ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিতে হবে তবে স্থায়ী সমাধান জরুরী

মায়ানমার , বিশ্ব থেকে বিছিন্ন এ দেশটি সম্পর্কে আমাদের বা বিশ্বের যে তেমন ধারনা নেই তা আগেই জানতাম। তার পরও আমি বিছিন্ন মায়ানমারকে আমার থিসিসের বিষয় হিসেবে নেই। এ সময় আমি আবিস্কার করলাম দেশটির ভিতরকার অসারতা। ব্যাপরটি আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলাম যখন দেশটির কিছু নাগরিকের সঙ্গে কথা বলি। টেকনাফের বার্মিজ মার্কেটে অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। জানতে পারি তাদের অমানবিক জীবনযাপনের কথা। উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ইরান ও মায়ানমার এ রাষ্ট্রগুলো পৃথিবীতে বর্হিবিশ্বের থেকে অনেকটা বিছিন্ন। তাদের জীবনযাপন কৃষ্টি কালচার,অর্থনীতি,রাজনীতি যেটুকু জানা যায় তা খুবই নগন্য।

বার্মিজ মার্কেটের রোহিঙ্গাদের থেকে অনেক কিছুই জানতে পারি। পুরুষমানুষ, তাই কাঁদে নি। নারী হলে কেঁদে বাজারের সব লোককে জড় করে ছাড়ত। একজনের ভাষ্য এমন যে তাদের কোন স্থায়ী আবাস নাই, তারা যে গ্রামে বাস করত সেখানে প্রায় ৫০ টির মত পরিবার। অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের । অল্প কিছু পরিবার রাখাইন। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রাখাইনরা তাদের ফসলি জমির মধ্য দিয়ে ট্রাক্টর নিয়ে চলে, তারা নামাজ পড়তে দেখলে সামনে এসে গান বাজিয়ে দেয়, গরু ছেড়ে ফসল খাওয়ায়। বাধা দিলে আর্মিকে ডেকে আনে। এবং যার ফল হয় গ্রামছাড়া বা দেশছাড়া।

তাদের যে পাসপোর্ট নাই এটা কোন সমস্যাই তাদের মনে হয় না। কারন বিষয়টি এতবার আলোচনা সমালোচনা হয়েছে এখন এ ব্যপারে কথা বলা বৃথা এবং ব্যপারটা তাদের নিকট সমাধান হওয়া বিষয় মনে হয়। তারা মনে করে আমরা কোন দেশের নাগরিক না এটাই সত্য এবং এটাই মনস্থিত সমাধান।

আর একজন ব্যবসায়ী বলেন,বাংলাদেশ সরকারও তাদেরকে গ্রহন করবে না। তাই পালিয়ে পালিয়ে থাকি। আমার বাড়ি ছিল দুই রাখাইনের বাড়ির মধ্যে। ডান পাশে এক রাখাইনের বাড়ি এবং বামপাশে আর এক রাখাইনের বাড়ি। মাঝে আমার বাড়ি। দুই রাখাইন বাড়ির বাচ্চারা এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়িতে ঢিল মারত। কখনও ঝগড়া হত তাই আবার কখনও খেলাচ্ছলে। আমার ঘরে উপর অনবরত ঐ ঢিলের অঅঘাত হত। একদিন এব্যপারে কথা বলতে গেলে রাখাইনের সঙ্গে আমার বাকবিতন্ডা বাধে। তারপর রাত্রে আর্মি এসে আমাকে যতখুশি মারলো আর এলাকা ছেলে চলে যেতে বলল। পরদিন আমি যাই নি দেখে আমার ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই থেকে একদিন এখানে তো আর এক দিন মায়ানমার। আমাদের জীবনটা এমনই কষ্ঠে যাবে। দেখারও কেই নাই।

সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে সংঘর্ষ সংঘঠিত হয় তার কারন যাই হোক আমি তা নিয়ে চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত আমি বাংলাদেশের নাগরিক কারও সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ হলে কেউ আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলবে না। কিন্তু এমনই এমটা ভাগ্য বিড়ম্বিত একটা জাতি এ রোহিঙ্গা যা প্রায় ৫০০ বছর যাবত এ ঘাট থেকে ঐ ঘাট এ অবস্থায়ই রয়েছে। শ’পাঁচেক বছর আগে তারা নিজেদেরকে এবং আশেপাশের রাজ্যগুলোকে শাসন করত। এ জাতিটি এখন কোন দেশের নাগরিক না। কেই তাদের নিতে চায় না। এদের ভাগ্যও ঝুলন্ত অবস্থায়।

