ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

স্যামুয়েল বেকেটের বিখ্যাত নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’র ভ্লাদিমির এবং এস্ট্রাগনের মত নিজেকে মনে হয়।  ক্রমাগত অর্থহীন সব কাজের ভিতর দিয়ে দিন পার করে দিচ্ছি।  জীবনে টিকে থাকার নিমিত্তে ক্লান্তিকর সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  ভাঙনধরা সমাজে এ চিত্র শুধু যে একার আমার তা মনে হয়না, চারদিকে সবখানেই শুনতে পাচ্ছি হতাশার সুর।  বিকারগ্রস্ত মানসিকতায় পুষ্ট হচ্ছি আমরা সকলে।  দু’দিন পরপরই শুনি ধর্ষণ, শিশু হত্যা, মানুষ জবাইয়ের সব লোমহর্ষক বর্ণনা।

কুমিল্লার তনুর ধর্ষণে শুনতে পাই পাহাড়ি কোন মেয়ে ধর্ষণের খবর মিডিয়া কাভারেজ না পাওয়ার আক্ষেপ।  আবার যখন পত্রিকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের উপর বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া অত্যাচারের উপাত্ত ছাপায় তখন শুনি গার্মেন্টস কর্মী কোন মেয়ের নীরবে ধর্ষিত হয়ে যাওয়ার খবর অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ার আক্ষেপ।

এ এক অদ্ভুদ বিকারগ্রস্থ সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা।  অন্যায় দেখি, অন্যায়ের ভার্চুয়াল প্রতিবাদ করি আবার অন্যায় মেনে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাই।  টিকে থাকি আমরা, টিকে থাকাকে অর্থ দিতে প্রতিনিয়ত করে যাই সকল অর্থহীন কার্যকলাপ।  পরিকল্পনা করি, প্রেমিকের হাত ধরি, খাই-দাই, ঘুমাই, আবার পরিকল্পনা করি, প্রেমিকের চুমো গিলি, খাই-দাই, তারপর ঘুমাই।

আমরা ভাবি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে অথবা আমরা অপেক্ষা করি ‘গডোর’ জন্য, যে এসে আমাদের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিবে। আমরা অপেক্ষা করি, ‘গডো’ কখনোই আসেনা, তারপরও আমরা অপেক্ষা করি।

অপেক্ষারত আমাদের উপর সওয়ার হয় রাষ্ট্রযন্ত্র।  আমাদের ঘুম-পড়ানি মাসী-পিসি গান শুনিয়ে যায় রাষ্ট্রযন্ত্র।  আমরা ঘুমাতে অবাধ্য হলে নেমে আসে ‘পবিত্র’ ‘আইনের শাসন’।  আমাদের মুখ তালা মারা হয় ৫৭ ধারায়, আমাদের জ্ঞানের চর্চায় আসে চাপাতির আঘাত।

