ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

বৃষ্টি ছিল না। ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই টুপটাপ ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে মাঝে মাঝে সুয্যি মামার উঁকিঝুকি। এক চিলতে রৌদ্রজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে আবারও কান্না। এই ই চলছে হেমন্ত আগমনের পর। সবুজ থেকে হলদে-তামাটে ও সোনালী বর্ণ ধারণ করা পাতাগুলো ঝরে যাচ্ছে ক্রমাগত। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম আর হেমন্তে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষগুলো ন্যাড়া হবার পথে। রাতে একটু সকাল-সকাল শুতে যাবার আগে ব্যালকনে দাঁড়িয়ে আগামীকালের আবহ অনুভবের চেষ্টা রত ছিলাম।

ঘুমোতে যাবার আগে দুটো ফোন এলো খুব নিকটতম বন্ধুদের কাছ থেকে। তাদের সাথে অগ্রিম ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর নামাজের স্থানকে কেন্দ্র করে শুভ রাত্রী জানিয়ে কথা শেষ হলো। একজন যাচ্ছেন মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে আর দ্বিতীয়জন অল রাশিয়ান এক্সজিবিশন সেন্টারের কিরগিজ প্যাভিলিয়নে। দু’জনের একজনকেও কোনো কথা দিলাম না। শুধু বললাম, “মনে কিছু নেবেন না। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই যে দিকে মন টানবে সে দিকেই চলে যাব”। এক জায়গায় জামাত শুরু হবে সকাল সাড়ে ন’টায়। অন্য জায়গায় দশটায়। যেখানেই যাই না কেন, ঘুম থেকে উঠতে হবে সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার ভেতর। টিভি এলার্ম সেট করে বিছানায় যাবার প্রস্তুতি নিলাম। কিছুতেই ঘুম আসছে না। চোখের পাতা দুটো বন্ধ অবস্থায় চিন্তার ঘোরে ঘুরপাক খাচ্ছি। বাংলাদেশ দূতাবাসে গেলে সেখানে নামাজের পর হালকা খানা-পিনার ব্যবস্থা থাকে। সেমাই, জর্দাসহ কয়েক প্রকার মিষ্টান্ন জাতীয় আইটেম। এবারের ঈদ কাজের দিনে পড়ে যাওয়াতে বাসায় কিছুই আয়োজন করা সম্ভব হয় নি। বৃহস্পতিবারেই নামাজের জন্য অফিস থেকে অর্ধবেলা অব্দি অব্যাহতি মঞ্জুর করিয়ে নিয়েছিলাম। আজ ঈদ – আজ সেমাই খাইব। আমার কাছে অন্তত সেমাই ছাড়া ঈদ অনুভূত হয় না। তাছাড়া বাংলাদেশ দূতাবাসের হল রুমটাও বেশ বড়। প্রায় দু’শো লোক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন। শুধুমাত্র বাংলাদেশীরাই জড়ো হয় নামাজ আদায়ের জন্য। ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত আরামদায়ক। অপরদিকে অল রাশান এক্সজিবিশন সেন্টারে অনেক বাংলাদেশির ইলেকট্রনিক্স ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কারণে সেখানে বাঙালিদের আনাগোনা একটু বেশি ই লক্ষনীয়। তবে সেখানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং হল রুমটাও তুলনামূলকভাবে ছোট। এখানে জামাতের সকল ব্যবস্থাপনার অগ্রভাগে বাঙালিরা থাকলেও কিরগিজ, উজবেক, তাজিক, তুর্কমেন, ককেশিয়ান মসুলমানসহ আরবদেরও সমাবেশ ঘটে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ আর এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। টেরও পাই নি।

কিরগিজস্তান প্যাভিলিয়ন। সোভিয়েত সময়ে প্রজাতন্ত্রটির ঐতিহ্য এবং বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলো প্রদর্শিত হত। এখন ইলেক্ট্রনিক ও পোশাক মার্কেট। জুমার দিনে এবং দুই ঈদে নামাজের স্থান।

সকাল সোয়া সাতটা নাগাদ টিভি চালু হতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। আরও একটু গড়িয়ে নেবার ইচ্ছে থাকলেও নামাজ ফসকে যাবার শংকায় হাই রিস্কে গেলাম না। তড়াক করে শরীর ঝাকুনি দিয়েই উঠে সোজা চলে গেলাম ব্যালকনে আবহ পরখ করতে। আহা! নিঃশ্বাস টানতেই মন ভরে উঠলো। নিচে রাস্তা পরিবেষ্টিত ছোটমট পার্কের দিকে নজর যেতেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। চোখের ভুল না তো। ভালো করে চোখ কচলিয়ে আবারও তাকালাম। নাহ, ঠিক ই আছে। শ্বেত শুভ্র চাদর বিছানো যেন। কোথাও কোথাও কয়েকটি করে সবুজ ঘাসের উঁকি। বৃক্ষগুলোর দিকে দৃষ্টি যেতেই মনে হলো রূপকথার রুপোর দেশে আছি যেন। ডালপালাগুলো মনে হচ্ছে এক একটা রুপার কাঠি। ঘুমোতে যাবার আগেও গাছগুলোতে কিছু পাতা অবশিষ্ট ছিল। বাহ! চমৎকার!! ভেজা তুষারবর্ষে আবৃত। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। ঈদের সকালে নতুন চমক বা গিফট। দিনটাকে বড় বেশি পবিত্র মনে হতে লাগলো।

