ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

একটি দেশের গবেষণা ও সার্বিক উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে ঐ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপর। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ পীঠস্থান। লাখো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে নিজেদেরকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে দেশমাতৃকার সেবা করার জন্য নিজেদেরকে তৈরী করে নেয়। শিক্ষক ও গবেষকরা গবেষণা করে দেশকে শনৈ শনৈ এগিয়ে নিয়ে যান। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান আহরণের তৃষ্ণা তৈরী করে দেন। এইভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। আপনি জ্ঞানী মানুষ এসব অবশ্যই এসব অনেক ভালো জানেন।

আপনি একজন শিক্ষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষক (ড শামসুজ্জোহা) ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদ করে যে শিক্ষক (ড মুনিরুজ্জামান, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা) নিহত হয়েছিলেন, দেশকে ভালোবেসে যে শিক্ষকরা প্রাণ দিয়েছিলেন আপনি সেই শিক্ষক সমাজেরই একজন।

স্যার, আপনি আমাদের শিক্ষক, আমাদের ২য় পিতা, সমাজের সবচেয়ে সচেতন আংশের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজনও বটে। স্যার আপনার কি মনে আছে, আপনার পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে কমবেশী ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রী ও গবেষক অধ্যয়নরত আছে এবং এই ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর সাথে সরাসরি জডিত আছে ২৫ হাজার পরিবার তথা কমবেশী দেড লাখ মানুষ। স্যার আপনি নিশ্চয় এসব জানেন, তারপরো অতিরিক্ত কাজের চাপে বিষয়টা ভুলে যেতে পারেন তাই আরেকটু উল্লেখ করলাম।

স্যার, আপনি অনেক জ্ঞানী এবং বিচক্ষণ একজন মানুষ। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত আপনার মতামত, সাক্ষাতকার দেখা যায়। দেখি আপনি অনেক গরিমাময় কথা বলেন, বিচক্ষণ কথাবার্তা বলেন, আশাবাদ করেন। পডে বুকটা গর্বে ফুলে উঠে। ভাবি সারাদেশ জানুক আমাদের ভিসি স্যার কত জ্ঞানী, কত বিচক্ষণ একজন।

স্যার অতি বিনয়ের সাথে আরেকটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন তার খরচ জোগায় দেশের জনগণ। দুইবেলা দুইমুঠো খেতে পারে না যে মজুর, যে কুলি ১ বেলার খরচ মেটাতেই কাহিল হয়ে পডে, যে কেরানী মাসের মাঝখানে এসে গলায় ফাস দেয়ার চিন্তা করে, যে কৃষক ফসল উৎপাদন করেও নিজের পরিবারকে প্রায়ই অভুক্ত রাখে, এমনকি যে ভিক্ষুক আপনার দুয়ারে ভিক্ষা করে তার কাছ থেকেও আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায় মেটানোর জন্য খরচ নেয়া হয়। আপনি তো বিবিএ’র শিক্ষক এসব নিশ্চয় অনেক বেশী জানেন।

স্যার বেয়াদবী নেবেন না, আরেকটা বিষয় জানতে চাইব। বিশ্ববিদ্যালয়কে তো গবেষণা’র আলয় বলা হয়। আপনার উদ্যোগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কি গবেষণা হয়েছে এবং এই খতে মঞ্জুরী কমিশনের কাছে আপনি কত বাজেট চেয়েছেন তা একটু জানতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি নিয়ে অল্প কিছু কাজ করেছিলাম ঐটা নিয়ে নাইবা বললাম।

