ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

শোকের রেশ না কাটতেই ইতিমধ্যে নানা রকম রাজনৈতিক তর্ক -বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে সম্প্রতি গার্মেন্টস ট্র্যাজেডি নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, তাজরীন ঘটনা পরিকল্পিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেছেন নাশকতার কথা। বিজিএমইএ সংবাদ সম্মেলন করেও ষড়যন্ত্রের কথা বলেছে।

আমি এসব বিতর্কে যেতে চাইনা। আমার দাবি বাংলাদেশের সব শ্রমিকদের নূন্যতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। পোশাক শিল্পের উপর নির্ভর করে আমাদের দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলছে অথচ এই পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের আমরা কী দিতে পেরেছি?

শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করুন:
শ্রমিকরা দিন রাত পরিশ্রম করে তাদের ন্যায্য বেতন পায় না। সমাজও তাদের যথাযথ সন্মান দিতে ব্যর্থ। যখনই শ্রমিকরা আন্দোলন করে বেতন ভাতার দাবিতে , ব্যবসায়ই সংগঠনগুলো সরকারকে ভয় দেখায় যে শ্রমিকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করলে বাংলাদেশের হাত থেকে পোশাক শিল্পের বাজার ভারত বা চীনে চলে যাবে। আসলেই কী তাই?! যদি তাই হয় আমার দাবি প্রতিটি কোম্পানীর ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্টস বিশ্লেষণ করুন- কত টাকা তারা কোন খাতে খরচ করে দেখুন। দেখুন তাদের মুনাফা কত শতাংশ । সরকারের উচিত এরূপ বিশ্লেষণ করে একটি নূন্যতম বেতন, সর্বোচ্চ কাজের সময় , ছুটি , ভাতা ইত্যাদি আইন করে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া। যাতে করে যে শ্রমিকদের উপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি চলছে তারা যেন জীবন ধারণের জন্য নূন্যতম বেতন ও সুযোগ সুবিধা পায় । একটি শিল্প ক্ষেত্রের মুনাফা শুধু মাত্র মালিকরই কেন ভোগ করবে?! বাংলাদেশে এখন ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য অবাক করার মত। একদিকে জনসংখ্যার বিশাল একটি শ্রেণী দিন রাত পরিশ্রম করে সামান্য রুজি রোজগারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খায় অন্যদিকে জনসংখ্যার ক্ষুদ্র একটি শ্রেণী এতই বিলাসী জীবন-যাপন করে যা ওয়েস্টার্ন জীবনধারাকেও হার মানায় । ঢাকার অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট ,শপিং মল , হোটেল-রেস্তোরা ও বিনোদনের স্থান ও দামী গাড়ি সমূহ আসলেই গরিবের প্রতি নির্দয় উপহাস মাত্র । এই বৈষম্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও – মানুষ তাদের পদবী ও টাকার জোরে আজ সমাজে সন্মান পায় কিন্তু যাদের এই ভাগ্য নেই তারা সর্বস্ব উপেক্ষিত ও অপদস্থ হয় । এটি একটি সামজিক ব্যাধি । যে সমাজ মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনা , সেই সমাজে কোনও দিন সত্যিকরের উন্নতি করতে পারেনা ।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন:
নিরাপদ পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকদের অধিকার । কোনও রকম অজুহাতেই এই অধিকার থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করা যাবেনা । পোশাক শিল্প রক্ষার স্বার্থে হলেও প্রতিটি কারখানায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কার্যকর নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালা ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। এছাড়াও শিল্পখাতে যেকোনো নাশকতামূলক কার্যক্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে আলাদা গোয়েন্দা বিভাগ গঠন করা যেতে পারে যাতে করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কার্যকরভাবে এরূপ নাশকতা প্রতিরোধ করতে পারে ।

আমি মনে করি শ্রমিকদের নূন্যতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের চাহিদা কমবে না বরং বাড়বে। বিদেশী ক্রেতারা এখন অনেক বেশি সচেতন , বাংলাদেশ যদি নিজেকে দায়িত্বপূর্ণ ও ন্যায্য ব্রান্ড হিসবে উপস্থাপন করতে পারে বিদেশীরা একটু বেশি দিয়ে হলেও বাংলাদেশের পণ্য আমদানি করা অব্যাহত রাখবে কেননা ‘ ফেয়ার ট্রেড ‘ ব্রান্ড গুলো দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে । এছাড়াও মালিকরা যদি নিজেদের মুনাফার হার একটু কমিয়ে শ্রমিকদের ন্যূন্যতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে দীর্ঘ মেয়াদে এটি তাদের জন্যও লাভজনক হবে। তাদের ব্যবসার খ্যাতির ঝুকি (রেপুটেশন রিস্ক) ও দুর্যোগের ঝুঁকি অনেক কমে আসবে। সর্বোপরি সমগ্র বাজার হাত ছাড়া হবার ঝুঁকিও কমে আসবে। শ্রমিকরাও কাজ করতে উত্সাহিত হবে, যা উত্পাদনশীলতা বাড়াবে।

দুক্ষজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে যেকোন বিপর্যয়ের সময় কর্তৃপক্ষ ঘটনার আসল কারণ উদঘাটন না করে ও ভবিষ্যতে অনুরুপ দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য গঠনমূলক কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগেই বেশি ব্যস্ত থাকে । ফলে অনুরুপ দুর্ঘটনা ঘটেই চলে।