ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

উল্লেখিত শিরোনামে, জনাব আসিফ নজরুলের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে আজকের(০৮-৭-১১) প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় কলামে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ডঃ আসিফ নজরুল একজন খ্যাতিমান টক শো তারকা এবং কলামিস্ট।বিভিন্ন মাধ্যমে সৎ সাহসী এবং বলিষ্ঠ কণ্ঠের জন্য ডঃ আসিফ নজরুল একটি সুবিদিত ও জনপ্রিয় নাম।

উল্লেখিত লেখায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন,তা প্রশ্নাতীত ভাবে সঠিক। দুই সামরিক শাসকের অবৈধ সংশোধনী বাতিল করে মাননীয় উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে,সংবিধান সংশোধনী নিয়ে তেমন কোন প্রশ্নই উঠতো না,দেশের সিংহ ভাগ মানুষের সমর্থন ইহাতে থাকতো।কিন্ত তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে,এমন একটি জন সমর্থনযোগ্য প্রক্রিয়ার সাথে,তত্ত্ববধায়ক সরকার গেলো।সরকারের উচিত ছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গটি নিয়ে,আলাদা ভাবে আরো সময় নিয়ে অগ্রসর হওয়া।যথার্থই বলেছেন জনাব আসিফ নজরুল।

কিন্ত পুরো-“পঞ্চদশ সংশোধনী:অগণতান্ত্রিক এবং বিপজ্জনক”-এ টা কেমন কথা?ডঃ আসিফ নজরুলের মতো একজন যদি পাইকারি হারে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকে “অগণতান্ত্রিক এবং বিপজ্জনক”বলে মন্তব্য করেন,তাহলে একটু খটকা লাগে বৈ কি!

পঞ্চদশ সংশোধনীতে,জাতীয় মৌলিক কতগুলি বিষয়ের রক্ষাকবচ হিসাবে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে,যেগুলিকে জনাব আসিফ নজরুল ‘চিন্তাচেতনায় সামন্তবাদী,বাকশালীয় চেতনায় একদলীয়, অগনতান্ত্রিক এবং বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

কিন্ত ভূলে গেলে চলবে না,আমাদের স্বাধীনতা,মুক্তিযুদ্ধ,আমাদের পতাকা,জাতীয় সঙ্গীত,জাতির পিতা,বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবস,২/৩/৭ মার্চ,স্বাধীনতার ঘোষনা,১০/১৭ এপ্রিল এমনকি জয় বাংলা শ্লোগান,এগুলি তো আমাদের জাতীয় মৌলিক বিষয়,আমাদের স্বাধীনতার মাইলফলক।এগুলি নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নাই।তবুও স্বাধীনতা বিরোধীদের সুগভীর চক্রান্তে এবং নানান ধরনের হীন বিদ্বেষে আমাদের এসব জাতীয় মৌলিক বিষয় এবং মাইলফলক গুলি নিয়ে অনেক নোংরামি হয়েছে ,অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করা হয়েছে। এগুলি কে মুছে দেয়ার সুগভীর অপ-পরিকল্পনায়,এগুলির সমান্তরালে “জিন্দাবাদ,প্রথম বাংলাদেশ-মরন বাংলাদেশ”ইত্যাদি নানান শ্লোগান সহ ভূয়া জন্মদিন,জেল মুক্তি দিবস,পলাশি দিবস ইত্যাদি নানান দিবসের অবতারণা করা হয়েছে।এখন ভবিষ্যতেও আমাদের জাতীয় মৌলিক বিষয় এবং মাইলফলক গুলি নিয়ে আর যেন কোনদিন কেউ কোন ছিনিমিনি খেলতে বা কোন নোংরামি না করতে পারে,এজন্য সাংবিধানিক ভাবে এগুলির রক্ষাকবচ অবশ্যই দরকার।যে জাতিকে আইন করে তার জাতির পিতার সন্মান রক্ষা করতে হয়,সে জাতির মৌলিক অনেক কিছুকে প্রটেক্ট করার জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দরকার।এখানে আমাদের ভিন্নমত,গণতান্ত্রিকতা,অধিকার,আধিপত্যবাদ ইত্যাদি প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

