ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পত্রিকার খবরে জানা গেল,সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দৌজা তনয়,মাহী বি চৌধুরী ‘ব্লু ব্যান্ড কল(বিবিসি)’ নামে ফেসবুকে সংগঠিত তরুনদের নতুন একটি সংগঠনের জন্ম দিয়েছেন। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের উদ্দেশেো যার মূল বক্তব্য হলো-সংঘাতের রাজনীতি বন্ধে ‘হয় সমঝোতা,নয় অবসর’। নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্ত আবার সেই জিয়াউর রহমান বিতর্ক! জিয়াউর রহমানকে তার মাপের বাইরে নিয়ে,আর এক শেখ মুজিব বানানোর বা অনেক কে ডিঙ্গিয়ে শেখ মুজিবের সমান্তরালে,অন্তত শেখমুজিবের পাশে বসানোর সেই পুরানো প্রচেষ্টা। যা কিনা আমাদের সংঘাতময় রাজনীতির অন্যতম প্রধান কারন। আমাদের স্বনামখ্যাত একদল মানূষ আছেন,যারা তাদের তথাকথিত নিরপেক্ষতা জাহির করতে,ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন ও বলেন। তারা যখনই শেখ মুজিবের কথা বলেন বা নাম উচ্চারন করেন,তখন সাথে সাথেই জিয়াউর রহমানের কথা বা নামটিও টেনে আনবেন। বঙ্গবন্ধুর মাযার জিয়ারতে গেলে জোরা ধরে জিয়ার মাজার ও জিয়ারত করেন। কেউ কারো নাম নিবেন বা মাজার জিয়ারত করবেন,তা দোষের কিছু নয় । কিন্ত প্রস্ন আসে তখনই,যখন একই কাতারের আর সব প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের,সব প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপ্রতিদের বাদ দিয়ে,কেবলমাত্র এক জিয়াকে টেনে আনা হয়,বঙ্গবন্ধুর সাথে জোরা ধরে-পাল্টাপাল্টি হিসাবে,তথাকথিত নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য রক্ষার্থে। জনাব মাহী বি চৌধুরী ‘ব্লু ব্যান্ড কল’ ও মনে হয় জিয়াউর রহমান বিতর্কের সেই পুরানো গোলকধাঁধার আবর্তের মধ্যেই রয়ে গেলো।
না,জনাব মাহী বি চৌধুরী,বঙ্গবন্ধুর পাশে জিয়াউর রহমানের ছবি টাঙ্গানো বে আইনি কোন কিছু নয়। যার যার ঘরের ভিতর যে কেউ বঙ্গবন্ধুর পাশে,তার তার দলীয় প্রধান,জিয়া-এরশাদ,হাসিনা-খালেদা সহ পছন্দের যে কারো ছবি অবশ্যই টানাতে পারেন,আপনার-আমার ছবিও আমরা টানাতে পারি। এটা যার যার ব্যাক্তিগত রুচি ও অধিকার। তবে তা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা বাইরে জনমমনে প্রচারে,প্রভাব বিস্তারে বা কোন উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে করা হয়,তাহলেতো স্বতসিদ্ধতা,যৌক্তিকতা,বিবেচনাবোধ এবং মানান-বেমানানের একটা প্রস্ন আসতেই পারে।

জনাব মাহী বি চৌধুরী,আপনার বিবিসি’র মঞ্চে বিরাট ব্যানারে ছবিগুলোর ক্রমানুসারটা ছিলো – প্রথমে বঙ্গবন্ধু এবং এর পরেই জিয়াউর রহমান। তারপর একে একে ভাষানী-তজউদ্দিন-ওসমানীর ছবি । প্রস্ন হলো কিভাবে,কোন মাপকাঠিতে, কোন বিবেচনায় ও বিচারে,ভাষানী-তজউদ্দিন-ওসমানী কে ডিঙ্গিয়ে, জিয়ার নাম ও ছবিটি বঙ্গবন্ধুর পাশে স্থান পেলো ? জিয়া কি ভাষানী-তজউদ্দিন-ওসমানী প্রমূখদের উপরে স্থান পাওয়ার মতো কেউ? এখানে আসল উদ্দেশ্য জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে জিয়াকে প্রতিষ্টা দেয়া। ভাষানী-তজউদ্দিন-ওসমানীকে টেনে আনা হয়েছে কেবল,বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি এবং সমান্তরালে জিয়াকে হালাল এবং দাঁড় করানোর একটা কৌশল বা খুটি হিসাবে। তথা কথিত নিরপেক্ষতার একটা প্রলেপ হিসাবে। ইতিপূর্বে আরো অনেকেই,অনেক মহল বিশেষই,একই কৌশলে,একই তৎপরতায় একই ভ্রান্ত পথে হেঁটেছেন এবং হাঁটছেন। যা প্রকারান্তরে আমাদের রাজনীতিতে সংঘাত-সহিংসতাকে আরো বেগবান করতে ইন্দন যোগিয়েছে।

