ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

গত শতকের সত্তরের দশকের গোঁড়ায় মার্কিন সিআইএর প্রত্যক্ষ মদদ ও সহযোগিতায় পৃথিবীর দুই প্রান্তে দুই রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল | একটি চিলিতে এবং অন্যটি বাংলাদেশে | চিলিতে অভ্যুত্থান ঘটানো হয় ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর | দেশটির নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করা হয়েছিল | তবে সেনাজান্তার নরপশু ঘাতকরা আলেন্দের স্ত্রী ও কন্যাকে হত্যা করা থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল |

বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাঁদের কাছে এক অনন্য নাম সালভাদর আলেন্দে | তিনি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে চিলির প্রথম সমাজবাদী, মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট, যিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন | ১৯৭০ সালে তিনি সমাজতন্ত্রী, সাম্যবাদী ও দলছুট খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটদের এক কোয়ালিশনের নেতা হিসেবে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খুব অল্প ব্যবধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন | সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত হবার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে এক বেতার ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি নিশ্চিত আমার এই আত্মত্যাগ বিফলে যাবেনা” |

কিন্তু কেন আমেরিকা আলেন্দের পেছেন লেগেছিল ? এর উত্তর দুটি | প্রথমত, নাকের ডগায় অবস্থিত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আরেকটি কমিউনিস্ট দেশের আবির্ভাব ঠেকানো | কারণ তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধ চলছিল |

দ্বিতীয়ত, চিলিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা | কারণ সমাজবাদে বিশ্বাসী আলেন্দে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি সব তামার খনি এবং বিদেশিদের (বিশেষ করে মার্কিন) মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করে জাতীয়করণ করেন | উল্লেখ্য, এই তামা শিল্প হলো চিলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত | আর এতে বিনিয়োগ ছিল মার্কিন দুটি কোম্পানির | যাদের হাতে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা খনির নিয়ন্ত্রণ | ফলে স্বাভাবিকভাবেই আলেন্দের সিদ্ধান্তে বড় ধরণের ক্ষতি হয়েছিল মার্কিন কোম্পানিগুলোর | সিআইএ’র প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নির্বাচনে যেন আলেন্দে জিততে না পারে সেজন্য মার্কিন একটি কোম্পানি সিআইএ’র মাধ্যমে আলেন্দের বিরোধী পক্ষকে সাত লক্ষ ডলার দিয়েছিল | এছাড়া আলেন্দের পরাজয় নিশ্চিত করতে ঐ কোম্পানিটি সিআইএ’কে আরও ১০ লক্ষ ডলার দিতে চেয়েছিল |

আলেন্দে ও কাস্ট্রো

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জোটনিরপেক্ষ সন্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিয়েছিলেন | আমন্ত্রিত অনেক বিশ্ব নেতাদের মাঝে ছিলেন সালভাদর আলেন্দে, ফিদেল কাস্ট্রো প্রমূখেরা | সেখানে ফিদেল বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ” মুজিব, সম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি অনুসরণের জন্য বুকে, পিঠে বুলেট বরাদ্দ হয়ে গেল | তাই সাবধানে থাকবেন ” | ঐ সময়কালে আলেন্দে ও বঙ্গবন্ধুর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতির সাদৃশ্যতার কারণে উভয়ই তাঁদের সাক্ষাৎ আশা করেছিলেন | ঠিক ঐ সময়ে পিনচটের উস্কানিতে চিলিতে ডানপন্থীদের বিশৃঙ্খলা চলছিল | নিজের দেশকে এই দুরবস্থায় রেখে তিনি সন্মেলনে যোগ দিতে পারেননি | আর তাই তাঁদের মধ্যে কুশল বিনিময়ও অসমাপ্ত রয়ে গেল | তবে তিনি বঙ্গবন্ধুকে চিঠি মারফত জানিয়ে ছিলেন ” পরবর্তীতে কোন এক সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসবেন ” | কিন্তু না, তা আর হয়নি | তাঁদের উভয়ই কেউই আজ বেচে নেই |

এর প্রায় দুই বছর পরই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটানো হয় আরও রক্তাক্ত ও ভয়াবহ সামরিক অভ্যুত্থান | এ দেশের সেনাজান্তার ঘাতকরা শুধু দেশের স্বাধীনতার স্থপতি এবং রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার স্ত্রী, পুত্র, নববিবাহিত পুত্রবধূদের ও পরিবারের অন্য সদস্যসহ দশ বছরের এবং ছয় বছরের দুই ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি | চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর নায়ক ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান পিনোচেট | আলেন্দেকে হত্যার পরপরই তিনি ক্ষমতা দখল করেন | অন্যদিকে বাংলাদেশে আগস্ট অভ্যুত্থানের অন্যতম নেপথ্য নায়ক ছিলেন তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান | তিনি কিছুকাল খুনি মোশতাক, সায়েম প্রমুখ শিখণ্ডীদের রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সুযোগ দিয়ে পরে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন |

আলেন্দে ও বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জেনারেল জিয়া যে জড়িত ছিলেন এই অভিযোগও এখন সরব হচ্ছে এবং তার আমলে কর্নেল তাহেরকে হত্যা যে অবৈধ হত্যাকাণ্ড, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সে রায়ও দিয়েছেন | বাংলাদেশে এখন অনেকেরই দাবি, কর্নেল তাহেরের মতো জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ আরও অনেকের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং তার প্রকৃত হোতা অথবা হোতাদের সম্পর্কেও তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত | চিলিতে আলেন্দে, নেরুদার মৃত্যুর ৩৮ বছর পর যদি সে সম্পর্কে তদন্ত হতে পারে এবং প্রয়াত জেনারেলের মরণোত্তর বিচার ও শাস্তির দাবি উঠতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে একটি নয়, অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের হোতা বলে অভিযুক্ত প্রয়াত জেনারেলের অপরাধ সম্পর্কে তদন্ত ও মরণোত্তর বিচার হতে পারবে না কেন ? বরং জাতীয় ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্যই আমাদের উচিত চিলির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা |

***আমার লেখাটির কিছু অংশ জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ” পাপ বাপকেও রেহাই দেয় না ” এর নিবন্ধ থেকে নেয়া |