ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

[আজ ২৪ অক্টোবর। প্রতিথযশা আলোকচিত্র শিল্পী প্রয়াত শ্রদ্ধেয় রশীদ তালুকদারের ৭৩তম জন্ম বার্ষিকী। তাঁর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে এই পোস্টের অবতারণা।]

মানুষের চোখের তারায় হরহামেশাই বন্দি হয় নানান রকম দৃশ্য৷ আবার তা মুছেও যায়৷ তবে এমন কিছু দৃশ্য বা প্রিয় মানুষের মুখ আছে যা ব্যক্তির হৃদয়কে আলোড়িত করে৷ আর তা হয়তবা আজীবন চিরসজীব হয়ে থাকে ব্যক্তির স্মৃতিপটে। তবে মনের ফ্রেমে আঁকা ছবি একান্তই নিজের৷ অন্যকারো সাথে এই ছবির সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, কষ্ট, ঘৃনা, ভালবাসা, আবেগ অনুভূতি ভাগ করা যায়না৷ কারন সে ছবি কাউকে দেখানো যায় না৷ একারণেই কোন বস্তু বা ঘটনার সত্যতা, বাস্তবতাকে যুগের পর যুগ ধরে রাখতে, একটি ছবির আবেদন ব্যক্তি পরম্পরায় চিরন্তন করে রাখার চিন্তা থেকেই হয়ত ক্যামেরার উদ্ভব। ছবি যেমন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে তেমনি মানুষের আবেগ অনুভূতিও জাগ্রত করে৷ এমন কি মানুষের চিন্তা চেতনা, বোধবুদ্ধিকেও পাল্টে দিতে পারে৷ তবে এমন কোন বস্তু, ঘটনা বা কাহিনী যা ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বা মানবীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এমন ছবি ক্যামেরায় ধারণ করার জন্য চাই অনুসন্ধিত্সু, সৌন্দর্যপিপাসু ও সৃজনশীল চোখ৷ এমনই এক অনুভূতিশীল শিল্পী মনের অধিকারী রশীদ তালুকদার৷

বঙ্গবন্ধুর সাথে, ১৯৭৩

বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য আলোকচিত্রীদের সাথে, ১৯৭২

আজকের আলোকচিত্র আগামীদিনের ইতিহাসের পাতা৷ রশীদ তালুকদারের ছবিতে পাওয়া যায় জীবনের কথা, সমস্যার কথা, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং জনসাধারণের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিদর্শন৷ তাঁর ছবিতে বিষয়বস্তুর যে বিচিত্র সমাহার তা আর অন্য কোন আলোকচিত্র শিল্পীর ছবিতে তেমন দেখা যায় না৷ তাঁর ছবি দেখলে বোঝা যায় অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর কাজ করছে৷ ঠিক সময়মত তিনি তাঁর ক্যামেরার সাটার ক্লিক করেছেন৷

তরুণ বয়সে

বিদ্রোহী কবির সাথে, ১৯৭৬

তাঁর বিখ্যাত, বহুল প্রচারিত ও মুদ্রিত এমন কিছু ছবি রয়েছে যা ইতিহাসের সত্যতাকে ধারণ করছে যুগ যুগ ধরে৷ তাঁর অনেক ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবির কথা না বললেই না৷ তাঁর এমনই একটি আলোকচিত্র যা সময় এবং কালকে অতিক্রম করে বারবার ইতিহাসকে নাড়া দেয়, আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় মিছিলে শ্লোগানরত নিহত টোকাই’এর ছবিটি৷ গণঅভ্যুত্থানের শেষ মিছিল ছিল এটি৷ আইয়ু্ব খানের ছবিতে জুতার মালা পড়িয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এই মিছিলটি যখন শিক্ষা ভবনের মোড়ে এসে পৌঁছায় তখন রশীদ তালুকদারের চোখ আটকে যায় এই শীর্ণ টোকাই’এর উপর৷ টোকাইটির চোখের ও মুখের প্রতিবাদী ভাষা সারা দেশের নিপীড়নের কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে আহবান জানায় এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ডাক দেয়৷ এ ধরণের আহবান শাসকগোষ্ঠীর কোনভাবেই কাম্য নয়৷ তাই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করে তিনি পিছন ফিরে ঘুরে দাঁড়াতেই শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ইপিআর কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ছেলেটি নিহত হয়৷ কিন্তু তাঁর ক্যামেরার ফ্রেমে সেই সময়ের নির্ভীক সাহসী প্রতিবাদ জীবন্ত হয়ে আছে, থাকবে৷

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর আঙুল উঁচিয়ে ভাষণ দানের মুহুর্তটিও তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ক্যামেরায় বন্দি করে ফেলেন৷ বঙ্গবন্ধুর ছবিটি তাঁর তেজোদীপ্ত আত্মপ্রত্যয়, দৃঢ় অবস্থান, কঠিন সংগ্রামের শপথকে যেন প্রকাশ করছে৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি এ ছবির মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়৷

দেশের প্রথিতযশা আলোকচিত্র শিল্পী রশিদ তালুকদার ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য ছবি তুলেছিলেন। যা দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের সংগ্রামের কথা পৌঁছে দিয়েছিল। তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্ত ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়েছিলেন কিছু মানুষ। জীবন বাজি রেখে তোলা তাঁদের সেইসব ছবি দিয়ে আজ আমরা ’৭১-কে দেখি, স্মরণ করি। যাদের ত্যাগে আজও ’৭১ জীবন্ত। অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবি তুলেছেন দেশের জন্য। তারাও যোদ্ধা, ক্যামেরাযোদ্ধা। এমন একজন যোদ্ধা রশিদ তালুকদার।

১৯৭১ এ শুরু হয় মুক্তির লড়াই৷ চারপাশে কেবল ধ্বংস, ক্রন্দন, হাহাকার, আহাজারি আর জ্বালাও পোড়াও৷ পত্রিকা অফিসগুলোও সব পুড়িয়ে দেয়া হয়৷ এসময় তিনি প্রফেশনাল কাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন৷ কিন্তু তার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি তাঁকে নিয়োজিত করেন৷ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আইডি কার্ড করে দিতেন৷ হাজার হাজার আইডি কার্ড করে দিয়ে তিনি মুক্তিসেনাদের পাকিস্তানীদের মরনফাঁদ থেকে বাঁচাতে সহযোগিতা করেছেন৷ এছাড়াও তিনি মুক্তিসেনাদের বাড়িতে থাকতে দিয়ে ও অন্যান্য সকল প্রকার সহযোগিতা করে মুক্তিযুদ্ধের সাথে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন৷ আর তাঁর ক্যামেরা তো ছিল তার সকল সময়ের সঙ্গী৷

পোপ জন পল দ্বিতীয় এর সাথে

মাদার তেরেসার সাথে তাঁর নিজস্ব বাসভবনে, ১৯৮০

ক্যামেরার ফ্রেমে তিনি বন্দি করেছেন অনেক ইতিহাস, বাস্তবতা, মানবতা৷ ছবি দিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন অনেক সত্যকে৷ তাঁর ছবি বলেছে অনেক নির্যাতিতদের অব্যক্ত কথা৷ ক্যামেরার পেছনে থেকে যে মানুষটি দিনের পর দিন জাতির জন্য মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন নিরবধি। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি তাঁকে।

*তথ্য সংগ্রহ: উইকিপেডিয়া ও অন্তর্জালের বিভিন্ন ওয়েব সাইট
*ছবি: অন্তর্জাল থেকে