ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

‘কমলা রকেট’ এর চিত্রনাট্য চলচ্চিত্রে বহুল-চর্চিত তিন অংকের গঠনকে পাশ কাটিয়েছে। চলচ্চিত্রে কোনও প্রধান-সংকট নাই, নেই কোনও সংকট-সমাধান। বরং পুরো চিত্রনাট্য জুড়েই আছে চরিত্রে-চরিত্রে, দৃশ্যে-দৃশ্যে, তত্ত্বে-তত্ত্বে, পরিবেশে-পরিবেশে সংকট বা দ্বন্দ্ব।

স্টিমারের প্রথম শ্রেণির কামরায় পাশাপাশি দুজন অবস্থান করেন। এদের একজন অতি বুর্জোয়া শিল্প কারখানার মালিক। আরেকজন উঠতি বুর্জোয়া স্ত্রীর টাকা নিয়ে গড়ে তোলা গাড়ির শো রুমের মালিক। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রায়শই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উঠতি বুর্জোয়া তার শ্রেণিগত গুরুত্ব বোঝানোর জন্য যখন শিল্পমালিককে জানায় সে পাঁচ বছর ধরে ঢাকা ক্লাবে যাতায়াত করে তখন প্রত্যুত্তরে সে শুনতে পায় শিল্পমালিকের পাঁচ বছর আগে পরিবেশ খারাপ হয়ে ওঠায় ঢাকা ক্লাব ছেড়ে দেয়ার কথা।

অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের যখন সময় কাটে সরকারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কিংবা চাকরি লাভে ঘুষের অংক এদিক-ওদিক করতে তখন প্রান্তিক মানুষেরা গান গেয়ে, সার্কাস দেখিয়ে কিংবা যৌনকর্মী যোগান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

উঠতি বুর্জোয়ার শ্যালিকার সামাজিক সংগঠন খোলার বাসনা কীভাবে সরকারি চাকরির প্রাথমিক-ধাপ পাশ করার সাথে সাথে উবে যায় কিংবা যৌনকর্মীর কথা বলাতে যোগানদারের সঙ্গে খেপে যাওয়া বুর্জোয়া কীভাবে পরবর্তীতে যোগানদারের ভিজিটিং কার্ড হাতড়িয়ে বেড়ায়- দৃশ্যগুলোর মধ্য দিয়ে চরিত্রের দ্বিভাব দেখানোর চেষ্টা চলচ্চিত্রে বেশ চমৎকার ভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

বহু শ্রেণিতে বিভক্ত মানুষেরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিজেদের শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্য ভুলে গিয়ে এক থালা ভাতের জন্য কেমন সবাই এক সারিতে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হয় তা শাহাদুজ্জামানের গল্প ‘মৌলিক’ এ যেমনটা নান্দনিকভাবে লেখা হয়েছে তেমনি ‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রেও বিষয়টা ভীষণ শক্তিশালীভাবে দেখানো হয়েছে।

চরিত্রের ভেতর ও বাইরের পরস্পরবিরোধী এই ভাব বজায় ছিল চলচ্চিত্রের শেষ ফ্রেম পর্যন্ত।  শুধু দ্বান্দ্বিকতা বলে এর নান্দনিকতার যথার্থতা প্রকাশ সম্ভব নয়। মনসুরের তীব্র বেদনার কারণ আতিক তারই পাশে বসে ভাত খায়, আর মনসুর তাকে মরিচ এগিয়ে দেয়- মানবতার জয়ে বা পরাজয়ে কেন যেন অনুভূতিতে এক শীতলতা তখন স্থান করে নেয়।

স্বপ্নে বুর্জোয়া আতিকের জলে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য পেয়েছে প্রতীকতার স্পর্শ- বস্তুবাদের ভিতর ডুবতে বসা এক মানুষকে দেখতে পাওয়া যায় সেই দৃশ্যে।ছিন্নবস্ত্র আর এলোমেলো চুলের মহিলার বা লাশ-গন্ধের প্রভাবের দৃশ্যগুলো আমাদের হয়তো ভেঙ্গে-পড়া একটা রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

একই ফ্রেমে আতিক এবং মনসুরকে পাশাপাশি বসাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে সিনেমা। এই উদ্দেশ্য পূরণ করাতে গিয়ে গল্পকে হয়তো সুনির্দিষ্ট, পূর্বনির্ধারিত পথ দিয়ে প্রবাহিত করা হয়েছে; পূর্বনির্ধারণ-পন্থার পরিবর্তে গল্পকে নিজস্ব-প্রবাহের উপর ছেড়ে দিলে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো হয়তো  বেশি শক্তিশালী হতে পারতো।

চরিত্রের স্বরূপ গঠনে দেহভঙ্গি এবং ভাষা যে ভূমিকা রাখে সেটার সাহায্য সম্ভবত চলচ্চিত্রকার ও চিত্রনাট্যকার কম নিয়েছে। যে কারণে মোশাররফ করিমের চরিত্র যতটা শক্তিশালী মনে হয়েছে ততটা মনে হয়নি তৌকির আহমেদ বা সামিয়া সাঈদের চরিত্রকে।

পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে বলতে ব্যর্থ হচ্ছি কেন মিউজিক এবং স্কোরিং কিছু জায়গায় অতৃপ্তি জাগিয়েছে।

ড্রোন শটগুলো ভালো লেগেছে এছাড়া উল্লেখ করার মতো ভীষণ চমৎকার কোন সিনেমাটোগ্রাফি যেমন স্মরণে নেই, তেমনি নেই সিনেমাটোগ্রাফির দুর্বল কোনও দিকও।  নির্মাণে পরিচালক নুর ইমরান মিঠু বেশ সাবলীলই ছিলেন।

শাহাদুজ্জামান আমার ভীষণ পছন্দের লেখক; তার গল্প ও চিত্রনাট্যে তৈরি চলচ্চিত্র দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষার ফলাফল- বেশ অসাধারণ একটা চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন।

slide