ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

“আমাদের যুদ্ধ আমাদেরই করতে হবে। আমাদের স্বাধীনতা আমাদেরই অর্জন করতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রেই বাংলাদেশ প্রশ্নের সমাধান নিহিত” তাজউদ্দিন আহমেদ।

শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের, গজারি বনের ছায়া ঢাকা, গ্রাম বাংলার অন্যান্য গ্রামের মতোই, ঢাকার অদূরে কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রাম৷ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের মৌলবি ইয়াসিন খান আর মেহেরুন্নেসা খানম দম্পতির এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয় ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই তারিখে৷ পুত্রের নাম রাখা হয়, তাজউদ্দীন আহমদ৷

৪ ভাই, ৬ বোনের মাঝে ৪র্থ তাজউদ্দীন আহমদের পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে, একই সময়ে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হন বাড়ির দুই কিলোমিটার দূরের ভূলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ এম.ই স্কলারশিপ পরীক্ষায় ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান লাভ করেন৷ শুধু তাই নয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায়৷ ১৯৪৪ সালে এই পরীক্ষায় অবিভক্ত বাংলায় দ্বাদশ স্থান লাভ করেন তিনি। ভালো পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল উচ্চ মাধ্যমিকেও৷ ঢাকা বোর্ডে অর্জন করেন ৪র্থ স্থান এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ উচ্চ শিক্ষায় তাঁর বিষয় ছিল অর্থনীতি৷ এমনই মেধা-উজ্জ্বল শিক্ষা জীবনের ধারক ছিলেন এ অনন্য ব্যক্তিত্ব৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে ছিল এদেশীয় রাজনীতির প্রতিফলন৷ এ পরিবেশ তাজউদ্দীন আহমদকে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করে৷ জড়িয়ে যান সক্রিয় রাজনীতিতে৷ তার চিন্তাধারায় দেশপ্রেম ও রাজনীতির মন্ত্র ঢুকেছিল জন্মভূমি কাপাসিয়াতে থাকা অবস্থায়। ওই সময় কাপাসিয়াতেই নির্বাসিত হয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তিন বিপ্লবী রাজেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, বিরেশ্বর বন্দ্যাপাধ্যায় ও মনীন্দ্র শ্রীমানী। তাজউদ্দিন আহমেদ তখন কাপাসিয়া মাইনর স্কুলের ছাত্র। তাঁর প্রখর মেধার পরিচয় পান এই বিপ্লবীরা। তাঁকে ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি ও মনীষীদের জীবনী সম্পর্কে জানতে-পড়তে সাহায্য করেন তাঁরা। তাঁদের কাছ থেকে নিয়ে পড়ে ফেলেন প্রায় ৫০/৬০ খানা বই। বিপ্লবীরা তাঁর চেতনার নির্মাণ করেন শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ ভাবনা। ১৯৪৮ এ প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোক্তাদেরও একজন তিনি। ভাষা আন্দোলনেও তাজউদ্দীন ছিলেন অন্যতম লড়াকু সৈনিক। ১৯৪৮সালের ১১ ও ১৩ মার্চ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট-কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগ দলের কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুসলিম’ শব্দটি থেকে বাদ দেয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ই আওয়ামী লীগে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তাজউদ্দীন আহমদ। ওই বছরই তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাংগঠনিক কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হন এবং জয় লাভ করেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর। ওই নির্বাচনি প্রচারণায় তাঁর জন্য ভোট সংগ্রহ করেছেন জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে (১৯৫৮-১৯৬৯) আওয়ামী লীগের স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এদলের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালে তাকে গ্রেফতার করে আইয়ুব সরকার। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৬৬ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৬ দফা আন্দোলনের কারণে দেশরক্ষা আইনে ১৯৬৬ সালের ৮ মে পুনরায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। জেল থেকে মুক্ত হন ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে শেখ মুজিবের আলোচনায় তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। যিনি মানুষের অধিকার ও দাবির ব্যাপারে ছিলেন অনড়। ইয়াহিয়া খান তাজউদ্দীনকে ভয় করতেন তাঁর সততা ও কঠোরতার কারণে।

নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভের পরও ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করায় শেখ মুজিবরের ডাকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তাজউদ্দীনের ভাষায়, ‘আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো: একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।

