ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

স্বাধীনতার ৪০ বছর ও দীর্ঘ দশ বছর স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনের ফসল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থা। দুটি প্রধান দল-আওয়ামীলীগ ও বিএনপির ৪ বার শাসন আমল সচেতন নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে আমরা কি আসলে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আছি না দলীয় রাজতন্তের মাঝে বাস করছি?কারণ যে দলই ক্ষমতায় আসুক তাদের আচরণ সব সময় গণতান্ত্রিক ভাবাপন্ন হয়নি। বরং জাতীয় সম্পদের হরিলুট,স্থানীয়করণ,বিরোধী মতকে দলন,নাগরিক ভব্যতা কে মারিয়ে নির্লজ্জভাবে জাতীয় নেতাদের রক্তাক্ত করা সব সরকারের নিয়মিত এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতি আজ চলে গেছে গুন্ডা-পান্ডাদের হাতে। আশি দশকের পর যারা বুর্জোয়া রাজনীতিতে এসেছে তারা ক’জন ছাত্রজীবনে ফাস্ট বেঞ্চার তা আজ গবেষণার বিষয়। আর বাংলাদেশে সামাজিক অবস্থা কি?তাহলে সাম্প্রতিক গবেষণার দিকে তাকাই।

সম্প্রতি বাঙালির অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ড.আলি আকবর খান মন্তব্য করেছেন- বাংলাদেশে গ্রাম সমূহ নৃতাত্ত্বিক ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তা ‘উন্মুক্ত গ্রাম (open village).। প্রতিতুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গ্রাম সমূহ ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ(corporate)। আর প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাম একই সাথে প্রশাসনিক,অর্থনৈতিক,সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে উন্মুক্ত গ্রাম শুধু সামাজিক সংযোগ ঘটে ,কিন্তু প্রসাশনিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব থাকে অত্যন্ত সীমিত।আর এ গ্রামীণ সংগঠনের দুর্বলতার ফলে প্রাচীন কাল থেকে বাঙালি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী হয়ে গড়ে ওঠে। আর তাই আবহমান কাল থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জী্বনকে সমৃদ্ধ করলেও তার রাজনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এখনে মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসের সংকট আছে।আস্থার অভাব আছে। আর তাকে সামাজিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা যায়-বাংলাদেশে সামাজিক পূঁজির নিদারুণ ঘাটতি আছে। আর এ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডি পুটনাম বলেন-‘ সামাজিক পূজিঁ হচ্ছে পারস্পরিক আস্থার প্রথাসিদ্ধ আচরণের ও সামাজিক সম্পর্কজালের মত।সামাজিক সংগঠনের বিশেষত্ব হলো যা সমন্বিত কার্যকলাপ সহজ করে সামাজিক কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও বাংলাদেশের মানুষের পারস্পরিক আস্থা কম । ১৯৯৯-২০০১ সালের সময়কালের এক জরি্পে দেখা গেছে বাংলাদেশে মাত্র ২৩.৫ % শতাংশ মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস করে।আর বাকি ৭৬.৫% মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস করে না বা আস্থা নেই। ৮০ দেশের সমীক্ষায় ফ্রান্স শুধু আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে।তাদের মাত্র ২২.২ শতাংশ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে।
তাহলে অনু সিদ্ধান্তে আসা যায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-ও রাজনৈতিক সংকটের একমাত্র কারণ আস্থার সংকট।

৯২-৯৫ এর বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ-জামায়াতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন তাই জন গ্রাহ্যতা পেয়েছিলো। আমাদের রাজনীতিতে এটি স্থিতি অবস্থান এনে দিয়েছিলো। যতি আন্দোলন হোক মানুষ ধরে নিতো সরকার পরিবর্তন হবে ৫ বছর পর।কিন্তু জনগনের এ আস্থার জায়গাটা নষ্ট করে দিল ক্ষমতাসীনরা। ২০০৬ সালে বিএনপি এবার ২০১১ তে আওয়ামীলীগ।

কিন্তু কেনো?বিএনপি ও আওয়ামীলীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি কে দলীয় করনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চাইলো। বিএনপি বিচারপতি হাসান কে দিয়ে , আওয়ামীলীগ বিচারপতি খাইরুল কে দিয়ে। কিন্তু বিধি বাম-বিচারপতি খাইরুল বিরোধী আন্দোলন হওয়ার আগেই ফেঁসে গেলেন।ক্ষমতাসীন দল থেকে ১০ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা ত্রাণ হিসেবে গ্রহণ করায় -নৈতিক ভাবে তিনি তার গ্রহণ গ্রহণযোগ্যতা হারালেন।

আদালত আরও ১২বছর এ পদ্ধতি থাকার পক্ষে মতামত দিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেনো সমস্ত জনমতকে উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করলেন?শুধু কি বিচারপতি খাইরুল ইস্যু থেকে বাঁচার জন্যে? না ডালমে কুচ কালা হ্যা?

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এই ক্ষমতাসীনদের আচরনের উপর নির্ভরশীল। জনগণের আস্থার জায়গাটি ফিরিয়ে আতে হবে। কুটকৌশল ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার চেষ্টা না হয়ে, জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা না হবে, ততদিন স্থিতিশীল গণতন্ত্র আসবে না।

রাজনৈতিক দলগুলো কি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল?প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ তার সাক্ষ্য দেয় না। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণতন্ত্র,যাওয়ার পর ফ্যাসিবাদী আচরণ ১৭ বছরের বঙ্গদেশীয় গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা আমাদের হতাশ করে।

তাই গণতন্ত্রের সাংগঠনিক কাঠামোগুলোর আস্থার পরিবেশ আনতে হবে।কারণ দলীয় সরকারের সময় সমস্ত নিয়োগ দলের ছোয়া থাকে-যা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশকে বারবার ব্যাহত করছে। পি এস সি, নির্বাচন কমিশন,বিচারপতি নিয়োগ, দুদক্ সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যতক্ষণ দলীয় প্রভাব বলয় মুক্ত হবে না ,ততক্ষণ বাংলাদেশে গণতন্ত্র আশা করা সোনার পাথর বাটি মাত্র।জোট ও দলীয় আন্দোলনের মাধ্যমে যা হবে তা ক্ষমতায় যাওয়া আসার প্রক্রিয়া মাত্র। তা কখ্নও গণতান্ত্রিক পরিবেশ আনবে না, আনবে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে দলতন্ত্র বা পুলিশ তন্ত্র বা নিষ্ঠুর ব্যাক্তি তন্ত্র। যা বাংলাদেশে আমরা চর্চা হতে দেখছি।

গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রত্যেককে আজ যে যার অবস্থান থেকে গণতন্ত্রের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে কাজ করতে হবে। তা না হলে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লরেন্স জিরিং এর মতঃ Bangladesh is a Country Challenged by Contradiction-বাংলাদেশ স্ববিরোধিতায় জর্জরিত একটি দেশ’ তা আরও একবার প্রমানিত হবে।