ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বি সি এস এবং অন্যান্য সরকারী চাকরীতে কোটা প্রথা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং হচ্ছে।
আমি লেখার শুরুতেই এই কোটা প্রথার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই।

সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে আছে,
সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
অথচ আইন করে বলে দেওয়া হলো মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য বেশী সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। আগে জানতাম সংখ্যালঘিষ্টরা নির্যাতিত হয়, এখন প্রতিনিয়ত দেখছি সংখ্যাগরিষ্ট নির্যাতিত হচ্ছে।

সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদে আছে,
কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।
কিন্ত সরকারি চাকরিতে জন্ম পরিচয়ের জন্য কেউ ৩০% কোটা পাচ্ছে! এই কি সংবিধান প্রদত্ত সম অধিকারের নমুনা?

সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদে আছে,
(১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।

(২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।
আমি মনে করি সরকারি চাকরিতে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সংবিধানের এই একটা অনুচ্ছেদই যথেষ্ট।

যদিও এই অনুচ্ছেদেই ৩টি বিশেষ ক্ষেত্র বলা হয়েছে,

(৩)(ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,

(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সমপ্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,

(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইবে।

২৯নং অনুচ্ছেদের (ক) বিধানমতে পার্বত্য অঞ্চলের জন্য তথা উপজাতিদের জন্য কোটা রাখার যৌক্তিকতা আছে। যদিও ঐ অঞ্চলগুলোতে শিক্ষা এবং সচেতনতা সহ বিবিধ মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে না পারার দায় সরকারকেই নিতে হবে। জেলা কোটাকেও এই অনুচ্ছেদের আওতায় বৈধতা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা থেকে ন্যুনতম সংখ্যক প্রার্থী যাতে সরকারী চাকরীতে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে তাই এই কোটা রাখার কথা বলা হয়েছে। এই ক্যাটাগরিতে মোটামুটি ৫+১০= ১৫ শতাংশ কোটার ব্যাপারটা মোটামুটি সহনীয় বলা যেতে পারে। মোটামুটি বলছি এই কারণেই যে, এই ১৫ শতাংশ তুলনামূলকভাবে অমেধাবী ছাত্র তাদের চেয়ে মেধাবী ছাত্রদেরকে সাবস্টিটিউট করছে।

অতঃপর আসছি ২৯ এর (গ) নং অনুচ্ছেদে, এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা কে বৈধতা দেয়া হয়েছে। সেই ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান থেকেই দেখছি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নারীদের জন্য কোটা রাখা হচ্ছে, কোটার সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ১৯৭২ সালের প্রেক্ষিত আর ২০১২ সালের প্রেক্ষিত নিশ্চয় এক নয়। মানছি ৭০ এর দশকে নারীরা অনগ্রসর ছিল কিন্তু এই ২০১২ তে কি নারীর অনগ্রসরতা আরো বেড়েছে? সচেতন মহলের কাছে প্রশ্ন রইল। তবে আমি আপনাদের কাছে একটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ না করে পারছি না। বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে মেয়েরা ছেলেদের সাথে সমান পাল্লা দিয়ে ভালো ফলাফল করে আসছে। এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা ছেলেদের চেয়ে ভালো ফলাফলই করছে। এই কোটা বিহীন ফলাফলের ক্ষেত্রে মেয়েরা যদি ছেলেদের সাথে প্রতিযোগীতা করে সমান ফলাফল অর্জন করতে পারে তবে বি সি এস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন পারবে না? আমি তো মনে করি এই কোটা নারীদের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এবং আমি আমার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ববান অনেক নারীকেই দেখেছি যারা তাদের জন্য কোটাকে তাদের যোগ্যতার প্রশ্নে অবমাননাকর বলা মনে করেন। তাই নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা রাখার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না।

আর সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, মুক্তিযোদ্ধা কোটার সাংবিধানিক কোন ভিত্তি নেই। এই কোটাকে সাংবিধানিকভাবে কোনমতেই প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। আমি এই মুক্তিযোদ্ধা কোটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই।
বয়োজোষ্ট মুক্তিযোদ্ধা যারা আছেন তাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা কি ব্যক্তিগত কোন সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কাছে জানতে চাই, তারা কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে নিজেদের এবং তাদের উত্তরীয়দের স্বার্থকে সুনিশ্চিত করার জন্যই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? আমাদের দেশপ্রমিক অনুসরণীয় অগ্রজদের নিকট জানতে চাই, তারা কি এই মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে পরবর্তীতে ব্যবসা করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন?

প্রত্যকটি প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই “না”।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের অনূকরণীয়। তারা কখনোই জাতির স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখেন নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন বেশ ভালো ব্যাবসা হয়। এই ব্যাবসা করে কারা জানেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভীরূ কাপুরূষের মতো ভারতে পালিয়ে গিয়ে তাস, পাশায় মজে থেকেছেন, ট্রেনিং নেয়ার নাম করে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাটিয়ে দিয়েছিলেন, ফিল্ড কমান্ডার হয়েও ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ডিক্টেশন (!) দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর নেতৃবৃন্দের পাদলেহী রাজাকারবৃন্দ যাদের সনদে ওসমানী স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় নিজেদের মুক্তিযুদ্ধার সনদে নিজেরা স্বাক্ষর করেছেন, আত্মীয়তা পাতিয়েছেন, পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছেন, আর কারা জানেন, কতিপয় রাজনীতিবিদরা।