প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পালটা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য সরকার তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। তাই তাজউদ্দীন আহমদ আত্মগোপন করেন এবং যুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য সীমান্তের দিকে যাত্রা করেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর কুষ্টিয়া পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের মহকুমা শাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী তাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কেএফ রুস্তামজী তাদের আশ্রয়স্থলে এবং তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং পূর্ববাংলা সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাঙালির স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। সীমান্তে পৌছে তাজউদ্দিন দেখেন যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই। মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যপারে তাজউদ্দীন আহমদ বি,এস,এফ এর সাহায্য চাইলে তৎকালীন বি,এস,এফ প্রধান তাকে বলেন যে মুক্তি সেনা ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সময় সাপেক্ষ কাজ। তিনি আরো বলেন যে ট্রেনিং বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না। কেএফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতন সাথে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে দিল্লি চলে আসার জন্য। উদ্দেশ্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাজউদ্দিন আহমদের বৈঠক। দিল্লিতে যাবার পর ভারত সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং তিনি তাদের বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেসব সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন তা বুঝিয়ে বলেন। এসময় তিনি উপলব্ধি করেন যে আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে তিনি যদি সাক্ষাৎ করেন তবে সামান্য সহানুভূতি ও সমবেদনা ছাড়া তেমন কিছু আশা করা যায় না। সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐ সরকারের দৃঢ় সমর্থন ছাড়া বিশ্বের কোন দেশই বাংলাদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে না। এছাড়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের আগের দিন এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চান যে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোন সরকার গঠিত হয়েছে কিনা। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে নিজেকে তুলে ধরবেন। কারণ এতে ‘পূর্ব বাংলার জনগনের সংগ্রাম কে সাহায্য করার জন্য ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তা কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে বলে তাজউদ্দিনের ধারণা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দিন জানান যে পাকিস্তানী আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ২৫/২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব -ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সহকর্মীই মন্ত্রীসভার সদস্য। মুজিবের গ্রেফতার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় সমাবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লির উক্ত সভায় তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন। ঐ বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারণার সূচনা। ৪ঠা এপ্রিল দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। ১০ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ ঘোষনা করা হয়।

১১ এপ্রিল তাজউদ্দীন বেতারে ভাষণ দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তাজউদ্দীন আহমদ হন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। অস্থায়ী সরকার ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত কলকাতা থেকে কার্য পরিচালনা করে। তাজউদ্দীন আহমদ দৃঢ়তা ও নিষ্ঠার সাথে এতে নেতৃত্ব দেন।

১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের পর তাজউদ্দিন আহমেদ ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে ভারতের উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু ভারতের সীমান্তে পৌছে, তিনি বিনা প্রটোকলে ভারতে প্রবেশ করেন নাই। তিনি ঐ সময়, বলেন একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্য দেশে তিনি কোন প্রটোকল ও আমন্ত্রন ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন না। এটার করলেও তার দেশের জন্য অসম্মানজনক। অতঃপর ওপারের ভারতীয় বাহিনী তাকে গার্ড অফ অর্নার দিয়ে ভারতে নিয়ে যায়।

শত বাধা বিপত্তির মাঝে তিনি প্রবাসী সরকার চালিয়ে যেতে থাকেন৷ তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী৷ তাই যুদ্ধের সাংগঠনিক পরিকল্পনাও করতে হচ্ছিল তাঁকে৷ যুদ্ধকালীন ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা৷ মুক্তিবাহিনীকে, সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন তিনি৷ মূলত তাঁর সুনিপুণ দক্ষতার গুণেই যুদ্ধ সঠিক পথে এগোতে থাকে৷ যুদ্ধের সময় দলের অভ্যন্তর থেকে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন৷ কিন্তু তিনি দক্ষতার সাথে সেসব মোকাবেলাও করেছেন৷ যুদ্ধকালীন গঠিত সরকারের মাঝেই ছিল বিভিন্ন বিরোধের ভূত৷ তিনি সবকিছুকে বিবেচনা করতেন তাঁর নিরীক্ষার দক্ষতা দিয়ে৷ বুকে ছিল তাঁর সত্যের সাহস আর মনে ছিল নেতার প্রতি অবিচল আস্থা৷ দূরদর্শিতা ছিল তাঁর অসামান্য৷ পকিস্তানিরা একটি সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী৷ তাদের সাথে লড়াই করার জন্য দরকার মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, গোলা-বারুদ৷ এসব কিছুর ব্যবস্থা করাও সহজ ছিল না৷ কিন্তু তিনি সবকিছু মোকাবিলা করেছেন দক্ষতার সাথে৷ বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সমন্বয় সাধন এবং নতুন জন্ম নেয়া বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তত্‍পরতাও চালিয়ে যান তাজউদ্দীন৷ যুদ্ধ চলাকালীন মুজিব নগর সরকারের কতিপয় ষড়যন্ত্রী নেতা পাকিস্তানের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু তা কঠোর হস্তে দমন করা হয়৷

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের বিজয় পাখির৷ এবার সম্মিলিতভাবে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন৷ এদিকে সুবিধাভোগী, দূর্নীতিপরায়ণ, চাটুকার রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের নির্লজ্জ তত্‍পরতা বেড়েই চলে৷ শেখ মুজিবের সাথে তাজউদ্দীন আহমদের দূরত্ব বাড়তে থাকে৷ তাঁদের মাঝে নীতিগত বিরোধ দেখা দেয়৷ তাঁদের সুন্দর সম্পর্কে ফাটল ধরে৷ এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন তাজউদ্দীন আহমদ৷ একাত্তরের রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতা মন্ত্রীসভা থেকে বিদায় নিলেন স্বাধীনতা লাভের মাত্র ২ বছর ১০ মাসের মাথায়৷

