ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

তখন সবেমাত্র চান্স পেয়েছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে। কম্পিত ভীরু মনে ক্যাম্পাসে গেলাম। ফ্যাকাল্টিতে গিয়ে অফিস খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ সামনে অগোছালো পোশাকের প্রবীণ একজনকে পেলাম। যুবা বয়সের স্বভাবসিদ্ধ অহমিকায় জিজ্ঞেস করলাম, “আংকেল আইন অনুষদের অফিসটা কোনদিকে একটু বলবেন?” মিষ্টি গলায় বললেন, ঐ যে চারকোণা দ্বিতল ভবনটা দেখছ ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেব। তা নতুন ভর্তি হয়েছ বুঝি? বললাম, হ্যাঁ আংকেল। তখন কি আর জানতাম অগোছালো পোশাকের প্রবীণ মানুষটিই আইন অনুষদের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক প্রফেসর ড খবির উদ্দিন।

বেশ কয়দিন হলো পিতৃ স্থানীয় অভিভাবক জনাব প্রফেসর খবির স্বর্গারোহণ করেছেন। এই প্রবীণ মানুষটির বিচক্ষণতা, সততা, জ্ঞান, প্রাজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। তবে হ্যাঁ বয়সের কারণে হয়তো ওনার কথার মধ্যে কিছুটা জড়তা ছিল, শিক্ষাদান-কালীন শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগে কিছুটা সমস্যা ছিল। তার মানে এই নয় যে তিনি অন্তঃসারশূন্য ছিলেন। ৩য় বর্ষে যখন প্রথম স্যার এর ক্লাস পেলাম, ১ম ক্লাসেই তার জ্ঞানের সুবিশাল পরিধি নিয়ে বন্ধু-মহলে আলোচনা চলছিল সেই সাথে শিক্ষার্থীদের সাথে তার কমিউনিকেশন গ্যাপ নিয়েও। এই মানুষটার এই সমস্যাটির কারণেই আমরা তার ক্লাস করতে চাইতাম না। আমাদের মাঝে আবার কেউ কেউ স্যার কে হেনস্থা করার চেষ্টা করতো। মনে হয় স্যার সবকিছুই বুঝতেন। কিন্তু উনি যে জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার, তরুণ মনের এইসব বাচালামি কে প্রশ্রয়ই দিতেন হয়তো।

চির-তরুণ এই মানুষটি প্রচণ্ড রসিক ছিলেন। ওনার যে কয়টি ক্লাস করেছি তার মাঝেই প্রচুর রসবোধের প্রমাণ পেতাম। স্যার সাক্ষ্য আইন পডানোর সময় প্রায়ই সিনেমার গল্প নিয়ে আসতেন। আর হাস্যরসাত্মক আলোচনার ফাকে আইনের সাথে ঐসব সিনেমার সামঞ্জস্য সাধনের চেষ্টা করতেন। চারপাশে ঘটিত কিছু ঘটনা নিয়ে তার আইনগত মূল্যায়ন করতেন এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আলোচনা করতেন। আমি যদিও তার ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রদের একজন তারপর ও নির্দ্বিধায় স্বীকার করব, ওনার পাঠদান পদ্মতি প্রচলিত পদ্মতি’র চেয়ে আলাদা। হয়তোবা তিনি সময়ের চেয়ে অনেক বেশী এগিয়ে গিয়েছিলেন নতুবা আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা হেতু তার শিক্ষাদানপদ্মতি অনুসরণ করতে পারি নি ।

মনে পড়ে স্যার একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো মনে হয় ক্লাসে কম আসো।
জবাব দিলাম,স্যার আমি তো নিয়মিতই আসি। বোধহয় আপনার কয়েকটা ক্লাস মিস করেছি। পেছন থেকে একজন বলল, স্যার ও আগে শার্ট পরে আসতো আজকে গেঞ্জি পরে আসছে তো তাই বুঝতে পারছেন না। অমনি ক্লাসে হাসির রোল পডে গেল।
মনে হল স্যার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। উপস্থিতি খাতাটা দেখে বললেন, কই এখানে তো তোমার মাত্র কয়েকটা উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
বললাম, তাহলে মনে হয় আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে স্যার। তিনি আমার এই কথায় রাগ করলেন। দাড করিয়ে বললেন, বয়স হচ্ছে, ভুল হলেও হতে পারে কিন্তু শিক্ষকদেরকে এভাবে বলো না তাতে তাদের কষ্ট হয়। আজকে তিনি নেই। প্রচন্ডভাবে তার অভাব বোধ করছি। স্যার ঐদিনের ঘটনার জন্য আমাকে ক্ষমা করেছেন তো?
এভাবে কত নির্মম কষ্ট দিয়েছি প্রচন্ড আত্ম-মর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষটাকে ভাবতেই নিজের প্রতি এক অপরিশুদ্ধ ঘৃণা এসে জমা হয়।

সহজ, সরল, নির্মোহ, সাদাসিধে ঢোলা শার্ট পরা মানুষটা আমাদের সামনে আর আসবেন না, ক্লাসে ঢোকা মাত্র নিজে গিয়ে সব ফ্যান গুলো ছেড়ে দেবেন না,দরজাগুলো বন্ধ করবেন না, আর টেবিলের উপর বসে আপাত রসিকতা করবেন না ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন জানি এক শূন্যতা অনুভূত হয়। অশ্রুসিক্ত হয় দুটি চোখ। এই মানুষটি’র বিদায়ে আইন অনুষদ শুধু একজন অধ্যাপককে হারায় নি হারিয়েছে তার প্রতিষ্ঠায় প্রতিনিয়ত সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে যাওয়া এক সাহসী সৈনিককে। আর বাংলাদেশ হারাল আইন বিষয়ে গবেষণারত বিদগ্ধ এক জ্ঞানতাপসকে।

অদ্ভুত এক শুন্যতায় বুকটা খা খা করে, আমাদের শিক্ষাদানে এই মানুষটা’র প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা আমরা কতভাবে যে ছেলেখেলা করতাম মনে করে। এখন বুঝি তার মত করে গল্প বলার ছলে কেউ কি পাঠদান করবে? তার মত করে শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে কেউ কি নজর দেবে?
এই সুবিশাল জ্ঞান-সগরের সান্নিধ্যে থেকেও আমরা অনেকেই আইন বিষয়ে প্রায় অকাট মূর্খই থেকে গেলাম এ আমাদের ব্যার্থতা। তার চিন্তাভাবনার সমান্তরালে গিয়ে জ্ঞান আহরণ করতে না পারা নিশ্চয় আমাদের ব্যার্থতা।

এই অদ্ভুত সরল মানুষটার প্রতি আমাদের কৃত আচরণগুলো কে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। জন্মের অন্য পাঠে গিয়ে কি তিনি আমাদের এই অনুশোচনাকে উপলব্ধি করতে পারছেন?
স্যার আমরা বিনীত করজোড়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। যদিও জানি তার মত জ্ঞান-বৃক্ষের কাছে আমাদের কৃত ভুলগুলো নিতান্তই তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখেছেন তিনি। তারপরও মনকে প্রবোধ দিতে পারছি না। সামনা সামনি হয়ে যে ক্ষমা চাইতে পারি নি কখনো ক্ষমা চাইতে পারবও না।

জানি তিনি অনেক ভালো আছেন। তার মতো একজন জ্ঞান অন্বেষনী,সৎ, সহজ সরল মানুষ পরজীবনে নিশ্চয়ই অনেক বেশী সুখী হবেন। তারপরও তার অভাব আমাদেরকে কাদায়, আমাদেরকে আলোড়িত করে। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে সমব্যথী আমরা আইন অনুষদের শিক্ষার্থীরা এবং সমগ্র আইন অনুষদ।