আর চতুর্থ সংশোধনী এবং বাকশাল নিয়ে জনাব নজরুল তার তীব্র প্রতিক্রিয়ায়,বাকশালকে “গণতন্ত্রের কবর,একদলীয় আধিপত্য ইত্যাদি সেই বাজার চলতি অভিধায় আখ্যায়িত করেছেন। তবে কেন এবং কোন অবস্থায় সেই চতুর্থ সংশোধনী এবং বাকশাল ধারনার সূচনা হয়েছিলো,সেদিকে এই ডঃ আসিফ নজরুলরা একবার ও তাকাতে চাননা।মনে করতে চাননা তাদের চিত্রিত বাকশালের পরও,আরো ৪/৫ বৎসর এ দেশ শাসিত হয়েছে,“বাকশালের বাবা জংলী শাসন” সামরিক শাসনে।

যা হোক সেই বাকশাল নিয়ে জনাব আসিফ নজরুলদের তরে কিছু কথা বলছিঃ- বাকশাল তথা চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্ক থাকতে পারে এবং আছেও।কিন্ত ভূলে গেলে চলবে না, তা (৪র্থ সংশোধনী) হয়েছিলো, জনগনের নির্বাচিত বৈধ সংসদে-জনগনের নির্বাচিত সাংসদদের দ্বারা, সম্পূর্ন সাংবিধানিক বিধি-বিধান মতে- স্বাধীনতা উত্তর জাতির সেই ক্রান্তিকালে, তখনকার সকল দল,মত ও পেশার মানূষের ঐক্যমত এবং সমন্বয়ে।

পরবর্তিতে সুযোগে এবং খোলামাঠে ‘একদলীয়’ বলে বহুল কথিত,প্রচারিত এবং চিত্রিত সেই ‘বাকশাল পদ্ধতি’ সেই অর্থে একদলীয় কোনো কিছু ছিলো না- ছিলো , তখনকার সময়ের দাবিতে, সকল দল ও মতের সমন্বয়ে একটি সাময়িক মোর্চা বা প্লাটফরম।

যার প্রতি একমত পোষন করে ও সমর্থন জানিয়ে, সেই প্লাটফরমে যোগদান করেছিলেন তখনকার বরেন্য রাজনীতিক সর্বজনাব মজলুম জননেতা মাওলানা ভাষানী, আতাউর রহমান খান, মনি সিংহ ,অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ প্রমূখ এবং তাদের দল,বলা যায়, তখনকার প্রায় সকল রাজনৈতিক দল। সদল বলে যোগদান করেছিলেন তখনকার সাংবাদিক সমাজ সহ(তখন জনাব আসিফ নজরুল কোথায় ছিলেন জানিনা),সকল শ্রেনী-পেশার মানূষেরাও। এমনকি পরবর্তিতে বিএনপির জন্মদাতা এবং তখনকার সেনা উপ-প্রধান মেঃজেঃজিয়াউর রহমান ও প্রণীত সেই ব্যবস্থার উচ্ছসিত প্রশংসা করে, ইহাতে তার নাম ও লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন।বাকশালের উচ্ছসিত প্রশংসা করে তখনকার উপ-সেনাপ্রধান জেঃ জিয়ার স্বাক্ষরিত চিঠি অনেকের লেখা বই এ লিপিবদ্ধ আছে।বিভিন্ন সময়ে অনেক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে।
প্রণীত সেই ব্যবস্থার বিরোধীতা এবং সমালোচনাও ছিলো।তখনকার অনেক আওয়ামীলীগ দলীয় সাংসদ (জেঃ ওসমানী,ব্যারিষ্টার মইনূল হোসেন,নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমূখ) সহ, ভিবিন্ন শ্রেনী-পেশার আরো অনেকেই, ইহার বিরোধীতা করেছেন,সমালোচনা করেছেন এবং ইহাতে যোগদান করা থেকে বিরতও থেকেছেন।যা স্বাভাবিক এবং সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রীতি-নীতিরই পরিচায়ক।

সুতরাং জনাব আসিফ নজরুলের কথা ধার করেই বলা যায় যে,তখনকার প্রায় সকল দল ও মতের রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এবং সাংবিধানিক বিধি-বিধান মতে প্রতিষ্ঠিত বাকশাল ব্যবস্থাকে একদলীয়-অগনতান্ত্রিক বলার অবকাশ কোথায়?