সারাদেশে রাজনৈতিক তত্‍পরতায় ব্যস্ত আবার নানা বিষয়ে মুজিবকে সচেতন করতেন তিনি। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষে তিনি জানতে পারেন যে, সেনাবাহিনীর মাঝে একটি গ্রুপ রয়েছে যারা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি চরম অসন্তুষ্ট৷ তারা তাঁকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে৷ ঐ রাতেই শেখ মুজিবকে নিজে গিয়ে সচেতন করেন তাজউদ্দীন৷ তাঁর আশঙ্ক্ষাকে সত্য করে দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়৷ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সবাই তাজউদ্দীন আহমদকে আত্মগোপনে যাবার জন্য বলতে থাকেন দেশের নেতারা। কিন্তু তিনি আত্মগোপন করতে অস্বীকৃতি জানান। ১৫ আগস্ট প্রথম গৃহবন্দী ও পরে ২২ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। কারাঅন্তরীণ হলেন আরো ৩ জন জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান।

জেলখানায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাত। থমথমে অবস্থা। চার জাতীয় নেতাকে একত্রিত করা হয় একই সেলে। বাইরে নিথর থকথকে অন্ধকার। হঠাত্‍ খুলে যায় কারাগারের মূল ফটক। চত্বরে প্রবেশ করে কালো পোশাকধারীর নেতৃত্বে অস্ত্রধারী ৪ জন সৈন্য।
বেজে ওঠে পাগলা ঘন্টা।
বেজে ওঠে ডিআইজি প্রিজনের টেলিফোন।
টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে এক দাম্ভিক দানবীয় কন্ঠস্বর।
– ‘Let them do whatever they want.’
এবার পরিচয়ের পালা।
ইনি…
থমকে যায় বক্তা।
পরিচিতির প্রথম শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে গর্জে ওঠে ঘাতকের হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। ৬০ রাউন্ড গুলির পর সব কিছু স্তব্ধ।
সুনশান।
নীরব।
মৃত্যুই শুধু যেন নীরবতাকে ধারণ করার স্পর্ধা রাখে। ওরা চেয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে দিতে। ওরা পারেনি। বুলেট স্ববাক কন্ঠকে রুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু কন্ঠের বাণীকে নয়। খুনিরা পেরেছিল তাঁদেরকে হত্যা করতে, কিন্তু তাঁদের আদর্শকে নয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গতিপথকে বিপরীত দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ঘটানো হয়েছিল ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের নৃশংস হত্যাকান্ডগুলো যা তখনকার ও তৎপরবর্তী শাসকচক্রের আচরণে তা খুবই স্পষ্ট। শুধু যে আইন করে হত্যাকান্ডগুলোর বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয় তা-ই নয়, হত্যাকারীদের বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশে নিরাপদ অবস্থানের ব্যবস্থা করে, কাউকে কাউকে মর্যাদাপূর্ণ চাকরি দিয়েও পুরস্কৃত করে পরবর্তী সরকারগুলো। এ চিহ্নিত অপশক্তিই হত্যার বিচারের রায় বাস্তবায়নে বারবার বাধার সৃষ্টি করেছে, জেলহত্যার বিচারকে বিলম্বিত করেছে।

জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার দায় অবশ্যই রাষ্ট্রের। আমরা আশা করি নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের এই রূপকারদের নৃশংস হত্যাকান্ডের সুবিচার হবে, এসব হত্যাকান্ডের ঘাতক, নেপথ্য ষড়যন্ত্রী কেউই এর দায় এড়াতে পারবে না। জেল হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকারী-ঘাতকদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত জাতি কিছুতেই এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে না। বিচারের সে বাণী আজও নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে!

স্বপ্ন দেখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত বাংলাদেশের। কী আমরা করতে চেয়েছিলাম, কী আমরা করেছি, তা যদি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়, তবে কী করতে পারি নি, তা জানতে বাকি থাকে না। আর তার সঙ্গে যদি যোগ করি, ৪২ বছর পরে নতুন কী করণীয়, তাহলে তালিকা হয়তো দীর্ঘ হবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে স্থির। জনগণ ব্যর্থ হয় নি – বারবার মূল্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করে তারা তার প্রমান দিয়েছে। তাই আজ প্রয়োজন আছে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম হোক আজকের দিনের শপথ।

রেফারেন্স: বাংলাপিডিয়া, তিন নভেম্বর জেলের পাগলা ঘন্টা – এ্যাড. মোখলেসুর রহমান, মূলধারা ‘৭১ – মঈদুল হাসান