পিলখানা ছেড়ে পালাতে থাকে আর আমরা ক্রমে ক্রমে তাদের পিশাচ কর্মের নজির দেখতে পাই। পিলখানার বাতাস লাশের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে। জানতে পারি আমাদের পরিচিত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের স্বজন নিহত হয়েছেন, জানতে পারি বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা মোবারক ভাইয়ের দুলাভাই খুন হয়েছেন, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের স্বজন হারিয়ে গেছেন; জানতে পারি আরো অনেক পরিচিতজনের কাছে আত্মীয় নিহত হয়েছেন। তৎকালীন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদের জামাতা ক্যাপ্টেন রুবেলের লাশ নিতে আসতে দেখি। এসব পরিবারের সদস্যসহ আরো অনেকের পারিবারিক ছবিগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। নিখোঁজ মেজর গাজ্জালীর স্ত্রী ক্যাপ্টেন মৌসুমীর জিজ্ঞাসা ছিল আমার ছেলে অনিন্দ্য বড় হয়ে তার পিতার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি কি জবাব দেবেন।

২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ২২ সেনা কর্মকর্তা যখন বিকালে বের হয়ে আসেন তখনো কি আমরা বীভৎসতা টের পেয়েছিলাম? সেসময় স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সেই কান্নার দৃশ্য কি আমরা কখনো ভুলতে পারব? আবেগের সেই মুহূর্তগুলো ছিল অমূল্য। জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে শিশু-সন্তানসহ পরিবার জেনেছে কর্তা বেঁচে নেই। সেই মুহূর্তের নির্মম বাস্তবতার কথা স্মরণ করুন। শিশুর হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসার সেই দৃশ্য কি ভুলে যাওয়ার? ডিজি শাকিলের বাসায় বেড়াতে এসে লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারী ও তার স্ত্রী লাভলী আক্তার শহীদ হন। জঙ্গি বাংলা ভাইদের সাহসের সঙ্গে গ্রেপ্তার করেছিলেন যে মেজর গুলজার তাকেও উগ্র মৌলবাদের দোসরদের হাতে নিহত হতে হয়। রক্তস্রোতে ভেসে গিয়েছিল স্বজনের মুখগুলো। তবু যারা প্রাণে বেঁচে যান তারা ২৬ তারিখ রাতে মিরপুর সেনানিবাসে সাংবাদিকদের কাছে তাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন যখন-তখন অাঁতকে উঠেছি আমরা। পিলখানার বাতাসে আজও লাশের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। আজও স্বজনদের আর্তনাদ ভারী করে তোলে দেশের মানচিত্র। বর্বর জোয়ানরা মেধাবী সেনাদের হত্যার পরে মৃতদেহগুলো অবমাননা করেছিল। তারা লাশ গণকবর দিয়েছিল; ড্রেনে লুকিয়ে রেখেছিল; সুয়ারেজ দিয়ে নদীর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হলে পরিচয় নিশ্চিত হতে স্বজনদের দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। আর আপনজনকে খুঁজে না পেয়ে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন অনেকে। যে ব্যক্তিরা অফিসারদের হত্যা করেছিল তারা ছিলেন তাদেরই অধিনায়ক। মৃত্যু নিশ্চিত করতে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো হয়েছিল; বাসার সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে পিলখানার রাস্তা দিয়ে রক্তের দাগ লাগিয়ে হিঁচড়ে নেয়া হয়েছিল। পাশব কামনায় উন্মত্ত সেই জোয়ানদের আমরা দেখেছি লাল কাপড় মুখে; অস্ত্র হাতে ঔদ্ধত্য এবং এই স্বাধীন বাংলাদেশেই। এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে। বিডিআর সপ্তাহ চলছিল। ২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় প্যারেড পরিদর্শন করেছেন। সঙ্গে ছিলেন সেখানকার ডিজি মেজর শাকিল আহমেদ ও কর্নেল মুজিবুল হক। অথচ পরের দিন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজমকে সাদা পতাকা নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করতে হয়। এ এক নির্মম পরিহাস। ষড়যন্ত্রকারীরা এ দৃশ্য দেখে হেসেছিল নিশ্চয়? নৃশংস হত্যাকা-ের দিন জোয়ানদের দখলে ছিল পিলখানায় বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ওইদিন ৩০-এর বেশি সেনা অফিসারের পরিবার অফিসার্স কোয়ার্টার এবং মেসে অবস্থান করছিলেন। তাদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক দেড় শতাধিক। তাদের প্রায় সবাইকেই পরবর্তীতে কোয়ার্টার গার্ড এলাকায় বন্দি করে রাখা হয়। তাছাড়া ছিল বিডিআরের আনুমানিক ১০০ জন জেসিও এবং অন্যান্য পদবীর সদস্যদের ৫ শতাধিক পরিবার।

পিলখানার পার্শবর্তী এলাকার স্থাপনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হত্যাকারীদের প্রতিহতের জন্য সামরিক অভিযান হলে তা হতো অনেক হতাহতের কারণ। পিলখানার ভেতরের জীবিত সেনা অফিসার তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ হত্যাকা-ের শিকার হতেন। ৩ মার্চ সেনাবাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সেই বাস্তবতা স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন। পিলখানার নারকীয় ঘটনার পর আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে দৃশ্যের পরে দৃশ্য, বীভৎস সব আলামত। আমরা দেখতে পাই বিধ্বস্ত বিডিআর দরবার হল আর কথিত বিদ্রোহীদের ডিজির বাসভবনের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। গণকবর থেকে একের পর এক লাশ তোলার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ২৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে যখন উদ্ধার হওয়া লাশগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় তখন মনে হতে থাকে এ কোন দেশে আমাদের বসতি? লাশগুলো উদ্ধারের আগেই ২৭ ফেব্রুয়ারি মিরপুর সেনানিবাসে প্রধানমন্ত্রী ছুটে গেছেন। পরম মমতায় শহীদ সেনা কর্মকর্তার শিশু-সন্তানকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। এদিন বিডিআর সদর দপ্তরের বাইরে অনেক স্বজনকে ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় মূর্ছিত হতে দেখেছি। বিডিআর গেটের সামনে স্বজন হারাদের কান্না দেখেছি ২৭ তারিখেও। অবোধ শিশুর কান্না আজও কি থেমেছে? ডিজি মেজর জেনারেল শাকিলের মা যখন পুত্রের জন্য হাত তুলে প্রার্থনা করেন কিংবা আইজিপি নূর মোহাম্মদের মেয়ে বাঁধন যখন শোকে পাগল হয়ে ওঠেন তখন দিগন্ত বিস্তৃত কালো কাপড় আমাদের মুখ ঢেকে দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনে চেতনা উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। আমরা বারবার দেখেছি শোকাহত স্বজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কাছে টেনে নিয়ে এতিম শিশুদের আদর করছেন তিনি। ৫৭ জন শহীদ সেনা কর্মকর্তার জানাজার সেই নীরব দৃশ্য আজও আমাদের আলোড়িত করে। আমাদের সামনে তখন রাষ্ট্রীয় শোকে অর্ধনমিত পতাকা। প্যারেড স্কয়ারে জানাজার পর স্বজনদের আহাজারির দৃশ্য; বনানী সামরিক কবরস্থানে অন্তিম যাত্রায় সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলের মস্নানতা; আর সহকর্মীর লাশ কাঁধে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া সেনা কর্মকর্তাদের ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে জানাজায় অংশ নিতে আসা সেনা কর্মকর্তাদের সেনাপ্রধানের সমবেদনা জানানোর দৃশ্যও আমরা দেখেছি। এসবের মধ্যে শিশুদের কান্না থামানোর ভাষা সেদিন কার জানা ছিল? পিতার লাশের সামনে একমাত্র কন্যার কান্নার দৃশ্য আজও তীব্র হয়ে প্রাণে বাজে। আর যাদের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি তারা পিলখানার সামনে আহাজারি করে মাতম দেখিয়েছিলেন। আজও তারা