প্রথম আলোর একটা প্রতিবেদন থেকে একটু কোট করি,

১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভোটার তালিকায় ৮৬,০০০ । ১৯৯৮ – ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের খসড়া তালিকায় ১৮৬,০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাকে মুক্তিবার্তা তালিকা বলা হয়। আর ওই সময়ে পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে যায় প্রায় এক লাখ। সর্বশেষ জোট সরকারের সময় এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২ লক্ষ ১০ হাজার। এই সরকারে আমলে বর্তমানে কতসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যোগ করা হয়েছে এখনো তার কোন সংখ্যা পাওয়া যায় নি।

আমরা যেখানে স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সংখ্যা বের করতে পারি নি সেখানে তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হলে তা সুবিধাবাদীদের জন্য সুযোগ করে দেবে এটিই স্বাভাবিক।

তার উপর মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাড়িয়েছে নতুন আইন করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সাথে সাথে তাদের নাতি নাতনীদের ও মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় আনা হয়েছে। শোনা যায়, বিয়ের বাজারে নাকি মুক্তিযোদ্ধা নাতি নাত্নীদের দর বেশ চড়া কেননা অদূর ভবিষ্যতে তাদের জামাই/ বৌ কেও মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় আনা হবে। এবং সেটি নাকি একটি বিশেষ দলের নির্বাচনী মেনিফেষ্টু হবে।
আপনাদেরকে আরেকটি রেশিও দেই, বলা হয়ে থাকে যে দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ। তাহলে দেখা যাচ্ছে সরকারী চাকরী গুলোতে ২ লাখ মানুষের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরীর সুযোগ রাখা হয়েছে। আর বাকী ১৬.৮০ কোটি মানুষের জন্য ৪৫ শতাংশ চাকরীর সুযোগ রাখা হয়েছে। কোন বিচারে এই সুযোগকে সম অধিকারের আওতায় আনা যাবে সচেতন মহলের নিকট প্রশ্ন রইল।

আবার এই ৪৫ শতাংশ সরকারী চাকরীর সবকইটিতেই যে প্রকৃত মেধাবীদের নিয়োগ দেয়া হয় তা কিন্তু নয়। এই ৪৫ শতাংশের মধ্যে আবার আছে রাজনৈতিক কোটা ১০ শতাংশ, স্বজন কোটা ১০ শতাংশ, অর্থ কোটা অর্থাৎ অর্থের ভিত্তিতে যে নিয়েগ দেয়া হয় ১৫ শতাংশ। সুতরাং বাকী থাকে আর ১০ শতাংশ। ১৬.৮০ কোটি জনতার জন্য বরাদ্ধ থাকে ১০ শতাংশ কোটা।

আমার কথা বিশ্বাস না হলে আরেকটি পরিসংখ্যান দেখুন,
ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়কুলের রাহুগ্রাসে বন্দি এখন সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)।
প্রতিষ্ঠানটিতে চলছে ব্যাপক আত্মীয়করণ। বড় পদ, ছোট পদ—সব ক্ষেত্রেই স্বজনদের ছড়াছড়ি। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও এমপিসহ সরকারি দলের প্রভাবশালীদের আত্মীয় এবং অনুগতরা ছাড়া এ সংস্থায় এখন অন্য কারও ঠাঁই নেই। কমিশনে বর্তমানে ১৪ সদস্যের ১৩ জনই দলীয় অনুগত ও প্রভাবশালীদের আত্মীয়।
স্বয়ং পি এস সি’ র এই অবস্থা আমার যুক্তির পেছনে কি শক্ত ভিত্তি দেয় না?

তাহলে সরকারী চাকরী এবং বি সি এস কোটা ব্যাবস্থা দাড়াচ্ছে এরূপ
নারী কোটা- ১০%
উপজাতি কোটা- ৫%
জেলা কোটা- ১০%
মুক্তিযোদ্ধা কোটা- ৩০%
রাজনীতি কোটা- ১০%
স্বজন কোটা- ১০%
অর্থ কোটা- ১৫%
মেধাবীদের জন্য বাকী রইল ১০ শতাংশ।

ওহ আচ্ছা আপনাদেরকে বলতে ভুলে গেছি ৩২ তম বিসিএস শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারীদের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবং বিগত বি সি এস গুলোর প্রায় প্রতিটিতেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা অপূর্ণ রয়ে যায় কারণ তারা পাশ করার মত নম্বর অর্জন করতে পারে না।

এই অমেধাবীরা যদি কর্মজীবনে প্রকৃত মেধাবীদের উপর ছড়ি ঘুরায় তাহলে স্বভাবতই ভারসাম্যের অভাব দেখা দেবে। তদুপরী কোটার বলে শক্তিমান এই ক্যাডাররা দেশ ও জাতির জন্য কতটুকু কাজ করতে পারেন অথবা করেন তা প্রশ্ন সাপেক্ষ বটে। যদিও আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি মন্ত্রণালয়গুলো যোগ্য লোকের অভাবে মার খাচ্ছে।

প্রিয় সচেতন মহল, আমাদের এখনই এই বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। কেননা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেশীরভাগ ইতোমধ্যে কিছু অশিক্ষিত, বর্বর মানুষের হাতে চলে গেছে। আমাদের আমলাতন্ত্রের ও যদি একই অবস্থা হয় তাহলে জাতির সামনে ঘোর অন্ধকার ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে এই বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই।