ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মনে করেছিলাম শাহবাগে চলমান এই আন্দোলন সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবো না কিংবা এই আন্দোলন নিয়ে আমার মতামত পরিপূর্ণভাবে কোন পোষ্টে দেব না। খুচরা কয়েকটি মন্তব্য করেছিলাম আমার ফেবু ওয়ালে, তাতেই আমার কতিপয় জুনিয়র আমার উপর ক্ষেপা। ওরা আমাকে আনফ্রেন্ড তো করেছেই তার উপর বিশেষ!!! ট্যাগ দিয়ে আমাকে বাধিত করেছে। আমি অনুভব করলাম এরূপ খুচরা মন্তব্য না করে যদি পরিপূর্ণ একটি পোষ্ট দিতাম তাহলে হয়তো আমাকে ভূল বুঝতো না। কিংবা আমার অবস্থানের পেছনে যৌক্তিক কিছু কারণ খুজে পেতো।

এখন কিছু ফ্যাক্টস অ্যান্ড ক্লু নিয়ে আলোচনা করা যাক।

এই আন্দোলনের শুরু কিভাবে?

১) শুরু হয়েছিলো কাদের মোল্লার ফাসীর দাবীতে।
এরপর এতে যুক্ত হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীতে। এই যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় কিন্তু শুধু জমায়াতের এবং বি এনপি’র এক শীর্ষ রাজনীতিবিদের বিরূদ্ধে বিচার চাওয়া হলো।

(শহীদ জননীর নেতৃত্বে করা জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধপরাধীদের যে একটি তালিকা করা হয়েছিল সে বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই। আন্দোলনে সুচতুরতার সাথে বলা হলো ৭১ যে সব মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, ধর্ষণ করা হয়েছিল সবকিছুর মূলে জমায়াত। এবং যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা চিহ্নিত তারা সবাই জমায়াতি। বর্তমান প্রধান বিরোধী দল এই দলকে সমর্থন দিচ্ছে, এই দলের সাথে আছে, এই দলকে প্রটেকশন দিচ্ছে সুতরাং এরাও রাজাকার।)

আসলে কি শুধুই জমায়াতের বর্তমান নেতারাই ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন এসবের সাথে যুক্ত ছিলো? বর্তমান আওয়ামী লীগের বা বি এন পি’র কোন নেতাই অখন্ড পাকিস্তান!!!!প্রেমে মজে গিয়ে গণহত্যা করেন নি, গণিমতের মাল আখ্যায়িত করে জমায়াতের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়ে নিজের সম্পত্তি বৃদ্ধি করে নি একথা কি জোর দিয়ে বলা যায়?কতিপয় আওয়ামী http://www.somewhereinblog.net/blog/miazee/29202554

অথচ শাহবাগে তরূণদের মাঝে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হল বাংলাদেশের একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হলো আওয়ামীলীগ। এবং দেশপ্রেমের এই উজ্জ্বীবিত মন্ত্রের দীক্ষাগুরু বাম বা সমাজতান্ত্রিক ফন্টগুলো।

মুক্তিযুদ্ধে এইসব পার্টির ভূমিকা কি ছিল তা নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন তোলে নি ? অথচ তাঁদের সামনে চারু মজুমদার, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, এইসব উদাহারণ ছিল। এবং আমজনতা তাঁদের কাছ থেকেই স্বাধীনতার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া আশা করেছিল।

ভাসানীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এইসব দল বাংলাদেশে তাঁদের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচার প্রসার করলেও স্বাধীনতার সময় এইসব দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ত্বের একজন “কুত্তার কামড়া কামড়ি” থিওরী উথাপন করেন। অন্য পিকিংপন্থী এবং মস্কোপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলো ভিনদেশী নেতৃত্বের গ্রীণ সিগনালের অপেক্ষায় হাত পা গুটিয়ে বসে থাকেন। (ব্যাতিক্রম- সিরাজ সিকদার) শুধু বাংলাদেশ কেন সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে জাতির গণজাগরণের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য ভিনদেশী নেতৃত্বের আদেশের দিকে তাকিয়ে থাকার এই নমুনা বিরল। তারা আজকে দেশপ্রেমের ধ্বব্জা উড়ায়। কি নির্মম পরিহাস!!!!!!