সমস্যায় জর্জরিত মায়ানমার। প্রায় প্রত্যেকটা জাতি নিয়ে রয়েছে তাদের সন্দেহ। একমাত্র বারমান জাতি নিয়েই তারা সন্তুষ্ট। কারন দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ এরা। এছাড়া সান, মন, কারেন,চীনা,রোহিঙ্গা প্রভৃতি জাতি নিয়েই মায়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলো রয়েছে দীর্ঘদিনের বৈরি সম্পর্ক। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভারত, চীন প্রত্যেকের সঙ্গেই তাদের লেগে আছে। ১৯৮০ সালেরও পূর্বে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০০০০ । এখন নিশ্চয়ই তা বেড়েছে। বাংলাদেশ এমনিই একটি জনবহুল দেশ, তার উপর আবার উদ্বাস্তু,এত ভার বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। কিন্তু যারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে, সহায় সম্বল হারিয়ে, প্রতিবেশী দেশে একটুকু মাথা গোজার ঠাই পেতে আগ্রহী । বড়ই নির্মম সে দৃশ্য। আমি রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় অনেক কঠোর অবস্থানের পক্ষপাতী। কিন্তু মনে রাখতে হবে সবাই মানুষ। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা মানুষের উপকারের জন্য। মানুষকে কষ্ঠ দিয়ে তা অনেকটা বেমানান এবং অগ্রহণযোগ্য।

১৯৬২ সাল থেকে মায়ানমারে সামরিক সরকার চলছে। ২০১১ সালে তা গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হলেও তার রেশ এখনও বর্তমান। ৬২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৮৮৮ টি গনআন্দোলন হয়। বহু লোক নিহত হয়। থাইল্যান্ড সীমান্তে প্রায় তিন লাখ উদ্বাস্তু রয়েছে। যারা মায়ানমার থেকে গিয়েছে। সামরিক সরকার যে নির্যাতন করেছে এবং তার যে নিত্য নতুন ধারায় করা হয় তা রোহিঙ্গা বা কারেনদের দেশ ছাড়াকে সর্বোত্তম বলে পরিগণিত করে। ফলে তারা কষ্টে হলেও পার্শ্ববর্তী দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে থাকতে পছন্দ করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর।

বাংলাদেশের উদ্বাস্তুগুলো দেশে বিশেষ এক সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে। বিভিন্ন দেশে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তার দায় পড়ছে বাংলাদেশের ঘাড়ে। মাদকদ্রব্য পাচার , চোরাচালান প্রভৃতির সঙ্গে তারা জড়িত এর জন্য দেশের যুবসমাজের প্রভুত ক্ষতি হচ্ছে। আবার তারা একবার এদেশে এল আর ফেরত যেতে চায় না। কারন মায়ানমার তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয় না। রোহিঙ্গাদের ভিনদেশী মনে করে। আবার রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ায় মায়ানমারের ধর্মীয় রীতিনীতি থেকেও তাদের আচরন আলাদা। এসব সমস্যার কারনে রোহিঙ্গারা যেতে চায় না। ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বোঝা বাংলাদেশকে বইতে হচ্ছে।

বর্তমান পেক্ষাপটে সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ে অনড় অবস্থান প্রশংসার দাবিদার। দেশপ্রেমিকের পরিচায়ক। কিন্তু সেটা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারে ভিতর থেকে ,দেশের ভিতর থেকে এবং আন্তর্জতিকভাবেও অনেক চাপ মোকাবেলা করে সরকার যে বলেছে রোহিঙ্গাকে তারা নেবে না তা অনেক বড় সাহসিকতা। ধন্যবাদ জানাচ্ছি পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে কতক্ষন পারবেন? এটুকু এখনও বোঝা যাচ্ছে, সরকার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই রোহিঙ্গাকে উদ্বাস্তু হিসেবে গ্রহন করতে সম্মতি দিবে। কারন ইউএনএইচসিআর,ইউএন,আমেরিকা, দেশীয় মিডিয়া এবং বিরোধী দলের সম্মিলিত চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে। খুবই মর্মান্তিক যখন ঐ ছবিটি দেখা যায় যে নৌকাভর্তি একটি পরিবারের পুরুষ সদস্য একটু আশ্রয়ের জন্য উন্মত্ত কান্না। খুব কম মানুষই আছেন তখন মন থেকে বলে উঠবে ৭১ সালে আমরাও গিয়েছিলাম ভারতে। ঠিক একইভাবে কিন্তু আমরা স্থান পেয়েছিলাম। আর আশ্রয়হীন রোহিঙ্গা জাতি আজ সমুদ্রে এ ঘাট থেকে ঐ ঘাট করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোন কূলে ভিড়তে পারছে না।

বাংলাদেশের এদের আশ্রয় দেয়ার পূর্বে এ সমস্যার সমাধানের বিষয়ে একটি নীতিমালা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বরাবর দেয়া উচিত যাতে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি না হয়। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও কথা উচিত। আর সমস্যাটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে মায়ানমারের সঙ্গে কথা বলা জরুরী।এতদিন বিছিন্ন থাকলেও এখন মায়ানমার যুক্তরাষ্ট ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে থাকে। মায়ানমার এখন সে চাপকে এড়াতে পারবে না বলে মনে হয় না। না হলে বহুদিন ধরে ২০০০০০ উদ্বাস্তু নিয়ে সরকার এমনিতেই সংকটে রয়েছে তারপর আরও । যা ঐ অঞ্চলের একটি সামাজিক সমস্যার কারন হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব সরকারের স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত ।

বিজনেস জার্নালিস্ট
দৈনিক বণিক বার্তা