ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশই সবচেয়ে ব্যক্তিগত, প্রকৃতির এবং একজন শক্তিমান প্রগতিশীল আধুনিক কবি। কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নের বামনকাঠি গ্রামের দাশ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সত্যানন্দ দাশ। মা কুসুম কুমারী দাশ ছিলেন একজন কবি এবং তাঁর বাড়িও রাজাপুরের পিংড়ি গ্রামে। স্কুল ও কলেজ জীবন বরিশালে অতিবাহিত করায় কবি শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের কিছু সময় পৈত্রিক ভিটা ও জন্মস্থান বামনকাঠির দাশবাড়ি ও তৎসংলগ্ন মাসিমা হেমন্ত কুমারী সেনের বাড়িতে অতিবাহিত করেছেন।

তাঁর কবিকৃতি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। বিংশ শতাব্দীতে মানবতার বিপন্ন ছবি তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত। বর্ণনার সুস্পষ্টতায়, বাচনভঙ্গির শ্রেষ্ঠত্বে এবং শব্দচয়নের নৈপুণ্যে তিনি স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট কবি। তার প্রথমদিকের কবিতা বিষাদে আপ্লুত। শব্দ, ধ্বনি, পরিবেশ উপযোগী রূপকল্প ইত্যাদিতে ধূসর নিঃসঙ্গতার ব্যঞ্জনা তাঁর কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর ইতিহাসচেতনা সুগভীর। অতীত ও বর্তমানকে তিনি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সূত্রে গেঁথে নিয়েছিলেন। কবিতাকে তিনি গদ্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তার এই প্রভাব পরবর্তীকালের কবিদের ওপর পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছিলেন, তার কাব্য ‘চিত্ররূপময়’।

কবি তাঁর পিতা মাতার সঙ্গে ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে মাতুলালয়ে বহুবার বেড়াতে এসে মুগ্ধ হয়েছেন এবং পরে কোন এক সময়ে তিনি ‘ধান্যশ্রী’ কে ধানসিঁড়ি নাম দিয়ে কবিতা লিখেন- আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়।

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে-ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেচাঁ ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপসা ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা রায় — রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে –

কবি তাঁর জন্ম স্থানের ধানসিঁড়ির পাড়েই শঙ্খচিল বা শালিকের বেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। হয়ত ফিরে আসতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয়ভূমিতে । সেই ফেরা হয়েছিল কিনা জানা যায় নি। যে ধানসিঁড়ি নিয়ে কবিতা লিখে খ্যাতিম্যান হয়েছিলেন, ধানসিঁড়িকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছিলেন, ধানসিঁড়ির রূপে পরিচিতি দিয়েছিলেন বাংলার অসীম রূপ, সেই ধানসিঁড়ি নদী আজ বিপন্নপ্রায়। শুধু তাই নয় রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের আজীবন স্মৃতি বিজড়িত ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বামনকাঠি গ্রামের নিজ জন্মভূমি, পৈত্রিক বাড়ি আজ নিখোঁজ অবস্থায় জঙ্গলাকীর্ণ ও বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে পরিণত হয়েছে। তার অতি প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার ধানসিঁড়ি নদীটি আজ সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে ধু-ধু মাঠে পরিণত হয়েছে।

এক সময়ের খরস্রোতা ধানসিঁড়ি নদীর অস্তিত্ব যা এখন খাল হিসেবেই পরিগণিত।

বড় নিষ্ঠুর জীবন ছিলো তাঁর। বাইরের দিকে শুকনো। এমনকি, কখনও লাঞ্ছনারও। দারিদ্র্যেরও। চার পাঁচশো টাকার জন্য আকুল চিঠি লিখেছেন সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে : ‘দয়া করে ব্যবস্খা করুন।’ বলেছেন : ‘লেখা দিয়ে সব টাকা শোধ করে দেব। না হয় ক্যাশে।’ কেননা, চাকরি আর বাসস্খান দুই-ই ছিল অনিশ্চিত। শুধু নিশ্চিত ছিল লেখা কেননা আবহমান তাঁর সঙ্গে থাকত। যদিও আবহমানই একদিন তার পা টেনে নেয় ট্রামের লাইনে, তবু তার আগে তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় সেই সব কবিতা, যা, মেরু সমুদ্রের মতো, বাইরে কঠিন, ভিতরে অতল, তুষার-ধূসর কখনওবা।