ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আরও একটি মুক্তিযুদ্ধ চাই । জন্ম আমার ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২,তাই- আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি নয়,ইতিহাস। এ ইতিহাসে একটি পটভূমি আছে,আছে পরিপ্রেক্ষিত। ইতিহাসকে নৈর্ব্যক্তিক ভাবে বিশ্লেষণ না করলে- পক্ষ নেয়ার দোষে দুষ্ট হওয়া হয়। ১৯৪৭ স্বাধীন হওয়া একটি রাষ্ট্র, ২৩ বছরের মধ্যে আবার কেন স্বাধীন হতে চাইলো- এ প্রসঙ্গ এসে যায় প্রথমে। সামাজিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ঐ জন গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক আবস্থা বিশ্লেষণ করতে হয়। ৭১ সাল পূর্ব বাংলাদেশকে আমার কিরূপে দেখি? চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য,উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য,বৈষম্য আর বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে এতো প্রান্তিকতায় পৌছে দিয়েছিলো- জনগনের আর সহ্যের সীমায় থাকলো না । সাথে যোগ হলো রাজনৈতিক আকাঙ্খা। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী জনগোষ্ঠীর শাসক হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ, যা আগে বাঙালী পুর্বে কখনো পায়নি। বাঙালী জন গোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালী চিরকাল শাসিত ছিলো। শাসক ছিলো না। তার সাথে যোগ হয়েছে ভৌগলিক দূরত্ব,ভাষার পার্থক্য এবং শাসক শ্রেণীর অগণতান্ত্রিক মানসিকতা।যারা রাজনীতি করতেন তাদের মধ্যে শাসক হওয়ার আকাঙ্খা। আর জনগনের মাঝে পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ থেকে মুক্তির স্বপ্ন। আর এ স্বপ্নকে তাড়িত করেছে জাতীয়তাবাদী চেতনা-যার মাঝে ছিল একটি ভূখন্ড। একটি পতাকা,বিশ্বের মাঝে আলাদা একটি জাতি হিসেবে পরিচিতির স্বপ্ন ছিল। লাখো শহীদের আত্মদান,অগুনিত নারীর সম্ভ্রমহানি, বাংলার মানুষের সহায় সম্পদের ধ্বংস ও লুঠ,পারিবারিক বিপর্যয়,জীবন ও যৌবনের ক্ষয়, শারীরিক এ মান সিক প্রতিবন্ধিত্ব আর হাজার্ও গজবের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি- সবুজ পতাকায় রক্তলাল খচিত এ স্বাধীনতা। স্বাধীন ভূখন্ড পেলাম,পতাকা পেলাম,শাস নের অধিকার পেলাম,কিন্তু পেলাম না জাতীয়তাবাদী চেতনা, পেলাম না পতাকার মর্যাদা,পেলাম না সুশাসন। যে যায় লংকায় সে হয় রাবন। ক্ষমতায় যে যায় সে হয়ে যায় শোষক। ভুলে যায় জনগনের সাথে প্রতিশ্রুতি, ভুলে যায় ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়। তাই বাংলার জনগনকে চিরকাল রাস্তায় লড়াই করতে হচ্ছে। এই নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছে আর এক টি প্রজন্ম। তার সাংস্কৃতিক অবস্থা আর্ও করুণ। পাকিস্তানি জনুন কিংবা ভারতের শাহরুখ খানের জন্য এ প্রজন্ম আর্মি স্টেডিয়ামের চার পাশে শ্রাদ্ধ করে মুড়িমুড়কির মত টাকার । কোলা আর মোজোর কেনের খালী কৌটার জন্য হাটা যায় না কয়েক দিন। অথচ আমার দেশের শিল্পীরা যথার্থ ভাবে উপস্থাপিত হ্য় না এদের কাছে।এ প্রজন্ম বাংলার চাইতে হিন্দি পারে বেশী। আমার দেশের শিল্পীরা অন্ন ও চিকিৎসা অভাবে ধুঁকে ধুঁকে দিন যায়। কই আমাদের ৭১ এর বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা? আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের আত্ম পরিচয়। এ প্রজন্মের কাছে বাঙালীর আত্মগৌরবকে ধারণ করা শিল্প-সাহিত্য মর্যাদা পায় না। ডিজুজ প্রজন্ম নামে তারা পরিচিত হচ্ছে আমার আপনার সবার কাছে।তারা পড়ে না,তারা শুধু দেখে,শুধু দেখে না- গিলে রিরিংসায়, তারা ভোগে বিশ্বাসী- চেতনাকে মনে করে ফালতু জিনিষ। এই বোধহীন, চেতনাহীন,আত্ম পরিচয়হীন নব প্রজন্মের জন্য আর ও একটি মুক্তিযুদ্ধ প্রয়োজন। ছোট্টবেলা থেকে মায়ের কাছে ছোট চাচ্চু’র গল্প শুনতাম। ১৬ বছরের সেই তরুণ- নৌ কমান্ডার আবু মুছা চৌধুরী’র। ফ্রগ বাহিনীতে ছিলেন। যিনি বেল গ্রেডে গিয়ে মার্শাল টিটুর কাছ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেচে যাওয়া মাইন এনেছিলেন। আমাদের বাড়িতে গোপন কুঠুরিতে রেখেছিলেন ক’দিন। মার দূর ভাবনা। কখন না ফুটে। তা একদিন রাতের আধারে পাশের কবর স্থানে কবর খুরে রাখার ব্যাবস্থা হয়ে ছিলো। চাচ্চু মাকে বলে গিয়ে ছিলেন রাশিয়া চলে যাচ্ছেন। আশলে সে সময় তার অপারেশন ছিলো জীবন মরনের। পায়ে পাখা বেধে-সমুদ্রে ডুব দিয়ে মাইন বসিয়ে দিয়ে আসা সোয়াত জাহাজে। কারণ জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ছিলো পাকিস্তান বাহিনীর-বাঙালিকে নিধনের জন্য। সে জাহাজ মাইন দিয়ে ধ্বংস করার দায়িত্ব। মৃত্যুকে কবুল করে যাওয়া। ঠিকই চাচ্চু তার জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাইন বসিয়ে এসেছিলেন সোয়াত জাহাজে। কিন্তু একটি মাইন নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট আগেই ব্লাস্ট হ্ওয়াতে-চাচ্চু তীরে ওঠার আগেই তার কিছু আঘাত চাচ্চুকে সইতে হয়। বারুদের রাসায়নিক ক্রিয়ায় আজও তিনি মারাত্মক ক্যান্সারে ভুগছেন। তবুও গর্বের তিনি এ মাটির মুক্তির সৈনিক-মুক্তিযোদ্ধা। আমি মুক্তি যুদ্ধ দেখিনি- মুক্তি যুদ্ধের গৌ্রবে গৌরবান্বিত হতে চাই। এই বোধহীন, চেতনাহীন,আত্ম পরিচয়হীন নব প্রজন্মের মুক্তির জন্য। মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই-সেই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের।