ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১।
যখন খুব ছোট ছিলাম ক্লাসে স্যার দেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদদের জীবনী’র রেফারেন্স টানতেন। বুক টান টান করে স্নেহ সিক্ত কণ্ঠে বলতেন, জানো এইসব মনীষীর কল্যাণেই আমরা একটি নতুন ভূখণ্ড পেয়েছি, আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি। বলতেন, এইসব মানুষ যদি তখন আমাদের অধিকারের জন্য রুখে না দাঁড়াতেন হয়তো তোমাদেরকে উর্দু ভাষায় পড়াশোনা করতে হতো। আমাদের কোমল হৃদয় স্যার এর কথা বিশ্বাস করতে চাইতো না। ভাবতাম, যাহ এ হয় নাকি। এখন বুঝি উনি সত্যিই বলতেন। স্যার যখন এই মানবদের কথা বলতেন মনে হতো তাঁরা যেন তার কতো আপনজন। তাদের কীর্তি শুনে আমাদের আবেগপ্রবণ কোমল হৃদয় কতবার যে অনুপ্রাণিত হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

২।
কৈশোরে পদার্পণ করলাম। আস্তে আস্তে নিজস্ব বিবেচনা-বোধ জাগ্রত হচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, আমাদের শিক্ষকরা আর রেফারেন্স হিসেবে আমাদের রাজনীতিবিদদের টানছেন না। তাঁরা ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে ব্যাবহার করতে শুরু করলেন ভিনদেশী রাষ্ট্রনায়কদের রেফারেন্স কিংবা ঐতিহাসিক চরিত্রের রেফারেন্স। মনে প্রশ্ন জাগলো, হঠাৎ কি এমন মনো-জাগতিক পরিবর্তন হলো যে আমাদের শিক্ষকরা নিজদের সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের রেফারেন্স ছেড়ে সোজা বিদেশ বিভুই এ চলে গেলেন? মনের প্রশ্ন মনে জমা রয়েই গেলো কাউকে জিজ্ঞেস করে উত্তর জেনে নেয়ার সাহস, সামর্থ্য, মানসিকতা কিংবা পারিপার্শ্বিকতা ছিলো না।

৩।
বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পদার্পণ করার সাথে সাথে হঠাৎ সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। শিক্ষক দের মনোজাগতিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যা পেলাম। টের পেলাম রাজনীতিবিদদের চরিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। অল্প প্রয়াসেই বুঝলাম আমাদের রাজনীতিবিদদের অগ্রজের সাথে অনুজের চরিত্রগত পার্থক্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রের এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা পেলাম আহমদ ছফার কাছে (বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা দৃষ্টব্য)।
মহাত্মন অতি সূক্ষভাবে বাংগালী উঠতি পুঁজিপতিদের সুবিধাবাদী মনোভাবকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছেন। তাঁর যুক্তি অকাট্য। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উঠতি পুঁজিপতিদের প্রভাব বিস্তার এবং তৎপর-বর্তী রাজনীতিতে স্বার্থন্বেসী চিন্তাভাবনার আবির্ভাব তাঁর যুক্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। মুক্তিযুদ্ধে এই শ্রেণি কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তৎপর-বর্তী সময়ে এই বিশেষ রাজনীতিবিদরা কিভাবে প্রভাবিত করেছে তাঁর একটি অত্যুজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায় একজন মুক্তিযোদ্ধার উক্তিতে, “আমার ফাঁসি চাই”।

৪।
আমাদের যে মহান রাজনীতিবিদেরা বাঙ্গালী কে নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত করেছেন তাদের সাথে এই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের ফারাক বোঝার জন্য তাদের চরিত্রগত বিশ্লেষণ করার দরকার হয় না। শুধু তাদের বজ্র-নিনাদ শুনলেই চলে। অবিভক্ত বাংলার সুভাষ বোস যখন রাজনীতির মাঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ভারত ছাড়। তখন ইংরেজদের ভিত পর্যন্ত নড়ে গিয়েছিল। কংগ্রেসের ভরা মজলিসে দাঁড়িয়ে যখন শেরে বাংলা বলেছিলেন, “ইংরেজদের কাছ থেকে জাত বিচার করেই শুধু ন্যায়বিচার চাওয়া যাবে না। এই বাংলার মুসলমানদের কথাও ভাবতে হবে”।
স্বাধীন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দীর গণতন্ত্রের ঝান্ডাধারী বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বার বার প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যখন তাঁর দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দেশের মজলুম নির্যাতিত কৃষকের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানীদের বৈষম্যের কারণে আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর বাংলার রাজনীতির আরেক সিংহ পুরুষ ঘোষণা দিয়ে বসলেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল……।
এই রাজনীতিবিদরা কি তাদের স্বীয় স্বার্থের জন্য রাজনীতি করেছেন? আপন স্বার্থ রক্ষার্থে কি বারবার তাদের বজ্রকন্ঠ উচ্চারিত হয়েছে? নিশ্চয়ই না। তারা আমজনতার রাজনীতি করেছেন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। পরিণতিতে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের সার্থক রূপায়ন ঘটেছে।

৫।
সেদিন অনেকদিন পর হঠাৎ এক বন্ধুর সাথে দেখা। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে দোস্ত কি অবস্থা তোরে তো দেখাই যায় না। বন্ধু উত্তর দিল, দোস্ত পলিটিক্স নিয়ে একটু ব্যস্ত আছি। আমি তো অবাক! ঘটনা কি, যে ছেলে লাইব্রেরী ছেড়ে কখনো খেলার মাঠেও যায় নি, সে সোজা রাজনীতির মাঠে? একটু চেপে ধরতেই বললো, “কি করবো দোস্ত বল, অনার্স শেষ হয়ে আসলো, আমার আবার মামা খালু নেই, বিশেষ সার্টিফিকেট ও নেই তাই বাধ্য হয়ে পলিটিক্সের সার্টিফিকেট নিতে হচ্ছে।এই হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমরা আমাদের রাজনীতিকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে এসেছি যে, মনে করা হয় রাজনীতিই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো ব্যবসা, রাজনীতি করলেই সকল ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান সম্ভব। সম্ভব কি অসম্ভব সে বিতর্কে যেতে চাই না। এই সম্ভাবনাটাই আমাদের সমষ্টিগত অর্জনের পথে কতো বিশাল অন্তরায় তা আমাদের বুঝতে হবে।

৬।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে উত্তাল রাজনৈতিক নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।আজকের অবরোধেই ৪ টি প্রাণের অকাল সমাধি ঘটল। তন্মধ্যে এক জায়গায় দেখলাম, একজনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একসময় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলতে গুপ্তহত্যা কে বোঝানো হতো। এখন দেখছি প্রকাশ্য দিবালোকে গণপিটুনি দিয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা করা হচ্ছে। বিক্ষোভ রত একদলের উপর লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে আরেক দলকে। যেন একদল হিংস্র হায়েনা কে লেলিয়ে দেয়া হলো ক্ষুধার্ত একদল শিয়ালের উপর। এও আমাদের রাজনীতির এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।

৭।
আমরা কি এই রাজনীতি চেয়েছিলাম? একটি স্বাধীন স্বভূমির জন্য আমার যে পিতা প্রাণ দিয়েছিলেন, আমার যে ভাই অস্ত্র হাতে পঙ্গু হয়েছিলেন, আমার যে বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন তাদের কাছে কি জবাব দেব আমরা? তাদের তো খুব বেশী চাওয়া ছিলো না। একটি স্বাধীন, স্বকীয় পরিচয়ের জন্যই তো তারা লড়েছিলেন, ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। এ এমন এক রাজনীতি যেখানে মুক্তিযুদ্ধে নিহত আমার পিতাকে নিয়ে রাজনীতি করা হয়, সম্ভ্রম হারানো বোনটিকে নিয়ে রাজনীতি করা হয়, অসহায় পঙ্গু ভাইকে নিয়ে রাজনীতির চাল খেলা হয়। এ আসলেই অদ্ভুত এক নীতি। স্রষ্টার শপথ করে বলছি, আমাদের মৃত পূর্বপুরুষেরা, আমরা এই রাজনীতি চাই নি।