ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ধর্মের ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করার ভাষা কী হবে এটা ফিলোসফিক্যাল থিওলজির একটা বড় সমস্যা। সংজ্ঞার পর আসে ঈশ্বর সম্পর্কে কী বলা হবে মানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ভাষায় প্রকাশ করতে চাইলে কি ঈশ্বরীয় সত্তার সাহায্য নেওয়া হবে? ঈশ্বরীয় সত্তা প্রকাশে কী ভাষা ব্যবহার করা হবে? ধর্মীয় ঈশ্বরকে ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে ধর্মীয় অর্থোডক্স ব্যাখ্যার মানুষেরা যেসকল সত্তাসূচক শব্দ ব্যবহার করেছে সেগুলো- হয় হয়ে গিয়েছে মানুষের সত্তা প্রকাশের শব্দ কিংবা সত্তার স্থলে ব্যবহৃত হয়েছে বৈশিষ্ট্যবাচক শব্দ। একটা শব্দ যেমন দয়ালু- এই শব্দ কি সত্তাসূচক শব্দ নাকি এক্সিডেন্টাল শব্দ এটা প্রথমে ঠিক করে নিতে হবে। এক্সিডেন্টাল শব্দ, মানে এমন শব্দ যা সত্তা প্রকাশে কোন ভূমিকা রাখেনা, যদি হয়ে থাকে তাহলে দয়ালু শব্দটা হয়ে ওঠে একটা গুণবাচক শব্দ। গুণবাচক শব্দ যদি হয় তবে প্রশ্ন এসে যায় এই দয়ালু কি মানব অভিজ্ঞতায় এবং ভাষায় উপস্থিত থাকা দয়ালু নাকি মানুষের চিন্তার বাইরে কোন শব্দ যার রুপ মানুষ কখনো অভিজ্ঞতায় পায়নি, যদি মানব অভিজ্ঞতার দয়ালু হয়ে থাকে তবে ঈশ্বরের মানব সত্তা থেকে আলাদা শক্তিশালী(এই শব্দদ্বয়েও ভাষার সমস্যা থেকে যায়) সত্তা হয়ে ওঠায় বাধা প্রাপ্ত হয়। এই সমস্যা উত্তরণে বিভিন্ন আনঅর্থোডক্স ধর্মীয় তত্ত্ব( আনঅর্থোডক্স শব্দ শুধুমাত্র এই সকল তত্ত্বের অনুসারীদের সংখ্যা বহুলাংশে কম হওয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যেহেতু ধর্মীয় ব্যাখ্যার কোন একটা সুনিশ্চিত স্কুল অফ থট নাই তাই অর্থোডক্স বা আনঅর্থোডক্স শব্দের ব্যবহার বিকল হয়ে পড়ে) ‘আমিই সেই, সেই আমি’ বা সর্বেশ্বরবাদের প্রচলন ঘটিয়েছে। অন্যদিকে দয়ালু শব্দটা যদি এক্সিডেন্টাল নাহয়ে সত্তাসূচক হয়(তখন আবার মানুষের এই শব্দের অভিজ্ঞতাগত কিংবা শব্দের মরফোলজিক্যাল আলোচনা বাধাগ্রস্ত হবে তাও যদি একটা হাইপোথেসিস ধরে নেওয়া হয়- তখন আবার হাইপোথেসিসের মেথোডলজি হয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে) তবে সেই দয়ালু সত্তাকে মানুষ কিভাবে প্রকাশ করবে এই প্রশ্ন থেকে যায় কারণ এই শব্দের রুপই তখন মানুষের কাছে অপরিষ্কার হয়ে যাবে।
ধর্মীয় ভাষার সমস্যা উত্তরণে যেসকল ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাখ্যা আছে তাদের ভিতর ভায়া নেগেটিভা, এনালজি, সিম্বোলিজম এবং মিথ অন্যতম। দার্শনিক পল টিলিচের (Paul Tillich) এর মতে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ব্যাখ্যা সর্বাপেক্ষা ভালভাবে প্রকাশিত হয় সিম্বোলিজমের মাধ্যমে(Problem of religious language, wikipedia)। প্রতীক, রুপক/উপমা,গোপন জ্ঞানের সমস্যা হচ্ছে এদের ব্যবহার করে ব্যাখ্যা-দেওয়া তত্ত্বে কিংবা টেক্সচুয়াল বা মহা-মানুষদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে বহুধাবিভক্ত এবং ব্যক্তি নির্ভর উপলব্ধির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগ থেকে যাওয়া। পল টিলিচই সম্ভবত সিম্বোলজিমের আলোচনায় পতাকার উদাহরণ টেনেছিল। পতাকার বিভিন্ন রঙ, প্রতীকের আড়ালে যেমন একটা সংজ্ঞায়িত নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকে তেমনি ধর্মীয় ভাষার ব্যাখ্যায় সিম্বোলজিমকে ব্যবহার করা যায়।

এই আলোচনার সমস্যা হচ্ছে পতাকার বিভিন্ন দৃশ্যমান উপাদানের পিছনে থাকা ব্যাখ্যা রাষ্ট্র বা ব্যক্তি বা অন্য যে কোন সংস্থা নির্দিষ্ট করে দেয়। প্রতীকের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার বাইরে আরেকটি যে ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে সেটি হল প্রতীকের কারো দ্বারা ধরে নেওয়া কোন অর্থকে(অবশ্যই ব্যাখ্যার আশ্রয় থাকে) আদর্শ হিশেবে অজস্র সময় ব্যবহার করা, যেমন লাল ভালবাসার প্রতীক (তাই কি?)। এ ধরণের ব্যবহারে অতিরিক্ততা চেপে বসলে তার উপর ক্লিশের ট্যাগ লেগে যায় বা উক্ত নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার তখন রি বা ডিকন্সট্রাকশন করার চেষ্টা চলে।

এই দুই আলোচনা ধর্মীয় ব্যাখ্যায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ ধর্মীয় ব্যাখ্যার যদি একমুখী নির্দিষ্টতা থাকত তবে ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যার সমস্যা’ ডিসকোর্সটিই সৃষ্টি হতোনা। যদিও ধর্মের ভাষা বা ব্যাখ্যার সমস্যা ডিসকোর্সটি চাপিয়ে দেওয়া নাকি সেটিও আরেকটি ডিসকোর্স, তবে ফিলোসফিক্যাল থিওলজিতে যেহেতু আলোচনাটা হয় তাই বিষয়টা নিয়ে কথা বলাই যায়। কিছু ধর্মের কোন প্রকার নব্য সংস্কার বিরোধি অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির দরুন দ্বিতীয় আলোচনাটি প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

 

এই আলোচনার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা যাক- বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় টেক্সটের বিভিন্ন প্রতীকীয় বা রুপকীয় ব্যাখ্যার প্রতিষ্ঠাকে ধর্মীয় সহিংসতা বন্ধের একমাত্র উপায় হিশেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, আবার শুধুমাত্র রুপকীয় ব্যাখ্যা হলেই হচ্ছেনা, বিভিন্ন স্কুল অফ থটস নিজেদের সৃষ্ট ব্যাখ্যাকেই একমাত্র সঠিক পন্থা হিশেবে দাবী করছে। ইতিহাস পড়লে যে কেউ দেখতে পাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যার রুপকীয় নির্দিষ্টকরণের চেষ্টা ধর্মগুলা(বিশেষকরে সেমেটিক) সৃষ্টির কিছুদিন পর থেকেই হয়ে এসেছে। আগ্রহীরা ৬৫৬-৭৫০ সালের বৈশ্বিক ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন, নির্দিষ্ট একটি ধর্মের বহুমুখী ব্যাখ্যা দেখার জন্য। কিন্তু কখনো কোন সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন ব্যাখ্যা। তাই বর্তমান সময়ে যখন একই আলোচনা হয় তখন একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি দেখে হতাশ হতে হয়। একটা উদার মানবিক বিশ্ব গঠনে সম্ভবত আমাদের ভিন্ন পথ খোঁজায় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।