ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকে এবং ব্লগে মওলানা ভাসানী সম্পর্কে বেশ কিছু কুৎসা রটানো হচ্ছে এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভুমিকা কেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এমনকি উৎসাহী কেউ কেউ তাকে বাংলাদেশে’র স্বাধীনতা বিরোধী বলে প্রচার করছে এবং শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তুলছে। মজলুম জননেতার স্বপক্ষে কলম ধরার মতো গৃহপালিত কোন আশ্রিত বুদ্ধিজীবী না থাকায় নগণ্য আমিই কলম ধরতে বাধ্য হলাম।

১. ন্যাপ গঠন করা এবং তার বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্বেও ভাসানী ৭০’র নির্বাচনে অংশগ্রহন করেননি বরং আওয়ামী লীগ কে সবদিক দিয়ে সমর্থন দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র জাতীয় ঐক্যের কথা চিন্তা করেই ভাসানী আওয়ামীলীগ কে শুধু সমর্থন দেননি বরং তাদের পক্ষে প্রচারণাও চালিয়েছেন।

এই লিঙ্ক টি আমার বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে [লিংক],

কতবড রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব এবং মহৎ ব্যক্তি হলে এই ত্যাগ স্বীকার করা যায় তা অনানুমেয়। আমি আমার ক্ষুদ্র গন্ডীতে যতটুকু জানি ৭০’র এর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু’র চেয়ে ভাসানী কোন অংশেই কম জনপ্রিয় ছিলেন না। এবং ঐ সময়ে তিনি তার নবগঠিত দলের একটি বেশ ভালো অবস্থান করে নিয়েছিলেন।

২.ভাসানী চীনাপন্থী কমিউনিস্ট সমর্থক ছিলেন বলে স্বাধীনতাকালীন সময়ে তাকে ভারতে গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল, তদাবস্থায় কিভাবে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে জডিত থাকতে পারেন। তারপরো তখন অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছে ধর্না দিয়েছেন। (যুদ্ধকালীন সময়ে তার অসুস্থ থাকার ও প্রমাণ পাওয়া যায়।) নাকি আপনারা বলেন যুদ্ধে এই বৃদ্ধের মাঠপর্যায়ে অংশগ্রহণ করা ফরজ হয়ে গিয়েছিল।

৩.ভাসানী ছিলেন মজলুম জননেতা, বাংলার মেহেনতি মানুষের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যারা কাজ করে গিয়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি, ১৯৫৭ সালেই কাগমারী জনসভায় পাকিস্তানি শোষকদের বিদায়ী “সালাম দিয়ে দিয়েছিলেন” তিনি।তার প্রিয় স্লোগান ছিল, “স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ, আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ।” এই বাংলায় কোন নেতা তার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু কে উপেক্ষা করে স্বাধীন বাংলা’র স্লোগান দিয়েছিলেন তা আমার জানা নেই।

৪.মাওলানা ভাসানী চীনের পাকিস্তান প্রীতি উপেক্ষা করে, পাকি শাসক গোষ্ঠী কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিলেন যেখানে অন্য ধর্মীয় লেবাসধারি দলগুলো অখন্ড পাকিস্তান কে সমর্থন দিয়ে স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল। তদুপরি ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধর্মের দোহাই তুলে পাকিস্তানে নিষিদ্ধের জোর প্রতিবাদ জানান । সুতরাং মওলানা ভাসানীকে ধর্মীয় গোডা বলার কোন যৌক্তিকতা নেই।

৫. আপনাদের হয়তো মনে নেই এই হচ্ছে সেই ভাসানী যে , ১৯৬৯’ এ আগরতলা ষডযন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গডে তোলেন। এই জননেতাই আগরতলা ষডযন্ত্রের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গডে তুলে শেখ মুজিব সহ আগরতলার সব আসামী কে ছাডিয়ে আনেন এবং এই মামলা প্রত্যাহার করতে সরকার কে বাধ্য করেন।