সে পথে হেঁটে যাওয়ার সময় অজান্তে চমকে ওঠেন না? বিডিআরের ডিজি শাকিল আহমেদ ও তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর বেঁচে যাওয়া তাদের দু’সন্তানের জন্য আমরা কি করতে পারছি? যখন দেখেছিলাম তাদের কফিন ধরে বাকরুদ্ধ এক স্বজনের দৃশ্য। বরিশালের আগৈলঝাড়ার গ্রামের বাড়িতে নেয়ার পর কর্নেল বিএম জাহিদের কফিন জড়িয়ে শিশুপুত্রের বিলাপ কি আমরা ভুলতে পারব কখনো? ১০ বছরের রামি ও ৫ বছরের সামির বাবা মেজর মিজান নৃশংসভাবে হত্যাকা-ের শিকার হলেন ২৫ তারিখে; তার আগে ২০০৮ সালের ২২ জুন তারা তাদের মাকে হারায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি জোয়ানদের গুলিতে নিহত রিকশাচালক আমজাদ আলীর স্ত্রী-পুত্রের আহাজারি; সবজি বিক্রেতা হৃদয়ের অসহায় পরিবারের কথাও কি মনে পড়ে না?

জিম্মিদশায় থাকা সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারদের অসহায়ের মতো সৈনিকদের মানবতাবিরোধী কর্মকা- দেখতে হয়েছে; নির্দেশ মেনে চলেছেন তারা চড়-থাপ্পড় খেয়ে। দরবার উপলক্ষে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি থেকে আসা মেজর জায়েদী সেদিনের অনুষ্ঠানে সৈনিকদের রূঢ় আচরণ দেখেছেন। নিজেকে বাঁচানোর জন্য তাদের দয়া ভিক্ষা করতে হয়েছে। তাকে সহযোগিতা করার জন্য সুবেদার মেজর নূরুল ইসলামকে আহত হতে হয়েছে। আর সুবেদার মেজর গোফরানের পরিবারের প্রশংসা করতে হয়েছে। সৈনিকরা অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ২৬ তারিখে সংসদ সদস্য রেজা তাকে বের করে আনেন। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের মোকাবেলায় গণতান্ত্রিক সরকারের প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। মেজর কামরুল জীবন বাঁচানোর জন্য টয়লেটের ওপরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারপর ধরা পড়লে স্ত্রী-সন্তানদের সামনে গুলি করতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি যখন সেই নরক থেকে বের হয়ে আসেন তখন হত্যাকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রচারিত হয়ে গেছে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞে প্রধানমন্ত্রীসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা সেনাবাহিনীর ক্ষোভ নিরসনে ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা কফিনের সামনে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন যেমন তেমনি আমরা দূর থেকে জানিয়েছি বারবার। ২০০৯ সালের ১ মার্চে সেনাকুঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের সভা ছিল সব সন্দেহ বিভ্রান্তি দূর করার প্রচেষ্টার অংশ। একটি সুপরিকল্পিত পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পরে সেনাবাহিনী ক্রোধ প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন; প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেননি। সেনাপ্রধানসহ তিন বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের ভূমিকা এ জন্য দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। তার আগে ২৬ তারিখে অস্ত্রধারী দানবদের নিবৃত্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ভাষণ ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত মানবিক ও শান্তি উদ্যোগ। তার উদ্যোগের কারণেই দেশ এক ভয়াবহ সঙ্কট থেকে মুক্ত হয়েছে। শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার, স্বজন, নারী, শিশু ও নিরীহ সাধারণ মানুষ যারা পিলখানার ঘটনায় বিপর্যস্ত ও ক্ষতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শিকার তাদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে:যায় যায় দিন