ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ছোটবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম, দুই ইঁদুর ও এক শিয়ালের গল্প। অনেকেই হয়তো জানেন গল্পটা। দুই ইঁদুর এক খণ্ড রুটি চুরি করে। চুরি করার পর তারা এই রুটির ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করে দেয়। দুজনে মিলে পরে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের মোডল শিয়ালের কাছে গিয়ে রুটিটি’র সুষ্ঠু ভাগাভাগি করতে বলে। তদনুযায়ী শিয়াল মামা দাডিপাল্লা নিয়ে রুটিটি ভাগাভাগি করার চেষ্টা করে। দেখা যায়, মামা’র পাল্লায় রুটিখানা কোনভাবেই ভাগ হয় না। এদিকে রুটিখানা কে সমান ভাবে ভাগ করতে গিয়ে রুটির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মোডলের পেটে অন্তরীন হয়। অবশেষে দুই ইঁদুরের সুবুদ্ধির উদয়, এবং এক তৃতীয়াংশ নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে চায়। কিন্তু মোডল সাহেব তার পারিশ্রমিকরুপে ঐ অংশটাও তার উদরে গায়েব করে দেন।

স্বদেশে চলমান রাজনীতি’র দিনপঞ্জি নিয়ে ভাবতে গিয়ে এই গল্পটাই মাথায় চলে এলো সর্বপ্রথম। রুটি-সদৃশ মানচিত্র, ইদুরসদৃশ দুই নেত্রী এবং মোডলরূপী আমেরিকা এবং উহার দোসর ভারত।

বিশ্বমোড়ল আমেরিকার অন্যতম জাতীয় নেতা হিলারী’র বাংলাদেশে আগমন হেতু অনেকেই ভালো চোখে দেখেন নি। আমিও দেখি নি। বাংলাদেশে এসে তার গতিবিধি আমাদের ভালো লাগে নি। আবার যখন আমাদের দেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী মোডলের কাছে তার আর্জি পেশ করেছেন তখন আমরা ইশপের গল্পের সেই শিয়ালটাকেই দেখেছি মানসচক্ষে। তার কাছে যখন ক্ষমতার রুটি হালুয়ার কথা বলেছেন, খণ্ড বিখন্ডিত বাংলার মানচিত্র ভেসে উঠছিলো আমাদের মানসপটে।

আবার পরে ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী’র সাথে সাক্ষাতের কিছু ছবি যখন দেখলাম মনে হল, সুদূর উপমহাদেশে ইউনাইটেড স্টেটস এর অঙ্গরাজ্যের একজন সন্ত্রস্ত গভর্নরের সাথে আলাপচারিতা করছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

এরই ফাকে আরেক মোডল এলেন। সমমর্যাদার দুই মোডল প্রতিনিধি’র একই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থান নিয়ে সন্দিহান না হওয়াটাই কি অস্বাভাবিক নয়? প্রতিবেশী দেশের এই মোডল সাহেব আবার নতুন সাহায্যের প্যাকেজ ঘোষণা করলেন। যদিও আগের প্যাকেজের কার্যক্রম এখনো শুরুই হয় নি। ইনি ঘোষণা দিলেন, ২০ কোটি ডলার ঋণ মওকুফ করবেন, সুদের হার কমানো হবে (যদিও প্রতিশ্রুত ১০০ কোটি ডলার অর্থই এখনো মঞ্জুর করা হয় নি।), তার সাথে যুক্ত করলেন মমতা জাদুতে আটকে থাকা কিছু প্রতিশ্রুত চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরের আশ্বাস (বাস্তবায়ন কিন্তু নয়)। ২০ কোটি ডলার ঋণ মওকুফের সাথে সাড়ে ৩ হাজার টন পচা গম আমদানির কোন সম্পর্ক আছে কিনা আমাদের জানা নেই যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বসে বসে ঘাস কাটে না বলেই আমার বিশ্বাস।

দেশে অরাজকতা চলছে। অরাজকতার জন্য শুধু কি সরকারী দল দায়ী? প্রশ্নটা অনেকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আপাত-চক্ষুর অন্তরালে যা পেলাম তাতে শুধুমাত্র সরকারী দলকে দোষ দেওয়া যায় না। আমরা সকলেই একটি আদর্শ সরকারী দল দেখতে চাই, আদর্শ বিরোধী দল দেখতে চাই না। অথচ তাই স্বাভাবিক ছিল। বিরোধী দল কি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে না? বিরোধী দল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের সাথে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে না? দলীয়করণের তথ্য উন্মোচন করে জনসাধারণকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গডে তুলতে পারে না? জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের চাহিদা-পূরণে সরকারকে চাপ দিতে পারে না? দুর্নীতি’র বিরুদ্ধে সরকারকে হুমকি দিতে পারে না?

স্বাধীনতার পরে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কথায় কথায় তিনি তাকে বললেন “ভারত স্বাধীনতার পর নেহেরু তার বিরোধী-পক্ষের সাথে প্রথম আলোচনায় সর্বপ্রথম যে কথাটি বলেছিলেন তা হল, তোমরা একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গডে তোল। তা আপনি কি করছেন?” তিনি কি করেছিলেন তা অবশ্য আমরা সকলেই জানি।
যাই হোক যা বলছিলাম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদর্শ সরকারী দলের চেয়ে আদর্শ বিরোধী দলের ভূমিকা কোনমতেই কম নয় বরং কিছু ক্ষেত্রে তা বেশীই বটে।

দেশে বিশ্বমোডলের অর্থায়নে বেশ কয়েকটি যুব সংঘটন দাডিয়ে গেছে। যদিও আমরা এইসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে খুব একটা বেশী শংকিত ছিলাম না। কিন্তু সাম্প্রতিক হিলারী’র সাথে বিশেষ একটি সংঘটনের দহরম মহরম আমাদেরকে খানিকটা সন্দিহান করেছে। কেননা মোডল তো আবার কোন উদ্দেশ্য ছাডা কোন কাজ করেন না। তরুণদের প্রতি তার দরদ উথলে উঠার পেছনে কোন কারণ না থেকেই যায় না।