ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

বিগত কয়েকদিন ধরিয়া এক নিদারুণ আতঙ্কে দিনাতিপাত করিতেছি। এই আতঙ্কের হেতু না বলিলেও অনেকে বুঝিতে পারিবেন। আবার অনেকে বুঝিবেন না। যাহারা কিছুতেই কিছু বুঝিতে পারেন নাই উহাদিগের জন্য ব্যাপারটা খোলাসা করিয়া বলি। আমাদের মাননীয় প্রধান নেতাজী সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে চার মাইল-ব্যাপী একখান কালভার্ট নির্মাণের ঘোষণা দিয়াছেন।

অনেকেই বলিবেন, ঘোষণা তো ভালই ইহাতে আতঙ্কের কি দেখিলেন?

নেতাজী অর্থায়নের রূপরেখা ঘোষণার সাথে সাথেই বাংলার দেশ-দরদী ছাত্রসমাজ, শিল্প-সমাজ, শিক্ষক-সমাজ, চাকরিজীবী সমাজ,জ্ঞানীগুণী বিদগ্ধসমাজ সমস্ত একত্রিত হইয়া মাননীয়কে সাহায্যের ঘোষণা দিয়াছেন। পত্রিকায় প্রকাশ বাংলাদেশের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ অনুষদের ৬০০০ শিক্ষার্থীবৃন্দ মিলিয়া ৬৫০০ টাকা অনুদান দিয়াছেন, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদিগের এক সংঘটন উহাদের মূল বেতনের একদিনের টাকা সরকারের উক্ত ফান্ডে জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়াছেন। অতঃপর পত্রিকা মারফত জানা যায় আমাদের শিল্পগোষ্ঠীসমূহ নেতাজীকে তাহার ঘোষণার জন্য অভিনন্দন জানাইতে শুরু করিয়াছেন যদিও উহাদের সাহায্যের পরিমাণ জানা যায় নাই। বিশেষ পত্রিকা সমূহের কতিপয় বিদগ্ধ লেখক সমাজ নেত্রীর এহেন সাহসী ভূমিকার স্তুতি-মার্কা বিশ্লেষণ করিয়া নেতাজীর নৈকট্য লাভের পথে আরও একধাপ আগাইয়া গিয়াছেন।

বলিবেন, ভালোই তো আপনার আতঙ্কের কি হইল?

না মানে বলিতেছিলাম, এই দেশীয় দাতাদের এই বিশাল !!!!! দান সমূদয় একত্রিত করিয়া আশা করা যায় ভিত্তি-ফলক উন্মোচন করা যাইবে।

বলিবেন, ভিত্তি-ফলক উন্মোচন করিলে আপনার সমস্যাটা কোথায়?

বাঙ্গালী-জনিত অভিজ্ঞতার আলোকে বলিতে পারি ভিত্তি-ফলক উন্মোচিত হইবার পরে সেতুর কার্য শুরু করিবার জন্য নেতাজী চাপে পড়িবেন এবং উপায়ান্তর না দেখিয়া নেত্রীকে কাজ শুরু করিতে হইবে।

বলিবেন, তাহলে তো ভালোই কার্যটা অবশেষে শুরু তো হইবেই।

বলিতে চাই এইখানেই তো আমার আতঙ্ক। বাস্তবতা বিবর্জিত হইয়া শুধুমাত্র আবেগস্বর্বস্ব হইয়া এতো বিরাট প্রকল্প শুরু করিলে আমাদের পেটে তো লাথি পড়িবে। কিয়দংশ তোষামোদি জনতার অনুদান লইয়া একখান বিশাল কালভার্টের কার্যের প্রারম্ভিক কার্যাদিও সম্পাদন হইবে না এই কথা বলিবার জন্য অর্থনীতিবিদ হইবার প্রয়োজন পড়ে না। এই অনুদান শেষ হইবার পর আমাদের রাবিশ উপাধিপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ব্যাংকের রিজার্ভের উপর টান দিবেন ইহা এক প্রকার নিশ্চিত। ব্যাংকের এই রিজার্ভ টাকা লইয়া যে সেতুর এক চতুর্থাংশ কার্যও সম্পাদন হইবে না তাহাও হলফ করিয়া বলা যায়। রিজার্ভ শেষ হইলে মুদ্রার মান ফুলিয়া তুলারুপ হইয়া যাইবে উহাও নিশ্চিত। ফলে দেশের অর্ধেকের ও বেশী মানুষের পেটে লাথি পড়িবে। তদুপরি এই অভুক্ত জনসাধারণ যে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করিয়া ফেলিবে উহা বলিবার জন্য সমাজবিজ্ঞানী হইবার প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়াও নতুন নতুন খাত সৃষ্টি করিয়া জনাব রাবিশ নাগরিকের নাভিশ্বাস কে মরণ-শ্বাসে রূপান্তরিত করিবেন না এই কথা হলফ করিয়া বলা যায় না।