মানুষ পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে আমাদের বিভিন্ন জাতীয়তা।  বাঙালী মেয়ে ধর্ষিত হলে কোন চাকমা মেয়ে বলে ওঠে, কই আমাদের মেয়েদের ধর্ষণেতো এত আলোচনা নাই! চাকমা মেয়ে ধর্ষিত হলে বাঙালী বলে ওঠে, মেয়েদের দেহ যেখানে সর্বত্র ছিন্ন-ভিন্ন সেখানে শুধু পাহাড়ের ধর্ষণ-পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তা কি? আমরা নিজেদের ভিতর অনবরত এসকল যুক্তি, পাল্টা যুক্তির প্রয়োগ চালিয়ে যাই।  আমরা বলি নৃগোষ্ঠীদের ইতিহাসে ধর্ষণ নাই তোমরা ‘সেটলার’ মগদা বাঙালরা আমাদের ধর্ষণ শিখিয়েছো, শিখিয়েছো প্রতারণা। আমরা প্রতিউত্তরে বলি, তোমরা ‘আদিম-জঙলীরা’ আমাদের একসময় নির্মমভাবে হত্যা করেছো, আমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করেছো, চেয়েছো মগের মুলুক প্রতিষ্ঠা করতে, বিরোধিতা করেছো মুক্তিযুদ্ধের।  আমাদের নিরন্তর তর্ক চলতে থাকে দিনের পর দিন।  জাতীয়তা এবার চলে ক্ষুদ্র আর ক্ষুদ্রতরের মাঝে।  আমরা শুনি কোন মারমা কিংবা সাঁওতালি ছেলেকে বলতে, কোটা কি আর আমাদের জন্য? ওটাতো বরাদ্দ থাকে চাকমাদের জন্য! বাঙালীরাই শুধু ধর্ষণ করে- প্রতিষ্ঠায় কোন ওঁরাও কিংবা হাজং নারীর ধর্ষণ-খবর চেপে রাখা হয় একদিকে।  অন্যদিকে যখন বিদ্রোহ দমনের ধুয়ো তুলে রাষ্ট্র যন্ত্রের সৈন্যদের মদদে চলে সহজ-সরল পাহাড়ি নারী দেহের উপর অত্যাচার তখন আমরা খুঁজে দেখতে চাই পাহাড়িদের বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র তৈরির নীল নকশা।

কৃষণ চন্দর তাঁর ‘পেশোয়ারি এক্সপ্রেস’ গল্পে যেমন দেখিয়েছে হিন্দু পুরুষ নিধনে, হিন্দু মেয়ে ধর্ষণে মুসলমানেদের উল্লাস কিংবা মুসলমান পুরুষ জবাইয়ে, মুসলমান মেয়ে ধর্ষণে হিন্দুদের বিজয়গান।  ঠিক তেমনি এখনো এই সমাজে কোন হিজাব পড়া মেয়ে ধর্ষিত হলে একপক্ষ সহমর্মিতা দেখিয়ে বলে, দেখলে পর্দাহীনতাই ধর্ষণের মূল কারণ না।  অন্যদিকে হিজাববিহীন কোন সিঁদুর-কপালে নারীর ধর্ষণে আমরা সহমর্মিতা মিশ্রিত কন্ঠে শুনতে পাই, শান্তির ধর্মে প্রবেশ এবং অতঃপর হিজাব করলে এ বোনের আজ এ পরিণতি হতোনা। আমরা জানিনা, ধর্ষক পুরুষের উত্থিত পুং দণ্ড হিজাব খুঁজে নাকি খুঁজে না, তবে আমাদের কাছে দুইপক্ষের সহমর্মিতাকে বেশ মেকি মনে হয়।

আমরা যখন এমন ক্রমাগত তর্কে নিজেদের জড়িয়ে ফেলি রাষ্ট্রযন্ত্র তখন আমাদের সকলের সাথেই তাল দেয়।  সময়-স্থান বুঝে রাষ্ট্রযন্ত্র একবার দেশকে ধর্ম নিরপেক্ষ বানায় আবার ভিন্ন সময়-স্থানে দেশ চলে মদিনা সনদে।

আমরা দেখে যাই, শুনে যাই, মাঝেমাঝে চিন্তা করে যাই, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।  সময়ের আবর্তনে আমরা বিকারগ্রস্থ হয়ে উঠি, প্রথম প্রথম আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, তারপর প্রতিবাদ ভুলে যাই, হয়ে পড়ি একসময় মৌন, অপেক্ষা করি কেউ এসে সকল অন্যায় দূর করে দিবে, অপেক্ষা করি আমরা, ক্লান্ত হই, কেউ আসেনা, ‘কেউ’ কখনো আসেনা জেনেও না জানার ভান করি, হতাশ হই আমরা, নিজেদেরই না হয় অন্যায়ে ডুবিয়ে দেই- ভাবি।  ধর্ষণের-হত্যার খবর আসে আমাদের কানে।  বিকারগ্রস্থ আমরা হেসে উঠি হা হা করে।