ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

বাংলার প্রকৃত শরতের অপরূপ সাজের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাও প্রায় এক যুগ আগে। সে সময়ে দেশে প্রায় বছর খানেক অবস্থান করেছিলাম। তার মাঝেও যাওয়া পড়েছে বেশ ক’বার। তবে তা স্বল্পকালীন সমেয়ের জন্য। অল্প সময় হাতে নিয়ে গেলে সাধারনত শীতকালকেই বেছে নেই। শুস্ক আবহাওয়ার কারনে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বাড়ীতে যাতায়াত এবং সর্বোপরি ভ্রমনে সহায়ক একটি কাল।

ঢাকা শহরে একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম। আমাদের ফার্মগেট এলাকাটার মাঝে তখনও একটা গ্রাম গ্রাম ভাব ছিল। বাড়ীর আঙ্গিনার ভেতর উঠানে ছিল জুঁই আর শিউলি ফুলের গাছ। শরতের প্রভাতে ঘুম থেকে উঠেই জ্ঞাতিভাই-বোনেরা মিলে কুড়াতে শুরু করতাম শিউলি আর জুঁই ফুলের ঘ্রাণে কী যে আনন্দ লাভ করতাম! তাছাড়া বছরে দু’বার গ্রামের বাড়ীতে যাওয়া পরত। বেশিরভাগ সময়ই বকরী ঈদ ও শারদীয় উৎসব একই সাথে পড়ে যেত। শহর থেকে এসেছি বলে একটু উপরি, বাড়তি খাতির যত্ন পেতাম বটে। তবে ওসবের তোয়াক্কা না করে, যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম গ্রামের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে। সমবয়সীদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে। তাতে আনন্দ বাড়ত বৈকি কমত না। জানালা খুলতেই রাতের শিশির বুকে নিয়ে ঝরে পড়া ঈষৎ লালচে বোঁটার ধবল শিউলীর বুকে চিকচিক করা কচি রোদের সোনালী-লাল আভা দর্শনে প্রাতরাশ সমাপ্ত করা, ভাদ্রের তালপাকা দুপুরের গরমে উঠানে খেলাধুলা, ছুটোছুটি; বিকেলের পড়ন্ত বেলায় বিদায় নেয়া বর্ষার জলধারা বুকে নিয়ে বয়ে চলা শান্ত সরোবর নদীর বাঁকের নরম-কোমল হাওয়ার দুলুনিতে কাশবনে লুকোচুরি খেলা। আহা! নীল অম্বর তলে ভেসে বেড়ানো শুভ্র রাশি রাশি মেঘমালার সেই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠত তরঙ্গবিহীন শান্ত সৌম্য দীঘি-ঝিলের স্বচ্ছ টলটলে জলে। শ্বেতশুভ্র শিউলি, বকুল, মল্লিকা, কামিনী, মাধবী ফুলের সুরভিতে মুখরিত হয়ে উঠত পল্লীর প্রকৃতি। পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে গগনের বুকে চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরিতে প্রকৃতিকে অনন্য লাগত। সব মিলিয়ে শরতের অপরূপ শোভা সত্যি মুগ্ধকর। শরতের এই নির্মল প্রকৃতি কারই না ভালো লাগে।

পৃথিবীর আরেক প্রান্তে শরতের প্রকৃতি অনুভব করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মাসটা ছিল এ বছরের আগস্টের শেষের দিকে। ‘দাচা’ বা কান্ট্রি কটেজে গ্রীষ্মকালীন সময়ে টুকটাক কাজ কিছু না কিছু থাকেই। কুটিরের ভেতরে ও বাহিরে মেরামতের, বাড়ীর আঙ্গিনার ভেতরের খন্ড জমিতে শাক-সবজি আবাদ করার, আশে-পাশের প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে ওঠা আগাছা পরিষ্কার করা; কাজগুলো ইত্যাদি। এখানে কাজের ধরন খুব একটা জটিল না হলে সাধারনত কেউ মিস্ত্রী বা কারিগরের দ্বারস্থ হয় না। নিজেই সেরে নেয় মামুলি কাজগুলো। কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে একটু জিরানো আর পাশাপাশি চলে শাশলিকের আয়োজন। তারপর একটু ফ্রেশ হয়ে পড়ন্ত বেলায় বৈকালীন ভ্রমনে বের হওয়া। গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ই চোখ গিয়ে পড়ে আকাশের ওপর। বাহ! চমৎকার স্বচ্ছ নীল আকাশ, তলে ভাসমান সাদা সাদা মেঘের ভেলা। আরও কিছু দূর এগিয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটা। যদি চোখে পড়ে যায় অকস্মাৎ কাশবন! শরতে কাশফুল দেখলে যে কোন পথিক ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়াবে, প্রকৃতি কীভাবে সেজেছে তা একনজর দেখার জন্য। অনেক নাম না জানা জংলী ফুলের গন্ধ পাওয়া গেল। কিন্তু নেই জুঁই, শিউলি, কামিনী ফুলের মন মাতোয়ারা গন্ধ।

গোধুলি লগ্ন। এবার নীড়ে ফেরার পালা। ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া শরতের স্মৃতি আংশিক হলে অনুভূত হলো। তাই বা কম কিসে। অন্তত নাই মামা থেকে কানা মামা তো। ছেলেবেলায় আমরা ভালো করে জানতামই না শরৎ প্রকৃতির এ অসীম সৌন্দর্য আমাদের নিত্যনিয়মিত বরাদ্দ। জননী যেমন প্রতি ক্ষুদ্র কাজে অজস্র স্নেহের দ্বারা আমাদেরকে অনুক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখেন, তার মধ্যে অনেকটাই আমাদের আবশ্যকের অতিরিক্ত, তার অনেকটাই আমাদের নজরে পড়ে না, তার অনেকটাই আমরা অবহেলে গ্রহণ করি, কিন্তু বিচার করি না, কিন্তু উদার মাতৃস্নেহের তাতে কিছুই আসে যায় না – প্রকৃতিও সেরকম।

* সব আলোকচিত্রগুলো আমার নিজের তোলা। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।