জনাব মাহী চৌধুরী চলুন,কে এবং কি ছিলেন আমাদের এই জিয়াউর রহমান ? ৭১’এর ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত এক সেনা কর্মকর্তা। ২৫ মার্চ কালো রাত্রের পর বিদ্রোহ করে,হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে,ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে যাওয়া বাঙালি জাতির মুক্তির যুদ্ধে, মুক্তিপাগল সংগ্রামী বাঙ্গালি-জনতার সাথে যোগ দেয়া এক বাঙালি মেজর। উল্লেখ্য তার আগেই,নিজেদের অধীনস্থ বাহিনী নিয়ে বিদ্রোহ করে বাঙ্গালি-জনতার সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝপাইয়া পড়েন,জয়দেবপুরে মেজর শফিউল্লাহ,চট্টগ্রামে মেজর রফিক-ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী গং,কুমিল্লায় মেজর খালেদ মোশাররফ, কুষ্টিয়ায় মেজর আবু উসমান,রংপুরে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ সহ সারা দেশব্যাপী অসংখ্য বাঙালি সেনা,বিডিআর,পুলিশ,আনসার বাহিনীর সদস্যরা। বিদ্রোহ করার পর মেজর জিয়ার অবস্থান,তখনকার কালুরঘাট বেতারের কাছাকাছি হওয়ায়,২৭-মার্চ সন্ধায় একজন সেনা কর্মকর্তা হিসাবে তিনি ছিলেন,বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বেতারে আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম এক ঘোষনা প্রচারক বা পাঠক।(তার আগেই একই বেতারে একই ঘোষনা প্রচার করে আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান সহ আরো কয়েকজন।অজ্ঞাত কারনে যাদের কথা খুব একটা বলা হয়না)। এর পর মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম এক সেক্টর কমান্ডার ও জেড-ফোর্সের প্রধান।

স্বাধীনতার পর বীরোত্তম খেতাব প্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধা এবং উপ-সেনাপ্রধান। ৭৫’এর মর্মান্তিকতার পর সেনাপ্রধান। ৭৫’এর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ক্যান্টনম্যান্টের ভিতরে ক্ষমতার লড়াইএ হত্যা-পাল্টা হত্যা,ক্যু-পাল্টা ক্যু এবং জয়-পরাজয়ের এক পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আবির্ভাব। এর পর উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক,সেনাপ্রধান কাম-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কাম-স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি,হ্যাঁ-না ভোটের প্রহশন এবং আইয়ূব খান স্টাইলে রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা কুক্ষিগতকরনের ষোলকলা পুর্নকরন। অতঃপর দুনিয়ার তাবৎ সামরিক শাসকদের ফর্মূলায় রাজনৈতিক নেতা হওয়ার মতলবে,রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থের ছত্রছায়ায়,রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যাবহারে রাজনৈতিক দল গঠন এবং সে দলের হয়ে,সেনা প্রধান কাম-সামরিক শাসক কাম-রাষ্ট্রপতির পদে থেকে,সামরিক আইনের অধীনে কথিত পাতানো নির্বাচনে, নির্বাচিত রাষ্টপতি। এর পর ৩০ মে’৮১ তে ক্ষমতার কামড়াকামড়িতেই আর একদল সেনাসদস্যদের হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত।

এই তো জিয়াউর রহমান। যা কোন মনগড়া বা তৈরী করা কোন কিছু নয়। ইহাই জিয়াউর রহমানের ইতিহাস। সুতরাং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জিয়াউর রহমানের কাতার হলো,শফিউল্লাহ-খালেদ মোশাররফদের কাতার। আর ৭৫’পরবর্তিতে একজন সামরিক শাসক কাম-রাষ্ট্রপতি কাম-উর্দি রাজনীতিক হিসাবে জিয়াউর রহমানের কাতার হলো,আইয়ূব-ইয়াহিয়া-এরশাদের কাতার।একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ৭৫ পূর্ব জিয়াউর রহমান যেমন নন্দিত, অবৈধ ভাবে ক্ষমতা দখলকারী সেনাশাসক হিসাবে ৭৫ পরবর্তি জিয়াউর রহমান ঠিক তেমনি নিন্দিত। জিয়া কোনদিন কোন রাজনীতিক নেতা ছিলেননা।রাজনীতিক নেতা হওয়ার কোন সুযোগ তিনি পাননি। উর্দি ছেড়ে জনতার কাতারের রাজনীতিক হওয়ার শুরুতেই তিনি হন নির্মম হত্যার শিকার। সুতরাং কোন রাজনীতিকের কাতার তার কাতার নয়, বঙ্গবন্ধুর সাথেতো প্রস্নই আসেনা।