নিশ্চয়ই বলিবেন, আমরা সবাই মিলিয়া চেষ্টা করিলে এই টাকার সংস্থান করাটা নিশ্চয় অসম্ভব হইবে না?

মানি অসম্ভব হইবে না। এবং আমাদের নেতাজীও ঠিক সেই পথেই আগাইতেছেন। জাতীয়তাবাদী চেতনা উগরে দিয়া বাঙ্গালীর আবেগকে পুঁজি করিয়া উহার চতুর্পার্শ্বীয় অসাধারণ, নিষ্কলুষ!! ব্যক্তিবর্গের রুটি হালুয়া ভোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করিয়া দিতে চাইছেন। এমনিতেই ন্যুনতম নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত হইয়া চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হইয়া নাগরিক প্রতিনিয়ত নেতাজীর মুন্ডুপাত করিতেছে তদুপরি তাহার আজাইরা আহবানে সাড়া দিবে এমন মানুষ খুঁজিলে অল্পই পাওয়া যাইবে বলে বিশ্বাস। তাহার উপর উক্ত দানবাকৃতি কালভার্ট নির্মাণকার্য শুরুর পূর্বেই উহার ভাগ বাটোয়ারা লইয়া সরকারের আস্থা-ভাজন বিশেষ মহলের দ্বন্দ্ব, অতঃপর বিশ্বব্যাংকের চুরির অভিযোগ, চোরের প্রতি নেতাজীর ইগোজনিত পক্ষপাত অতঃপর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহার তাহার প্রতি আমাদিগকে বিরূপ করিয়াছে। এই ঘটনার পরপরই নেতাজীর বিশ্বস্ত এক নেতার বিশ্বব্যাংকের প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ, উহাতে নেতাজীর সম্মতি জ্ঞাপন এবং ইত্যাকার সময়ে সরকারের বেদবাক্যে পরিণত হওয়া আমাদেরকে আরও একদফা বিরক্ত করিয়াছে। এই সুযোগে একখান প্রশ্ন রাখিবার চাই, নেতাজীর ভাষ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাংক হইতেছে একটি দুর্নীতি-গ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। আমাদের নিষ্কলুষ!!!! বর্তমান সরকারের নিশ্চয় এই কলুষিত প্রতিষ্ঠানের সহিত কোনরূপ সম্পর্ক রাখা নীতিবিরুদ্ধ হইবে। সুতরাং পদ্মা সেতুর অর্থায়নের পূর্বে এই দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের সম্পর্ক লইয়া একটু জানিতে চাই। পত্র পত্রিকা মারফত জানা যায় আমাদের নিষ্কলুষ সরকারের হালুয়া-ভোগীরা তাদের উল্লেখিত এই দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠানের সহিত সম্পর্ক ঠিক করিবার নিমিত্তে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাইতেছেন। বিশেষ করিয়া জনাব রাবিশের চেষ্টার জন্য উহাকে বাহবা দিতে হইবেই। নীতির প্রশ্নে আপোষহীন!!!! নেতাজীর প্রধান সেনাপতি গংদের এই চেষ্টা তাহার মুখনিঃসৃত বাক্যাবলীর নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এই ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

নেতাজীকে বলিতে চাই আগে নিজে পরিশুদ্ধ হোন। প্রায়শ্চিত্ত করুন। আপনার সরকারের ভেতরে থাকা চোরদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। তারপর জনগণের কাছে আসিবেন। শপথ করিয়া বলিতে পারি, জনগণ আপনাকে খালি হাতে ফিরাইবে না। জাতিয়তাবাদী চেতনা হালে বল পাবে। তা না করে আপনি যাহা করিতে চাহিতেছেন উহা শুধু আপনাকে একা ডুবাইবে না সমগ্র বাংগালীকে একসাথে ডুবাইবে।