পবিত্র ঈদ-উল-আজহার নামাজের জামাতে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লীদের একাংশ।

ব্যালকন থেকে বাথরুমে ফ্রেশ হতে যাবার পথে হ্যান্ড ফোন বেজে উঠলো। দেখি দ্বিতীয় বন্ধুটির কল। রিসিভ করতেই ঈদ মোবারক জানিয়ে বলল, “চলে আসেন কিরগিজ প্যাভিলিয়নে। আমি সাথে করে সেমাই, ফিরনি নিয়ে আসছি। একটু আগেভাগেই রওনা দিচ্ছি। জায়গা রাখব। ধীরে সুস্থে আসেন”। তার সাথে কনফার্ম করার পর প্রায় সাথে সাথেই অপর বন্ধুটিকে জানিয়ে দিলাম সিদ্ধান্তের কথা। একটু মন খারাপ করলো বটে। কী আর করার? তবে তার বাসায় রোববারের দাওয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। তাকে আশ্বস্থ করলাম কোনভাবেই মিস হবে না। তার স্ত্রী বাঙালি কিনা। তাই খাওয়া-দাওয়ার পর্বটি জমে বেশ ভালো। পুরাই আজানের উপর। হা হা হা।

ইমাম সাহেব – বাংলাদেশের বাঙালি মসুলমান। পুরো নামাজ পড়িয়েছেন দেশী স্টাইলে। তাতার জাতি দ্বারা পরিচালিত মসজিদগুলোতেও তাদের ভাষায় নামাজ পড়ানো হয়ে থাকে। ধন্যবাদ ইমাম সাহেব।

ফ্রেশ টেশ হয়ে পরিপাটি জামা কাপড় পড়ে এক কাপ চা পান করে ভাবছি গাড়ি নেব কী নেব না। নাহ, গাড়ির চিন্তা মাথা থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেললাম। কারণ বাসা থেকে ওখানে পৌঁছাতে হলে মীর এভিনিউ ধরে যেতে হবে। মীর এভিনিউর মাঝামাঝি রয়েছে মস্কো সেন্ট্রাল মসজিদ। সেখানকার যানজট পেরোতেই হয়তবা দুপুর গড়িয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম মেট্রোতেই যাওয়ার। অল রাশান এক্সজিবিশন সেন্টারের স্টেশন থেকে শহরে বের হতেই পুরা টাশকি! কই আইলাম!! ভুল স্টেশনে নেমে পরলাম না তো। ডানে তাকিয়ে দেখলাম কসমস হোটেল যথাস্থানে দাঁড়িয়ে। বাঁয়ে তাকালাম। দেখলাম বৃষ্টিস্নাত পরিস্কার রাস্তা। টিপটিপ ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। ভেজা তুষারবর্ষ গলে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে গেছে। এই তাপমাত্রা শূন্য তে। তো কিছুক্ষণ বাদে প্লাসে। হেমন্তকালটা এভাবেই চলবে।

খুৎবা চলাকালীন মসজিদ এবং ইমাম সাহেব ফান্ড সংগ্রহ। সকল মুসুল্লী ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সাধ্যমত।

রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম অল রাশান এক্সজিবিশন সেন্টারের (ভে.দে.এন.খা) প্রধান ফটকের দিকে। আসলে বহুদিন আসা হয় নি এদিকে কী গাড়িতে কী মেট্রোতে। ভেদেনখা মেট্রো স্টেশন থেকে প্রধান ফটকের দিকে যেতে হলে কিছুদিন আগেও হাঁটা পথে বহু চড়াই-উৎরাই যথা প্রচুর অননুমোদিত কিয়স্ক বা কেবিন টাইপ দোকান যেগুলো রাস্তার প্রশস্ততা সংকীর্ণ করে ফেলেছিল, সেগুলো পেরোতে জান যাবার উপক্রম হত। সেই সাথে জনগনের ধাক্কাধাক্কির বোনাস তো আছেই। তাই অত ভোরে নির্জন, প্রশস্ত, পরিস্কার রাস্তা দেখে শনাক্ত করতে পারছিলাম না।

ঈদ কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়।

শেষ অব্দি পৌঁছে গেলাম কিরগিজ প্যাভিলিয়নে। যাওয়ার পথে বহু স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি স্থাপনার ছবি তুললাম। দেখি বন্ধুবর হলের ভেতরে জায়গা রেখে বাইরের বারান্দায় অপেক্ষারত। হ্যান্ডশ্যাক শেষে একে অপরের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। হল রুমের দিকে হাঁটা ধরলাম পবিত্র ঈদ নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে।

অল রাশান এক্সজিবিশন সেন্টারের প্রধান ফটক। ১৩৬ হেক্টর জমির ওপর স্থাপিত ১৯৩৮ সালের ২১ আগস্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলোর প্রদর্শনীর জন্য।

* ঈদ উত্তর প্রানঢালা শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা সবার জন্য