ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

প্রধানমন্ত্রী বুধবার (৪ জুলাই, ২০১২) সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তার দুটি মোবাইল ফোন নাম্বার এবং ই-মেইল ঠিকানা নাগরিকদের জন্য প্রকাশ করে বলেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম ভাঙিয়ে কেউ কমিশন চাইলে বা অবৈধ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করলে তা তাঁকে জানাতে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা একটা বিরল দূঃসাহসী ঘটনা!

প্রথমে আমরা অনেকেই মনে করেছিলাম আর দশটা রাজনৈতিক চমকের মতো এটাও একটা – কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সত্যি সত্যিই ফোন রিসিভ করা শুরু করেছেন! এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করে হাজার কথা লিখা যায় – কিন্তু সে লোভ সম্বরণ করছি। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, তেমনি আনন্দে উদ্ভাসিত হওয়ার আগেই মনে ভর করা কিছু গভীর আশংকার কথা বলছি।


সর্বপ্রথম আশংকা হলো, দুর্নীতির তথ্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর দুটি প্রকাশ করলেও অনেকেই ফোন করবেন ব্যক্তিগত এবং নিজ এলাকার সমস্যা নিয়ে। এমনকি তাঁর সাথে শুধু একবার কথা বলার লোভেও অনেকে কল করবেন। এভাবে বাছ-বিচারহীন ভাবে যেকোনো ছোটো-বড় সমস‍্যা তাকে জানানোর ১৬ কোটি সরলপ্রাণ জনগনের আকাঙ্খার বিপুল বিড়ম্বনার ভার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতোদিন সইতে পারবেন? আমরা বুঝি, এটা নিতান্তই অসম্ভব! আমি নিজেও একবার অন্তত প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না! কাজেই, জনগনের জন‍্য তিনি যে বাতায়ন খুলে দিয়েছেন তা কখন যে বন্ধ হয়ে যায় সে আশংকায় আছি!

দ্বিতীয় শংকা হলো, চাটুকারের দল! প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সেকেন্ড মহা-মূল‍্যবান। অথচ, এই চাটুকারের দল ফোন করে কাজের কথা বলার চেয়ে চাটুকারী কথার ভারেই উনাকে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে! আর সারা দেশের দলীয় নেতা কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার জন‍্য, পদ-পদবীর জন‍্য লক্ষ-কোটি কল করে অচিরেই তাকে হাঁপিয়ে তুলবে!

তৃতীয় শংকা হলো, আমাদের মতো গরীব দেশে প্রধানমন্ত্রীকে জানালেই সকল সমস‍্যার সমাধান হয়ে যাবে না – এটা সত‍্য; কিন্তু যখন জনগণ তাঁকে জানিয়েও সমাধান পাবে না তখন তিনি যেমন জনগনের আস্থা হারাবেন – তেমনি জনগনের মাঝেও নেমে আসবে হতাশা ও আশ্রয়হীনতা!

চতুর্থত, বিপুল কলের ভার বইতে না পেরে যদি শেষমেষ তিনি সরাসরি ফোন না ধরে অন‍্য কাউকে দায়িত্ব দেন – তবেই ঘটবে মহা বিপর্যয়! যাকে দায়িত্ব দেবেন সে ই বনে যাবে মহা দুর্নীতিবাজ! এ এক উভয় সংকট! জানিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিভাবে এ সমস‍্যার সমাধান করবেন।

আমি একজন রাজনীতি-সচেতন লোক – কখনো কোনো দলের সংগে যুক্ত ছিলাম না, ভবিষ‍্যতেও যুক্ত হবার ইচ্ছে নেই। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতি পূর্ন শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি আমার কোনো অনুরাগ ছিলো না। নবীনদের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের চমকদার মন্ত্রীসভার ঘোষণার পর শেখ হাসিনা, তথা এ দলটির প্রতি বেশ একটা আগ্রহ জন্মেছিলো যেটা বেশীদিন স্থায়ী হয়নি! এখন আবার প্রধানমন্ত্রীর ব‍্যক্তিগত ফোন নাম্বার প্রকাশের ঘটনায় তার প্রতি আরেকবার শ্রদ্ধাবনত হচ্ছি!


প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একটা বিনীত আব্দার, দয়া করে ১৬ কোটি সরলপ্রাণ দূঃখী মানুষের জন‍্য যে বাতায়ন আপনি খুলেছেন সেটা বন্ধ করবেন না! আমরা জানি, এতে আপনার চরম কষ্ট হবে, আপনার দৈনন্দিন জীবন-যাপন দূঃসহ হয়ে উঠবে – তার পরও বন্ধ করবেন না! আপনি তো এই দেশের জন‍্য সবই হারিয়েছেন। জনগনও আপনাকে কম দেয়নি – দু’ দু’বার প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে, মাথার তাজ করে রেখেছে। আপনি তাদেরকে শুধু এতটুকু সময় দিন। আমরা আমাদের কষ্টের কথাগুলো শুধু আপনাকে বলতে চাই – সরাসরি! সমাধান হোক চাই না হোক! আমরা আমাদের কষ্ট বুকে দাবিয়ে নিয়েই কেঁদে ফিরবো হাসি মুখে – যদি শুধু আপনি শোনেন আমাদের কথা!