ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

বেশ বহু বছর আগে প্রাকৃতিক কাজ সারতে কোন এক পাবলিক টয়লেটে গিয়ে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার কয়েকটা লাইন দেখতে পেয়েছিলাম। তারপর থেকেই পাবলিক টয়লেটের ওয়ালে থাকা লেখাগুলো নিয়মিত দেখায় অভ্যস্ত হয়ে উঠি। কবিতা কিংবা গান পাবলিক টয়লেটের ওয়াল খুবই কম দখল করে থাকে অবশ্য, যা বেশি থাকে তা হচ্ছে ভয়ানক সব গালি, মেয়েদের দেহ নিয়ে জঘন্য সব মন্তব্য,কিংবা যৌনতা কেন্দ্রিক লেখা। গেল কয়েকটা মাস বিষয়টা নিয়ে আরো সিরিয়াসলি দেখা শুরু করি, গত ২-৩ মাসে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল, মার্কেট, ক্লিনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি, হল এবং কিছু ট্রেনের টয়লেটে যতোনা প্রাকৃতিক কাজ সারার প্রয়োজনে তারথেকে বেশি অপ্রয়োজনে যেয়ে ওয়ালের লেখাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। বলা প্রয়োজন শুধুমাত্র ছেলেদের টয়লেটগুলাই ‘ভ্রমণের’ আওতাধীন ছিল, নিজের জীবনের উপর মায়া থাকাতে মেয়েদের টয়লেটগুলার ত্রিসীমানায় যাওয়ার সুযোগ হয় নাই। মেয়েদের টয়লেটে যাওয়ার আগ্রহ ছিল কোনভাবেই কোন বিকৃত রুচির আশা মেটানোর জন্য নয় বরং মেয়েদের টয়লেটে ‘টয়লেট রাইটিং’ এর ধরণ দেখার জন্য। আশা মেটেনি।
এই কয়েকমাসে টয়লেটগুলোর ওয়াল কিংবা দরজায় সেটে থাকা লেখাগুলো দেখে, লেখাগুলোর একটা মোটামুটি ক্লাসিফিকেশন আর ধরণ ধরার চেষ্টা করেছি, লেখাগুলোকে মোটামুটি ১০ ভাগে ভাগ করা যায়-

১. মেয়েদের দেহ কেন্দ্রিক মন্তব্য ২. চরমমাত্রার গালি ৩. রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য ৪. কারো নাম দিয়ে সাথে মোবাইল নাম্বার ৫. যৌনতা কেন্দ্রিক ইচ্ছা-অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ ৬. বাজে মন্তব্য না লেখার অনুরোধ কিংবা বাজে মন্তব্য লেখকদের গালি দিয়ে লেখা ৭. কবিতা কিংবা গান ৮. এডাল্ট জোকস ৯. ধাধা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক ফাজলামো ১০. ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহবান কিংবা ভয় উদ্রেকের চেষ্টা। এর সাথে আছে নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গ কিংবা ফুল-পাখি-মানুষ আঁকার চেষ্টা।

টয়লেট রাইটিং এ আমার আগ্রহ গড়ে ওঠার মূল কারণ, লেখাগুলো যেহেতু মানুষের তাই লেখাগুলো দ্বারা টয়লেট লেখকদের মানসিকতা জানার বাসনা পেয়ে বসা। লেখাগুলোর গভীর বিশ্লেষণ করে একটি গ্রুপ অফ পিপলের সাইকোলজি বুঝতে পারার চেষ্টা করা সম্ভবত খুব দরকার। কারণ বিষয়টা এমন না যে গুটিকয়েক মানুষ অল্প কিছু স্থানে এসব লেখা লিখে যাচ্ছে, বাংলাদেশের অজস্র জায়গার অজস্র পাবলিক টয়লেটে এসব লেখা দেখতে পাওয়া যায়। লেখাগুলোকে অনেকে বিকৃত মানুষিকতা বহিঃপ্রকাশ বলে আলোচনারযোগ্য নয় বলে বিষয়টার একাডেমিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করে দেন। সমাজের সকল প্রকার বিকৃতির সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়া সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব কিনা ভেবে দেখার বিষয়।

বেশ কিছু টয়লেট রাইটিং এর ছবি মোবাইলে তুলেছি এ কয় মাসে,তবে কম দামী মোবাইলের আরো কম রেজোল্যুশনের ক্যামেরায় তোলা সবগুলো ছবি স্পষ্টতা পায়নি। এরপর পাবলিক টয়লেটগুলার ভিতরকার আলোক স্বল্পতা তো আছেই।
Greenlife hospital-6 28-9-15 Greenlife hospital-4 28-9-15 Greenlife hospital-3 28-9-15 Greenlife hospital-1 28-9-15
মানুষ টয়লেটে কেন লেখে, সমাজের কোন ধরণের মানুষেরা এসব লেখে, নারী-পুরুষে টয়লেট রাইটিং এ কী কী পার্থক্য দেখা দেয় এ নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রচুর না হলেও বেশ অনেক গবেষণা হয়েছে। টয়লেটের ওয়ালে সেটে থাকা লেখা কিংবা ড্রয়িংকে এলান ডুন্ড্রিস নামের এক ভদ্রলোক সেই ১৯৬৬ সালে ল্যাট্রিনালিয়া বলে নাম দিয়েছিলেন, ল্যাট্রিনালিয়ার আরেক নাম টয়লেট গ্রাফিটি। ‘সাইকোলজি ইন দ্যা বাথরুম’ নামের একটা বই আছে নিক হাসলান নামক এক ভদ্রলোকের। পাশ্চাত্যের গবেষণায় এসেছে, টয়লেটে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশি লেখা কিংবা ছবি আঁকার প্রবণতার কথা, কিংবা পুরুষ টয়লেট যেখানে ভরে ওঠে স্তন কিংবা পুংদন্ডের ছবিতে সেখানে নারীদের টয়লেটে দেখতে পাওয়া যায় হার্টের ছবি কিংবা রোমান্টিক বাক্যর আধিক্য।
আমাদের দেশে বিষয়টা নিয়ে কারো কোন কাজ আছে কিনা আমার জানা নাই। যদি না থাকে আমার মতে সাইকোলজি কিংবা সোশাল স্টাডিজের আওতায় বিষয়টা নিয়ে একাডেমিক আলোচনা কিংবা গবেষণা হওয়া উচিৎ। আমরা হয়তো গড়পড়তায় কিছু কথা বলে দিতে পারি, যেমন যারা এসব লেখে তাদের মানুষিক বিকৃতি আছে কিংবা এসব লেখা পুরুষতান্ত্রিক মানুষিকতার বহিঃপ্রকাশ অথবা যৌনতা বঞ্চিত মানুষদের অভিপ্রায়ের প্রকাশ বা কারো নাম সাথে মোবাইল নাম্বার লিখে প্রেমে ব্যার্থ প্রেমিক অথবা প্রেমিকার বা ভিন্ন কোন কারণে কারো ব্যাক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ। কিংবা আমরা পাশ্চাত্যের গবেষণার ফাইন্ডিংস গুলো সামনে এনে বিষয়টার সামাজিক কিংবা মনসতাত্বিক বিশ্লেষণ করতে পারি। প্রথমটায় সমস্যা- গভীর বিশ্লেষণের অভাব আর পরেরটায় ভিন্ন একটি দেশের ভিন্ন কোন সমাজের বিশ্লেষণ দ্বারা আমাদের সমাজের অপূর্ণ বিশ্লেষণের চেষ্টা।

একবার এক মার্কেটের টয়লেটে যেয়ে প্যানের সামনের দেওয়ালে দেখতে পেলাম লেখা- ডাইনে তাকান ; তাকালাম ডানে, ডানে দেখলাম লেখা- বামে তাকান; বামে তাকিয়ে দেখলাম- উপরে তাকান, উপরে তাকিয়ে দেখলাম লেখা – ওই আইছোছ টয়লেটে, এত দিকে তাকাছ ক্যান?

তাই ভাবছি, এহোন থেইক্কা টয়লেটে যাইয়া আর ডাইনে-বামে-উপরে তাকামু না, নীচে মনে হয় তাকান লাগবোই।

বিঃদ্রঃ আমার মোবাইলে তোলা কিছু টয়লেট রাইটিং এর পিক দিলাম, নিজ হজম শক্তি বিবেচনা করিয়া সবাই দেখিবেন আশা করি।