ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

১৪ ই ফেব্রুয়ারিতে কেউ ঘোষণা দিয়েছেন প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার, কেউবা প্রকাশ্যে কোলবালিশ নিয়ে ঘুরে বেরানোর। কেউ আবার বলছেন এই দিনে যুগলদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে। একদিকে যুগলেরা একত্র হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেনতো অন্যদিকে একাকী যারা তারা একত্র হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরকম বহুমুখী আয়োজনকে ঘিরে facebook এ ইভেন্ট খোলার রীতিমত হিড়িক লেগেছে। ভালবাসা দিবস পালনের ‘মহা’ গুরুত্ব আমার বলা অপ্রয়োজন। কারণ হাজার হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ভালবাসা দিবসের ‘গুরুত্ব’ কে আলোকিত করতে সহস্র স্লোগানের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে প্রতি বছরই। এই দিনে ফুল থেকে শুরু করে কার্ড,চকলেট, ডায়মন্ড, প্লাটিনাম প্রয়োজনে ইউরোনিয়ামের মার্কেটিং দিনকে দিন অসাধারণত্ব পেয়েই চলছে। এইদিনকে ঘিরে নাটক, কনসার্ট এর ধুম আর নতুন কিছু নয়। এই দিন যেহেতু এত আয়োজনপূর্ণ সেহেতু ভালাবাসা দিবস ছাড়া ভালবাসার যথার্থ প্রকাশ অসম্ভব আমরা তা ধরেই নিতে পারি। যদিও সর্বদা স্রোতের উলটা দিকে চলা জাহেদ ভাইদের মত মানুষেরা এই দিনকে কিউপিডের না ভেবে, ভাবতে চান প্লুটাসের দিন হিশেবে ( link: http://blog.bdnews24.com/zahed/66998)। অথবা এই দিনে মানব-মানবীর স্বাভাবিক অন্তরঙ্গতায় আধা বাঙালী-আধা ধার্মিকদের যথেষ্ট ‘জ্ঞানগর্ভ’ আলোচনায় এই দিন পালন যে খুবই অনুচিত তাও আমরা জানতে পারি।
সে যাই হোক, ১৪ ফেব্রুয়ারিকে রসময় গুপ্ত(মতিকণ্ঠের দাবী) কিংবা শফিক রেহমান আমাদের দেশে ‘ভালবাসা’ দিবস হিশেবে পরিচিত করানোর আগে দিনটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ’ দিবস হিশেবেই পালিত হত বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালের পর থেকে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাঙলাদেশের মাটি লাল হয়েছিল জয়নাল এবং শিশু দীপালি সাহার রক্তে – এ ইতিহাস আমাদের জানা সত্ত্বেও আরেকবার স্মরণ করতে মনে হয় কোন ক্ষতি নাই।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করা হলে সকল রাজনৈতিক দল এবং তাদের কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে। নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তৎকালীন ছাত্র সমাজ প্রথম থেকেই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে আসে। ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবসের’ পোস্টারিং করতে গিয়ে আগের রাতে গ্রেফতান হন তিনজন ছাত্রকর্মী। ৮ নভেম্বর ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে তার পরদিন মধুর ক্যান্টিনে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। ১১ দফার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ অন্যতম প্রধান দাবী ছিল এরশাদ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী ড.আব্দুল মজিদ খান কর্তৃক ১৯৮২ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর প্রণীত শিক্ষানীতি বাতিল করার। মজিদ খানের এই শিক্ষানীতি তৈরি করা হয়েছিল সাম্রদায়িকতা এবং শিক্ষার বাণিজ্যকীকরণের উপর ভিত্তি করে। এরশাদ এবং তার শিক্ষানীতির বিরোধিতা জোড়াল হয়ে ওঠে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরশাদের ধর্মকে অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করার রাজনৈতিক চাল এই আলোচনায় নিয়ে আসা অপ্রয়োজনীয়, কারণ এরশাদ একা যদি এই চাল চালতো বাঙলাদেশের ইতিহাসে তাহলে নাহয় বিষয়টা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যেত, ধর্মকে অনেকেই রাজনৈতিক বর্ম হিশেবে ব্যবহার করে আসছে যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় ৫৭ সংখ্যার একখানা ছোট-খাটো নিষেধাজ্ঞা জাড়ি আছে, আসুন আমরা সকলে ‘আইনের’ প্রতি সম্মান দেখাই।
যেখানে ছিলাম, ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়ে ওই দিন হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ঢাকার বুকে নেমে পড়ে। বিশাল এক মিছিল সচিবালয়ের অভিমুখী যাত্রা করে স্মারকলিপি পেশ করার উদ্দেশ্য নিয়ে। মিছিলটি পুলিশের দ্বারা বাধা-প্রাপ্ত হয় হাইকোর্ট-মোড়ে। পুলিশের বসানো কাঁটাতারের উপর উঠে পড়ে অনেকে। জ্বালাময়ী সব স্লোগানে ঢাকা কেপে ওঠে। হঠাৎ করেই মিছিলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ, নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস আর গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলির আঘাতে প্রাণ হারায় জয়নাল। আহত হয় জাফর,আইয়ুব,কাঞ্চনসহ আরো অনেকে। শিশু একাডেমীতে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষে জীবন হারায় শিশু দীপালি সাহা।
দীপালি সাহা, জয়নালদের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এর পরের বছর মানে ১৯৮৪ সাল থেকে মোটামুটি ১৯৯০ পর্যন্ত ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হতো ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিশেবে।
শফিক রেহমানের কল্যাণে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভালবাসা দিবস’ বাংলাদেশে প্রচলিত হওয়ার পর থেকে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়।
‘ভালবাসা দিবস’ যার খুশি সে পালন কিংবা অ-পালন করতেই পারে তবে মনে হয় ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি যারা নিজেদের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সুন্দর এক সমাজ(হতে পারবে কিনা কখনো সেটা ভিন্ন আলোচনা) বিনির্মাণের জন্য তাঁদের স্মরণ করায় আমরা কিছুটা ‘উদার’ হতেই পারি।।

সহায়িকা:
– সচলায়তন ব্লগ, ১৪-০২-১২