এবার একটু রাজনীতি নিয়ে কথা বলি। ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি দুটি নিয়েই আমার বলতে হবে। স্যার শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে বেশী কিছু বলব না। শুধু জানতে চাইব শিক্ষক নিয়োগের সময় তাদের কি বিবেচনা করা হয়। অর্জিত জ্ঞানকে নাকি তাদের ভোটকে। একজন দেশ গডার কারিগরের মূল যোগ্যতা হওয়ার কথা ছিল তার জ্ঞান তার গবেষণা। তা না হয়ে কোন বিবেচনায় তার রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাধান্য পায় তাও আমাদের জানতে হবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক যখন বিভিন্ন সভা, সমিতিতে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের মত দলীয় লেজুডবৃত্তিক কথা বলেন তখন আমরা সাধারণ ছাত্ররা চরমভাবে লজ্জিত হই।

স্যার, চবি তে অতীতে কীরুপ ছাত্ররাজনীতি হয়েছে তা আমরা খুব বেশী জানি না। আমরা যখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছি প্রত্যেকটি মুহুর্তে ছাত্র নামধারী কিছু সন্ত্রাসীর দৌরাত্ম অনুভব করেছি এবং এরা বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের ছত্রছায়ায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় তখনো নীরব ছিল, কেননা তারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের পতাকাতলে আছে। আমি স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, যারা সত্যিকার রাজনীতি করে তারা কখনো সন্ত্রাস ছডায় না, গ্রুপিং করে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে না। বরং এইসব সন্ত্রাসী দলের ছত্রছায়ায় থেকে সন্ত্রাস ছডিয়ে ঐ দলের মুলে কুঠুরিঘাত করে দলের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করে ফলে দল মানুষের বিরাগভাজন হয়। আমরা সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও ঐ কতিপয় সন্ত্রাসীর ভয়ে তটস্থ ছিলাম, এবং দলটিকে ঘৃণা করা শুরু করলাম।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্রছাত্রী থাকবে। তাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপুর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার দায় আপনার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের। জনশ্রুতি আছে, ভিন্নমতের ছাত্রছাত্রীদের বিরোধপূর্ণ অবস্থানকে উষ্কে দেয়ার পেছনে প্রশাসন যন্ত্রের কতিপয় নিয়ন্তার হাত আছে। আবশ্য এর প্রমাণ আমরা পাচ্ছিই। এর দায় কি আপনি এডাতে পারবেন স্যার?

স্যার, দেশের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত অংশে এখনো যদি মধ্যযুগীয় কায়দায় মারামারি হয় তবে জাতি গভীর উদ্বেগ বোধ করে। দেশের মানুষ আতংকের সাথে লক্ষ্য করে যে জাতীয় নেতৃত্ব তৈরীর কারখানায় কিছু জাতীয় সন্ত্রাসীও উৎপাদিত হচ্ছে। স্যার আপনিই বলুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারামারী হয়ে ছাত্র মারা যাওয়া কোন বিবেচনায় দেশের মানুষের কাছে স্বাভাবিক মনে হবে।

স্যার জাতির একজন হয়ে আপনার কাছে জানতে চাইব, ১৮ হতে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী’র শিক্ষাজীবন বিগত দুই মাস ধরে অবরুদ্ধ কেন? আপনি নিশ্চয় বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয় তো খুলে দেয়া হয়েছে। অতি বিনয়ের সাথে বলব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেন আর যাই দেন, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে সাধারণ ছাত্ররা গ্রেফতার, হুমকি খাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে না।

ছাত্রলীগ, শিবির বুঝি না। আমি আমার দেশকে বুঝি, আমার জন্মভুমি মাকে বুঝি, শুধু জানি ক্যাম্পাস অবরুদ্ধ থাকলে আমার দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ১.৫ লাখ মানুষ সরাসরি আক্রান্ত হবে, জাতি পিছিয়ে পডবে। তাই অতি বিনম্র চিত্তে আপনাকে বলতে চাই, দয়া করে আমাদের উপর একটু সুদৃষ্টি দিন, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থের দিকে একটু নজর দিন। দেশের মঙ্গলের জন্য আপনার নেয়া পদক্ষেপ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে প্রত্যাশা করি।

***
ফিচার ছবি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহিত