ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১।
চলমান সময়ে বাঙ্গালের নিকট হাইকোর্ট এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রূপে গণ্য হচ্ছে। বাঙ্গাল দেখেছে, হাইকোর্ট বিভিন্ন বিষয়ের উপর উহার মূল্যবান পর্যবেক্ষণ প্রদান করছেন। বাঙ্গাল জানে হাইকোর্টের এই “হাইকোর্ট” দেখানোটা খুব একটা পুরনো নয়। অবধারিতভাবেই হাইকোর্টের এই হাইকোর্ট প্রদর্শন বেশ গুরুগম্ভীরভাবে গৃহীত হচ্ছে।

একসময় বাঙ্গাল হাইকোর্টকে খুব ভয় পেত। হাইকোর্টের আশে পাশে যেত না। হাইকোর্টের লাল দালানগুলো ছিল বাঙ্গালের কাছে এক চরম ভীতিকর বস্তু। তবে ইদানীং তার এই ভীতি ঘুচেছে বলে জানা যায়। তদুপরি বাঙ্গালকে হাইকোর্টের চারিপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, কর্তারা হাইকোর্টের বিরুদ্ধে বেশ শক্ত অবস্থান নিয়েছেন বলে বাঙ্গালের নিকট অনুমিত হয়। তাই বর্তমানে বাঙ্গাল হাইকোর্ট বিষয়ক ব্যাপার স্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী।

২।
কর্তা-বাবুরা চরমভাবে বিরক্ত। ভ্রু কুচকে ভাবেন, কোন কুক্ষণে নিজেদের মধ্যে মারামারি করলাম। এর ফলেই তো দু বছর মহলের বাইরে থাকতে হলো। সেই সুযোগে হালুয়া ভোগীর সংখ্যা বেড়ে গেল। পূর্বে হালুয়া ভাগাভাগি হতো দু পক্ষের মাঝে। এখন দেখা যায় প্রায়ই আরেকপক্ষ এসে বাগড়া দেয়। খানিকটা ভাবনায় পড়তে দেখা যায় কর্তাকে, পূর্বে তো এই হাইকোর্ট দেখিয়েই বাঙ্গালকে বুডো আঙ্গুল দেখিয়েছিলেন।

বাঙ্গালের ঠিক মনে পড়ে না, কর্তা-বাবুরা কেন জানি হঠাৎ হাইকোর্টের উপর বিরক্ত হলেন। হালুয়ার শ্বেতপ্রসাদে বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুললেন হাইকোর্টের বিরুদ্ধে। তবে কি হাইকোর্ট কর্তাদেরও “হাইকোর্ট” দেখালো। সেদিন কর্তাদের মধ্যে যারা বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলছিলেন তাদেরকে বেশ কিছুদিন উচ্চকিত হতে দেখেনি বাঙ্গাল, অবশ্য কতিপয় কারণ ছিল যার বেশীরভাগই মনে করতে পারে না বাঙ্গাল। আবছা স্মৃতিতে মনে পড়ে, হাইকোর্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকিত কর্তাবাবু নাকি চোরা সাব্যস্ত হয়েছিলেন সাম্প্রতিককালে। বাঙ্গাল অবশ্য এইসব কথা সব সময় মনে করতে চায় না। তবে স্মৃতিকে তো পোষ মানানো যায় না…

৩।
শৈশবের অমলিন স্মৃতিতে বাঙ্গালের মনে পড়ে কিছু মুখ। মনে হয় এইতো সেদিন তারা শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলেছিলেন, কৃষাণ সমিতি গঠন করেছিলেন, মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ আরো কি কি শক্ত কথা বলেছিলেন, সব অবশ্য বাঙ্গাল ঠিকমতো বলতে পারবে না। তবে তারা যা বলেছিল তার সব কিছুর মর্মার্থ তার স্মৃতিতে এখনো ভাস্বর। তারা বলেছিল কোন শ্রেণী বৈষম্য থাকবে না। বলেছিল, মহাজন, পেটো বুর্জোয়া শ্রেণীর কেউ থাকবে না। বলেছিল, মজুরদের হাতেই কুক্ষিগত থাকবে সকল ক্ষমতা। বলেছিল, সমবন্টন হবে সকল সম্পদের।

মনে করার জন্য কষ্ট করতে হয় না। বাঙ্গালের ফিকে হওয়া স্মৃতিগুলো উজ্জ্বল হয়ে আসে, মনে পড়ে তারা শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্র-কামীদেরকে পেটো, বুর্জোয়া বলে গালি দিয়েছিলেন। আর এখন সেই পেটো বুর্জোয়াদের সাথে বসেই ক্ষমতার রুটি হালুয়ার ভাগ পাচ্ছে এককালের শ্রেণী সংগ্রামীরা।

৪।
শ্বেত প্রাসাদে সেদিনের সেই উচ্চকিত কণ্ঠের অধিকারীদের সাথে শ্রেণী সংগ্রামীদের চেহারার মিল খুঁজে পেয়েছিল বাঙ্গাল। তবে বাঙ্গালের কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিলো না হাইকোর্টের সাথে রুটি হালুয়ার দ্বন্দ্বে এককালের শ্রেণী সংগ্রামীরা তথাকথিত পেটো বুর্জোয়াদের রক্ষায় মরিয়া ভূমিকা নেবে। এককালে বাংলার প্রখ্যাত সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা গণতন্ত্র রক্ষায় মরিয়া ভূমিকা পালন করছেন দেখে বাঙ্গাল তাদের দেশপ্রেম!! দেখে মুগ্ধ হয়েছিল।

অবশ্য শোনা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় এইসব সমাজতন্ত্রীরা মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনের চেয়ে তাদের দিকনির্দেশনা কারী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন চরমভাবে। এরূপ পরম আনুগত্যের নিদর্শন নাকি পৃথিবীর কোন জাতিই পূর্বে দিতে পারে নি। এরই স্বীকৃতি স্বরূপ তাদেরকে রুটি হালুয়ার ভাগ দেয়া হল কিনা তাও অবশ্য বিবেচনাধীন বিষয়।

৫।
বাঙ্গাল রাজনীতির প্যাঁচগোছ খুব একটা বোঝে না, বুঝতে চায় ও না, সে ক্ষমতার রুটি হালুয়ার ভাগ চায় না, এমনকি সে তথাকথিত শ্রেণী বৈষম্যের নিরোধ ও চায় না। সে দু’মুঠো ভাত চায়, এক মুঠো শান্তি চায়, আর চায় আধ মুঠো নাগরিক সুবিধা।

৬।
বাঙ্গাল ইতোমধ্যে অনেক ঠেকেছে। হয়তো বলা যায় ঠেকে শিখেছে। সে এখন জানে কর্তা-বাবুরা কিংবা হাইকোর্টের কেউই তাদের স্বার্থরক্ষায় লড়ছে না। এমনকি তথাকথিত শ্রেণী সংগ্রামীরাও তাদের স্বার্থরক্ষায় লড়েনি, গুটিকয় যারা এখনো বলে তারাও লড়ছে না। সে বুঝেছে, তারা তাকে ব্যবহার করতে চায়। ব্যাবহার করে অন্তত ন্যূনতম রুটির ভাগ পেলেই শ্রেণী সংগ্রাম শ্বেত প্রাসাদের পেছনের কবাট দিয়ে অন্তর্ধান করবে। বাঙ্গাল এখন জানে , তার অধিকার আদায়ের জন্য তাকেই লড়তে হবে। আপন স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আপন রীতি অনুসরণ করে লড়তে হবে।