৬. তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য এবং ব্যক্তিত্বে ও নেতৃত্বগুণে ভয় পেয়ে পাক বাহিনী স্বাধীনতার প্রারম্ভেই তাকে হত্যা / গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয়। মওলানা পডলেন দোটানায়, একদিকে চীনাপন্থী কম্যুনিষ্ট হিসেবে ভারত তার জন্য নিষিদ্ধ অন্যদিকে তথাকথিত মুসলমান সরকার তাকে ছাড়বে না। এরুপ সুচাগ্র অবস্থান সত্বেও ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছেন এবং তার শত্রুদেশ ভারতে অবস্থান নিয়ে গৃহবন্দিত্ব বরণ করে নিয়েছেন। এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন।মনে করা হয়ে থাকে যে তার চীনা কানেকশনের কারণেই স্বাধীনতাকালীন সময়ে পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে সরাসরি কোন সাহায্য পায় নি।

৭. যে মানুষটি সারাজীবন ভারতের শত্রু সদৃশ হয়েছেন তার ভারতের সাথে বাংলাদেশের কনফেডারেশন করা’র প্রস্তাব দেয়া কতটুকু যুক্তিসংগত এই ব্যাপারে আমি প্রশ্ন তুলি। আপনাদের ভাষ্যমতে, যে কয়দিন আগে বাংলাদেশকে ভারতের কনফেডারেশন করার প্রস্তাব দিলেন ঐ ভাসানী কেন আবার স্বাধীন বাংলাদেশে পা দেয়ার সাথে সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনী’র তডিৎ অবসান চাইবেন? তার বিরুদ্ধে এই প্রপাগান্ডা কে আমি নির্দিষ্ট শোষক পক্ষের প্রতিহিংসা মুলক আচরণ বলেই মনে করি।

৮.মওলানা ভাসানী’র বিপক্ষে আরো একটি বড অভিযোগ তিনি নাকি বঙ্গবন্ধু’র খুনিদের তারবার্তা দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কি আশ্চর্য কথা? তারা কেমন করে বঙ্গবন্ধু’র সাথে ভাসানী’র সম্পর্ক ভুলে যায়? এল এ খতিবের কারা মুজিবের হত্যাকারী শীর্ষক গ্রন্থের ১৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “মুজিব সবসময়ই ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁর ছেলেরা কখনও তাঁর ভূতপূর্ব নেতার বিরুদ্ধে কোন কথা বললে তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করতেন।” ভাসানীও মুজিব কে অত্যাধিক স্নেহ করতেন, ভাসানী বলতেন, “সে (মুজিব) আমার কাছে ছেলের চেয়েও অত্যাধিক প্রিয়।” মওলানা ভাসানীকে মুজিবের মৃত্যু সংবাদ যিনি দেন তিনি স্মৃতিচারণ করেন, আমি যখন হুজুরকে মুজিবের মৃত্যুসংবাদ দিই তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পডেন। [সূত্র]

৯.কেউ কেউ অনুযোগ করে থাকেন, মওলানা ভাসানী’র বিশাল অবদান রয়েছে বলে তার সমর্থকরা দাবি করলেও তাদের দাবি’র স্বপক্ষে স্বনামধন্য লেখকদের লেখনীতে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে, আমার কথা হচ্ছে মজলুম জননেতার পক্ষে তথাকথিত গৃহপালিত কোন বুদ্ধিজীবী না থাকলেও মজলুম জনসাধরণই সবচেয়ে বড় দলিল। সত্য বড় বেয়াড়া, সত্য কেমন জানি যুক্তিতে বের হয়ে যায়। আর প্রমাণ সে তো জনমানুষের মুখে।

আমাদের এই ভূতপূর্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতার বেড়াজালে আটকে ফেললে হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে মওলানা ভাসানী হচ্ছেন এমন এক আপোষহীন নেতা যিনি তার প্রিয়ভাজনের স্বৈরাচারকেও অনুমোদন করেননি। সর্বাবস্থায় সকল প্রকার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন, মজলুম জনসাধারণের কথা বলেছেন।আমাদেরকে তার রাজনৈতিক মনন এবং স্বপ্ন কে বুকে লালন করে এগিয়ে যেতে হবে যাতে কোন পক্ষ এই শ্রেষ্ঠ সন্তান কে নিয়ে নতুন কোন চক্রান্তে মেতে উঠতে না পারে।