ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

একটা জিনিস লক্ষ করার মতো। কেউ যদি এমন কিছু করে বা বলে, যা বর্তমান সরকার এবং সরকারি দল আওয়ামীলীগের বিপক্ষে গেল বা পছন্দনীয় হলোনা, তা যত সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক হোকনা কেন,তাহলেই আর যায় কোথায় ! অমনি এই সরকার এবং আওয়ামীলীগের কিছু অতিউৎসাহি অন্ধ ভক্ত বা আওয়ামী নামধারী একদল লোক,সেই সব মানুষদের উপর বলতে গেলে একরকম ঝাঁপাইয়া পড়ে। তারা যত বড় মাপের ও সন্মানের মানূষই হোকনা কেন,এমন কি যত বড় আওয়ামী লীগার/বঙ্গবন্ধু ভক্ত/ চিরজীবন আওয়ামী ঘরানার ইত্যাদি যাই হোন না কেন,তাদের চৌদ্দগুষ্টি ধরে টানাটানি শুরু করে হেনস্থা করে ছাড়ে।মাঝে মাঝে কেউ কেউ সেই মানূষগুলি সমন্ধে এমন সব কটুক্তি বা নিম্নরুচির অশালীন ও অশোভন মন্তব্য করে যে,ভাবতে কষ্ট হয় আওয়ামীলীগের মত এমন একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এমনতর অধঃপতন হল কি করে !!

ডঃ কামাল হোসেন একজন বড় মাপের জাতীয় ব্যক্তিত্বই শুধু নন,চিরজীবনের একজন আওয়ামী লীগারও। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর গায়ের গন্ধ পাওয়া যাবে এমন যে কয়জন বড় মাপের মানূষ এখনো আমাদের মাঝে জীবিত আছেন,তিনি তাদের মধ্যেও অন্যতম শীর্ষ একজন।এই কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন আওয়ামীলীগের একজন শীর্ষ নীতি নির্ধারক। নানান কারনে এখন ভিন্নদল হলেও,এখনো বলতে গেলে তিনি মনে প্রানে আওয়ামী ঘরানারই মানূষ। অথচ এই মানুষটির গায়ে ও কালিমা লেপনের কত প্রচেষ্টা শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগের !! “৭১ এ তিনি কিছুই করেন নাই,৭৫ এ পালিয়ে গেছেন, কাউয়ার কা কা,জন বিচ্ছিন্ন,কোটি-কোটি টাকা কিভাবে কামাই করেছেন-তার ট্যাক্স দিয়েছেন কি না দেখে নেয়ে হবে” তাকে অবমানিত করার ইত্যাদি কত কথা এবং কতকিছু। স্বয়ং দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা একটু কিছু বললে তার চাটুকার ভক্তরা এব্যাপারে থাকেন কয়েক কাঠি এগিয়ে।প্রশ্ন জাগে যারা এসব বলছেন বা এসব বলাতে খুশি হচ্ছেন,তারা কি করছেন ৭১ এ? কি করেছেন ৭৫ এ ?

কাদের সিদ্দিকীর মতো অতি বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধাসহ এবং নিকট অতীতের শীর্ষস্থানীয় অনেক আওয়ামী লীগারদের কে নিয়েও শেখ হাসিনা এবং তার অতি উৎসাহি ভক্তদের একই অবস্থান।সর্ব জনাব ব্যারিষ্টার রফিক,আকবর আলী খান, প্রবীন সাংবাদিক এ বি এম মূসা প্রমুখ,একসময়ে আওয়ামী ঘরানার এই সন্মানীয় মানূষ গুলি,এখন আর আওয়ামীলীগের না হলেও,আওয়ামীলীগের শত্রু এমন কিন্তু বলা যাবেনা।একই কথা প্রযোজ্য টি ভি ‘র টক শো গুলিতে যারা কথা বলেন এবং পত্রিকার পাতায় যারা লিখেন,তাদের অনেকের বেলাতেও।তারা যা বলেন বা লিখেন তা তারা দেশ ও দেশের মানূষের মঙ্গল চিন্তা থেকেই করেন। তাদের এই বলা বা লেখার সবই সঠিক,এমন হয়তো নয় এবং এর সাথে ভিন্নমত ও থাকতেই পারে।তাই বলে কারো মত ও পছন্দের সাথে গরমিল হলেই তাদেরকে যাচ্ছেতাই ভাবে অবমানা করা,তাদের প্রতি অশালীন মন্তব্য ও কটুক্তির দ্বারা তাদের গায়ে কালিমা লাগানোর অপচেষ্টা একধরনের নিন্মমানের অর্বাচীনতা।

দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ডঃ ইউনূস, সারা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র নায়ক ও মানুষের কাছে যার সন্মান আকাশ স্পর্শী,এতো বড় মাপের এই মানূষটিকে নিয়ে ও,আওয়ামীলীগের অতিউৎসাহী মহল এমনকি স্বয়ং দলীয় প্রধানের চরম আপত্তিকর বক্তব্য-মন্তব্য এবং ভূমিকা শুধু অবাক করার মতোই নয় চরম অশোভনীয়ও । পাশের দেশের নোবেল বিজয়ীর প্রতি আমাদের প্রধান মন্ত্রীর,যথাযথ সন্মান ও শ্রদ্ধা পোষনের কোন কমতি নাই,খুবই ভাল কথা। কিন্তু নিজ দেশের নোবেল বিজয়ীর প্রতি তার যত অবজ্ঞা-অবমাননা এমনকি হিংসা-বিদ্বেষ ও। যা দেশী-বিদেশী সচেতন সকল মহলের কাছেই একটি নিন্দনীয় ব্যাপার।
অতি সম্প্রতি একই আচরন শুরু হয়েছে প্রবীণ সাংবাদিক জনাব মূসাকে নিয়েও।“ ৭১ এ তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিলেন,ছিলেন পাকিস্তানের এজেন্ট,গোপনে পাকিস্তানি সি আই এ’এর কাছে গোপন খবর-তথ্য পাচারকারী ইত্যাদি ইত্যাদি”। জনাব মূসাকে নিয়ে এই কাদা ছিটানো বা বয়ান এর সঠিকতায় যাওয়ার দরকার নাই,শুধু এইটুকু বলা যেতে পারে যে,এমন একজন মানুষকে স্বাধীনতার পরের সরকার এমনকি বঙ্গবন্ধু ও চিনতে পারেন নাই।যার জন্য তাকে সেই সরকার এবং বঙ্গবন্ধু নিজের দলের সংসদ সদস্য বানিয়েছিলেন,রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন,আরো অনেক বড় বড় দায়িত্ব ও দিয়েছিলেন। মনে হয় স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার, দল এবং স্বয়ং বঙ্গবন্ধু ছিলেন বোকা বা এখনকার এই বয়ান কারীদের চেয়ে কম আওয়ামীলীগের। অবাক হওয়ার বিষয় যে মানূষ বা মানুষ গুলো এই সেদিন পর্যন্ত ও ছিলেন সারা জীবনের আওয়ামী লীগার বা একজন কঠিন আওয়ামী পক্ষ, কোন কারনে গরমিল হলেই তার কত বদনাম কত কলংক। থুতু উপরের দিকে ছিটালে যে তা নিজের গা কেই কলুষিত করে,উল্লেখিত আওয়ামী ভক্তরা এই কথাটাও যেন বেমালুম ভুলে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছেন।

অবাক করার বিষয় কাদের সিদ্দিকীর মতো শ্রেষ্ঠতম বীর মুক্তিযোদ্ধা (আমার বিবেচনায় সেক্টর কমান্ডারদের চেয়েও উপরের সারির মুক্তিযোদ্ধা) এবং ৭৫ এর অনন্য সাধারন সাহসী একজন বীরের গায়ে ও এরা পরিয়ে দিতে চান রাজাকারের লেবাস। এদের বেসামাল অবস্থা দেখে মনে হয়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চার নেতা সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দিন আহমেদ-মনসুর আলী-কামরুজ্জামান, এমনকি বঙ্গবন্ধু জাতির জনক শেখমুজিব ও যদি জীবিত থাকতেন এবং কোমর সোজা করে তাদের মত ও পছন্দ বিরোধী কোন কথা বলতেন বা কোন কাজ করতেন,তাহলে আওয়ামীলীগের এই অতিউৎসাহী মহল জাতীয় চার নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর গায়ে ও “স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী,পাকিস্তানের এজেন্ট,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাঞ্চালের ষড়যন্ত্র কারী ইত্যাদি এমনকি রাজাকারের কালিমা লাগিয়ে দিতেও পিছ পা হতেন না।

প্রশ্ন জাগে এভাবে আওয়ামীলীগ যদি সকলকেই তাদের শত্রু মনে করেন বা জোর করে শত্রু বানিয়ে ফেলেন বা জোর করে শত্রুর দলে ঠেলে দেন,তাহলে তাদের (আঃ লীগের) বন্ধু কারা ?
অতিউৎসাহী এবং এই আওয়ামী ভক্তদের মনে রাখা দরকার,যে সমস্ত স্বনামখ্যাত জাতীয় ব্যক্তিত্ব,সুশীল সমাজ এবং কথক-লেখকদের তারা এভাবে হেনস্থা করে প্রতিপক্ষের কাতারে ঠেলে দিচ্ছেন,দেশের মানুষের কাছে সন্মানিত এই মানুষগুলো কোন দিন ভোটে হয়ত দাঁড়াবেন আর দাঁড়ালেও জিততে পারবেননা ( যে কথা মাননীয় প্রধান মন্ত্রীও তাদের উদ্দেশ্য করে হরহামেশাই বলে থাকেন) একথা সত্য,(কেননা আমাদের চলমান বিতর্কিত রাজনীতিতে ভোটের হিসাব ভিন্ন এবং বিতর্কিত এক ব্যাপার।আর ভোটে না জিততে পারার রেকর্ড কিন্তু স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ও আছে। ৯১’এ ঢাকায় দুই আসনে এবং ৯৬ এ রংপুরে এক আসনে তিনিও তুলনামূলক অনেক অখ্যাত প্রার্থীদের সাথে তিনিও জিততে পারেননি)। কিন্তু ভোটে না জিততে পারলেও,তাদের অনেককেই এদেশের মানুষ যথাযথ সন্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে,তাদের কথা গুরুত্বসহকারে শুনে,মূল্যায়ন করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষমতার বাইরে তাদের অনেককেই,অনেক নেতা-নেত্রীর চেয়ে অনেক উচ্চমানের মনে করে এবং অনেক উচ্চাসনে স্থান দেয়।