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন প্রায় একক প্রচেষ্টায় ৯১-৯২ তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এইসব সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা বামদের ভূমিকা আমরা দেখেছি। এখন হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে দুর্বার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে কোন উদ্দেশ্যে তা রীতিমত গবেষণার বিষয়। তবে দুর্জনেরা বলে থাকেন শহীদ জননী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থানে গিয়ে আন্দোলন করেছিলেন তাতে রিস্ক ফ্যাক্টর ছিল বেশী এখন তো সরকারই এই আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে। রিস্ক ফ্যাক্টর শুন্যের কোটায়। তাঁদের এই হেন করেঙ্গা, তেন করেংগা টাইপের গলাবাজি এই রিস্ক ফ্যাক্টরের উপর অনেক বেশী নির্ভর করে।

২) যাই হোক আন্দোলনের এর পরের পর্যায়ে দেখি মাননীয় স্পিকারকে স্মারকলিপি প্রদান। একটু দেখা যাক এই স্মারকলিপিতে কি আছে,

ক)কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া।

খ)আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা।

গ)জামায়াত-শিবিরসহ ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা।

ঘ)যেসব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করার দাবিও এতে জানানো হয়েছে।

ঙ)এ ছাড়া ৭৫-এর পর সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন যেসব যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের আবার গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।

চ) একই সঙ্গে জামায়াতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অর্থের উৎস খুঁজে বের করে তা বন্ধের দাবি জানানো হয়।
http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2013/02/130210_sr_shahbag.shtml

এখন একটু বিশ্লেষণ করা যাক এই স্মারকলিপির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যাবলী-

প্রথমত, কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধী বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়েছে? যারা প্রসেকিউশনে আছে বা যাদের বিরূদ্ধে International Crimes Tribunal এ মামলা চলছে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে নাকি সকল যুদ্ধাপরাধীদেরকে বোঝানো হয়েছে। এই দাবীটিকে যদি এভাবে বলা হতো দলমত নির্বিশেষে সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্য শাস্তি চাই তাহলেই সরকার চাপে পড়ত এবং এতেই সরকারের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হতো । এই গণ আন্দোলনে যে লাখো তরূণ আংশ নিয়েছে তাঁদের চাওয়া ছিল এটিই। সুতরাং এখানে সরকারকে চাপে না ফেলানোর একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাহলে এই দাবীটি কি শুভংকরের ফাকি বা সরকারের কোন নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি চাল?

দ্বিতীয়ত, জমায়াত শিবিরসহ সকল ধর্মভিত্তিক দলের রাজনিতি নিষিদ্ধ করার দাবী জানানো হয়েছে। আজকের অনলাইন পোর্টালগুলোতে এই ব্যাপারে নিউজ হয়েছে। জামায়াত নিষিদ্ধে বিল আসছে। http://bangla.bdnews24.com/politics/article589733.bdnews

এখন প্রশ্ন উঠাটা স্বাভাবিক দীর্ঘদিন ধরেই বামধারার রাজনৈতিক দলগুলো এবং আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা যে দাবী করে আসছিলেন, তারূণ্যের গণজোয়ারের দাবীতে জমায়াত সহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা কেন থাকবে? মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিরোধী ভূমিকার জন্য জমায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবী তোলা যেত। কিন্তু জমায়াত সহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবী তোলাটা সন্দেহের উদ্রেক করে। এই আন্দোলনে বাম চিন্তাধারার নেতৃত্বকেই নির্দেশ করে। সুতরাং এই আন্দোলনের ফসল কে ঘরে তুলবে তা বোঝার জন্য কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

এখানে একটি ব্যাপার কিন্তু লক্ষ্যণীয় আওয়ামী লীগ ২০০১ এর নির্বাচনের পর থেকেই জমায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানে শংকিত এবং দলটি এরপর থেকেই জমায়াতকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে বললে সত্যের খুব একটা অপালাপ হবে না। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর দোহাই দিয়ে শাহবাগের গণজোয়ার থেকে যদি এই দাবী তোলা যায় তবে তা হবে তাঁদের জন্য শাপে বর। এখানেও বেনিফিশিয়ারী হচ্ছে আওয়ামী লীগ।

তৃতীয়ত, যেসব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করার দাবিও এতে জানানো হয়েছে। আমি আবারো বলছি এই আন্দোলনে সুচতুরভাবে বিএন পি কে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতো ঘুরিয়ে না বলে সোজাসুজি বললেই হতো, বি এন পি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে তাদের নেতাকর্মীদের ও আইনের আওতায় এনে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হোক। আওয়ামী লীগ ফাকা মাঠে গোল দিক।

চতুর্থত, ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। বলা হলো এই ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ এবং স্বাধীনভাবে বাইরের কোন শক্তি দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড না হয়ে কাজ করবে। ট্রাইব্যুনাল একটি রায় দিয়েছে এই রায়ের বিপক্ষে আন্দোলন করা মানে হচ্ছে সরকারের একটি অংগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা, বিচারিক ব্যাবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের এই আন্দোলনে বিব্রত হওয়ার কথা কেননা বিচারিক রায় না মানা মানে হচ্ছে বিচার ব্যাবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং ভূললে চলবে না এটি কিন্তু সরকারের তিনটি অংগের মধ্যে একটি। নির্বাহী অংগ যখন বিচার বিভাগীয় রায়কে চ্যালেঞ্জ করা জনতার আন্দোলনকে সমর্থন করে তখন সরকারের মধ্যে একটি পরষ্পরবিরোধী আবস্থানের সৃষ্টি হয়। নির্বাহী তার নির্দিষ্ট কোন লাভ ছাড়া এই ঝুঁকি নিতে পারে না।

পঞ্চমত, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুদ্ধাপরাধীদের যে তালিকা প্রণয়ন করেছিলেন তার মধ্যে কী শুধু জমায়াতের রাজনীতিবিদরা ছিলো বর্তমান বিএনপি (সাকা বাদে) বা আওয়ামী লীগের কোন কোন রাজনীতিবিদ ছিলো না কিংবা ইন্ডিভিজুয়াল কেউ ছিলো না?
মজার ব্যাপার হচ্ছে অভিযোগ দায়েরের সময় বেছে বেছে শুধুমাত্র বর্তমান প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের বিরূদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিরূদ্ধে মামলা করা হয়েছে।(আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যনালের কার্যক্রম) http://bangladeshwarcrimes.blogspot.com/”
যেন রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলেই তার যুদ্ধাপরাধ আমলে নেয়া হয়েছে যদি রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হতো তবে তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধাপরাধ আমলে নেয়া হতো না। আরো একটি মজার ব্যাপার হচ্ছে মুক্তমনা সহ অন্যান্য পোর্টালগুলোতে প্রথমদিকে শুধু ফকা চৌধুরীকেই রাজাকার হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এখন সাকা চৌধুরীকেও রাজাকার হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

এই ব্যাপারে আমাদের শাহবাগের নেতৃবৃন্দ ও কিন্তু নিশ্চুপ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তাদেরকে শুধু শিখিয়ে পড়িয়ে যে নামগুলো দেয়া হলো তারা শুধু সেই নামগুলো নিয়েই লাফালাফি করবেন এবং প্রাণের তাগিদে শাহবাগে উপস্থিত লাখো তরুণের আবেগকে পুজি করে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করবেন।

আলোচনার বাইরে একটি কথা বলি, স্পিকার বরাবরে যে স্মারকলিপি দেয়া হলো তাতে যদি একটি অথবা দুটি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যোগ করা হতো তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো? নাকি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এমন কোন দাবী না তুলতে শাহবাগের তরুণ নেতৃত্ব দৃঢ সংকল্পবদ্ধ!!!!!!!

(বি দ্রঃ আমার লেখা কাউকে ব্যাক্তিগতভাবে আঘাত করলে দুঃখিত। সমস্ত লেখাটির জন্য আমিই দায়ী এবং লেখাটির সকল দায় আমার উপর বর্তাবে।)