ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

ঊনিশ’শ একাত্তর সাল মুক্তিযুদ্ধের বছর। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাস এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু এ স্বাধীনতার পেছনে যেমন রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস তেমনি রয়েছে সঙ্গীত সংস্কৃতির ইতিহাস। কাজেই স্বাধীনতার গানের মূল্যায়ন করতে হলে ফিরে যেতে হবে গণসঙ্গীতের ইতিহাসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট, বরিশালে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। আর পেছনে রয়েছে সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের নিরলস সংগ্রাম। এ বিজয়ের গানের সঙ্গে হাজার বছরের ঐতিহ্য জড়িত। দেশী-বিদেশী শাসক ক্ষমতায় এসেছে-গেছে কিন্তু বাংলাকে কুক্ষিগত করে, জনগণকে অত্যাচার করে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি। সংগঠিত হয়েছে বিদ্রোহ। আর সেই বিদ্রোহের গান তৈরি হয়েছে শিল্পী-গীতিকার ও সুরকারদের যৌথ শিল্পকর্মে।

২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, সমর দাস চলে গেছেন। তাঁর স্মৃতি আজও সমুজ্জ্বল। তাঁর সৃষ্টি এখনো মর্মে মর্মে বাজে। কালের ডামাডোলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তের দাগ মুছে গেছে, কিন্তু আজও তাঁর স্বাধীনতার গান আমাদের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল ও জাজ্বল্যমান। এখনো রক্তে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ।

সমর দাস ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান পরিচালক ছিলেন। ওই সময় অনেক গানে তিনি সুর করেন। তার সুর করা গান যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করত। মুক্তিযুদ্ধে তার সুর করা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’, ‘চিরদিন আছে মিশে’ এবং ‘ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা’ গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সুরবিন্যাস করে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ মূল গানটি বিবিসি লন্ডন থেকে সামরিক ব্রাশব্র্যান্ডে রেকর্ড করার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

index

সমর দাস ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার লক্ষ্মীবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের কাছেই তার সংগীত শিক্ষা শুরু হয়েছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্রে বংশীবাদক হিসেবে সংগীত জীবনের সূচনা করেন। অল্প বয়সেই গিটার ও পিয়ানো বাজানোর জন্য তার চারদিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পঞ্চাশের দশকে তিনি কলকাতায় হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানিতে কাজ করে সুখ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে সংগীতপরিচালক হিসেবে যোগ দেন সমর দাস। এখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত কাজ করেন। রেডিও-টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য বাংলা গানের সংগীত পরিচালনা করেন।

বাংলা ছায়াছবির সংগীত পরিচালক হিসেবেও সমর দাসের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৫০ সালে কলকাতার বাংলা ছবি লটারি’র অন্যতম সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। এছাড়া প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ ছায়াছবির সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য দুই হাজারেরও বেশি গানে সুর করেছেন। ১৯৮৫ ও ১৯৯৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমস সূচনা সংগীতের সুরও তিনি করেন।

বাংলাদেশে ‘সংগীত পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই সমর দাস এর সদস্য ছিলেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়েই এই স্বাধীনতা। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একাত্তরের নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ। এ যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ। সংগ্রামের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় সৃষ্টি হয়েছে অজস্র গান। বাঙালির ঐতিহ্য হাজার বছরের। যতোদিন বাঙালি থাকবে, যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততোদিন স্বাধীনতার গান বেঁচে থাকবে আর পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার মতোই তিনিও যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো