ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১৯৪৮ সাল, সদ্যপ্রসূত পাকিস্থানের প্রতি সারা বাংলার মানুষের অকৃত্রিম মমতা। এরই মাঝে একদিন জিন্নাহ ঢাকা আসলেন। পাকিস্থানের জনক জিন্নাহকে দেখার জন্য তাই সারা বাংলার মানুষ উদগ্রীব। ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাকে বরণ করে নিতে হাজির হলো ৩ লাখ মানুষ। নেতা মঞ্চে উঠলেন, জনতাকে অবাক করে দিয়ে দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করলেন, “ Urdu and urdu will be tha sate language of pakistan “

সেই প্রথম জনতা আঘাত পেলো। এবং সর্বপ্রথম এই আঘাতের প্রতিবাদ করলো ছাত্ররা। আমাদের প্রজন্মের ছাত্ররা নয়, আমাদের পুর্বপুরূষরা তারা যখন ছাত্র ছিলেন।

১৯৪৮ সালের ২৪ শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ আবার ঘোষণা করলেন, “ Urdu and urdu will be tha sate language of pakistan “ সাথে সাথে বিদ্রোহী হল ছাত্ররা। ক্রূদ্ধ প্রতিবাদ জানালো আমাদের পুর্বপুরুষ। ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠন করা হলো “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি”।

জিন্নাহ ছাত্রদের ডাকলেন, প্রলুদ্ধ করতে চাইলেন তাদের। আমাদের প্রজন্মকে নয় আমাদের পুর্ব প্রজন্মকে। তারা প্রত্যাখ্যান করলেন। দাবী করলেন, সংখ্যাগরিষ্ট বাংগালী’র ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা। ফলে সারা বাংলার ছাত্র যুবকদের সাথে নিয়ে শুরু হল আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে আন্দোলন।

আবস্থা বেগতিক দেখে পুর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন আপোষে আসতে চাইলেন। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র সাথে বৈঠক করে, বাংলাকে পুর্ব বাংলার সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার ঘোষণা দিলেন। পরে পুর্ব বংগীয় পরিষদে তা গৃহীত হয়। ফলে তখনকার মত আন্দোলন স্থিমিত হয়।

তবু রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৫০ সালে গঠিত হলো “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।“ ১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে এসে সেই খাজা নাজিমুদ্দিনই ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

তৎকালীন ছাত্রনেতৃত্ব তাৎক্ষণিক ক্রুদ্ধ পতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেন। এবং আপামর জনসাধারণকে সাথে নিয়ে শুরু হল দুর্বার আন্দোলন। পরবর্তীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিয়ে গঠন করা হয় “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ”।

ছাত্ররা আমাদের রাজনীতিবিদদের তাদের ন্যায্য দাবীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে বাধ্য করেন। না এ আমাদের প্রজন্ম নয় আমাদের পুর্বপুরুষ।

১৯৬৯ এ গণভ্যুথান হল। নেতৃত্ব দিল ছাত্ররা। পরবর্তীতে সারা বাংলার আপামর জনসাধারণ যোগ দিলেন সেই আন্দোলনে। ছাত্র জনতা’র সেই আন্দোলনে পরবর্তীতে শামিল হলো সমসাময়িক বাংলার সকল রাজনৈতিক দল। এই আন্দোলনের চাপেই বিদায় নিল স্বৈরশাসক আইয়ুব।

৭১ এ এই ছাত্রনেতৃবৃন্দের চাপে পডেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হল। সশস্ত্র প্রতিরোধের সংগ্রাম শুরু হল। আর কে না জানে এই সশস্ত্র সংগ্রামে ছাত্রদের ভুমিকাই ছিল অগ্রগন্য। তাদের বীরত্বগাথা’র ফলেই রচিত হলো একটি নতুন দেশ, একটি নতুন অধ্যায়। পৃথিবী পেল আরো একটি নতুন মানচিত্র।

৯০ শুরু হল, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। নেতৃত্ব গ্রহণ করলো ছাত্ররা। জনতা কে সাথে নিয়ে শুরু করল দুর্বার আন্দোলন। আন্দোলনে যোগ দিল রাজনীতিবিদরা। ফলে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নিলেন এরশাদ।

এরপর আমাদের প্রজন্মের ছাত্র রাজনীতি’র ভুমিকা দেখি।এখন আমাদের ছাত্ররাজনীতি মানেই হচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, হল দখল, ক্যাম্পাস দখল, সাধারণ ছাত্র নিপীডন, ছাত্রীদেরকে লাঞ্চিত করা,প্রতিপক্ষকে খুন করা, জংগী মিছিল করা, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া।

অতি দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি এমন কোন আমানবীয় কাজ নেই যা আমাদের বর্তমান ছাত্রনেতাগণ করেন না।
কিছু দৃষ্টান্ত দিয়েছিলাম এখানে,
http://mamunulislam.blogspot.com/2012/02/blog-post_467.html
http://mamunulislam.blogspot.com/2012/02/blog-post_40.html

আমাদের ছাত্ররাজনীতি’র ছোট্ট একটা উদাহারণ দিয়েছিলাম http://mamunulislam.blogspot.com/2012/03/blog-post_20.html

আমাদের বর্তমান মহান ছাত্র নেতা গণ অনেক বড বড ব্যাবসায়ী হয়ে থাকেন। তারা টেন্ডারবাজী করেন, চাদাবাজি করেন, সন্ত্রাস ছডান, ব্যাক্তিগত ক্ষোভ মেটান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেতাদের দমনে ব্যাস্ত থাকেন। এবং অতি পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করি, জাতীয় নেতারা ছাত্রনেতাদের এইসব কাজকে আনুমোদন করছেন। বিনিময়ে ব্যবহার করছেন এই তরূন শক্তিকে।

যে ছাত্ররা ছিল রাজনীতি’র মুল গতিধারার নিয়ন্তা সেই ছাত্ররাই হয়ে গেল মূল গতিধারার চামচা।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস এই সেই ছাত্ররাজনীতি, যে রাজনীতি আমাদেরকে ভাষা দিয়েছে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছে কালান্তরে সেই একই ছাত্ররাজনীতি সন্ত্রাসী উপহার দিচ্ছে, একের পর এক লাশ উপহার দিচ্ছে, স্বৈরাচারীয় গণতন্ত্রের নিপীডনের মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে।

অনেক সাধ করে তিলে তিলে যে ছাত্ররাজনীতি’র গৌরবের সৌধ গডেছিলেন আমাদের পুর্বপুরুষ, কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হচ্ছে, গর্বের সেই সৌধ কে।