অনেকেই তাকে (জিয়াকে) বলেন ‘জাতীয় নেতা’। যদি ধরেও নেয়া হয় তিনি জাতীয় নেতা,তাহলেও প্রস্ন-তিনি কি ভাষানী-তজউদ্দিন-সৈয়দ নজরুল-মনসুর আলী-কামরুজ্জামান গং দের চেয়েও বড় মাপের জাতীয় নেতা ? যদি বিবেচনায় আসে মুক্তিযোদ্ধার প্রসঙ্গ,তাহলে প্রস্ন,মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেঃ ওসমানী,সেনাপ্রধান জেঃ আঃ রব এবং উপ-সেনাপ্রধান এ কে খন্দকার,প্রমূখদের আগে বা বাদ দিয়ে একজন সেক্টর কমান্ডার জিয়ার নাম/ছবি স্থান পায় কি করে ? আর একই কাতারের অন্যান্য সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম/ছবি বাদ থাকে কোন বিচারে ? যদি বলা হয় জিয়া ছিলেন একজন সামরিক শাসক এবং রাষ্ট্রপতি,তাহলে একই সারির খন্দকার মোশতাক,বিচারপতি সায়েম,বিচারপতি সাত্তার এবং জেঃ এরশাদকেই বা বাদ দেয়া হয় কেন ?

জনাব মাহী বি চৌধুরী,এই প্রস্নগুলির ঐতিহাসিকতা আমাদের স্বিকার করতেই হবে। ৭৫’পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে আর এক ‘শেখ মুজিব’ বানানোর অপচেষ্টায়,একজন সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে তার মাপের বাইরে টানাটানি করে অনেক কিছু করা হয়েছে,যেখানেই বঙ্গবন্ধুর নাম-বঙ্গবন্ধুর ছবি,সেখানেই একই আদলে একই পরিসরে,জিয়ার নাম-জিয়ার ছবি টেনে আনা হয়েছে। এতে করে এই অপচেষ্টাকারীদের সাময়িক কিছু স্বার্থসিদ্ধি হয়তো হয়েছে,কিন্ত একটা বিব্রতকর বিতর্কের মধ্যে টেনে এনে,ক্ষতি করা হয়েছে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের। আমাদের একদল লোক অগন্তান্ত্রিক শাসন ,অবৈধ সামরিক শাসন ও শাসকদের সমালোচনা করতে গিয়ে,আইয়ূব খান থেকে ইয়াহিয়া খানে এসেই একটা লাফ দেন এবং এক লাফে এরশাদে চলে যান। মাঝখানে একটা নাম তাদের উচ্চারনে আসেনা। তাদের কাছে দুনিয়ার সব সামরিক শাসক খারাপ,কেবল একজন বাদে। এরশাদ কে স্বৈরাচার বলতে তাদের মূখে ফেনা উঠে যায়।প্রস্ন জাগে শিষ্য এরশাদ স্বৈরাচার হলে গুরু তা নয় কোন যুক্তিতে ? এরশাদের ব্যাক্তিগত কিছু অপগুনের কথা বাদ দিলে, গুরু-শিষ্যের মধ্যে তফাৎটা কোথায়?

যদি ধরেও নেয়া যায় যে,শেনা শাসক হলেও জিয়া ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। সে বিচারে শিষ্য এরশাদের সফলতাও কিন্ত একেবারে কম কিছু নয়। আর কালের চক্রে আরো কত সফল নেতার এবং সফল রাষ্টনায়কের আবির্ভাব হবে,তাই বলে সবাই কে আর এক ‘শেখ মুজিব’ বা ‘শেখ মুজিবের সমান্তরাল কিছু একটা হতে হবে কেন? ‘ভারতের মহাত্না গান্ধী,পাকিস্তানের কায়েদে আযম,দক্ষিন আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা’-কই তাদের পাশে বা সমান্তরালে আর কারো ছবি বা নাম নিয়ে টানা টানির মতো অর্বাচীনতাতো দেখা যায়না। সে সব দেশে কি আমাদের জিয়াউর রহমানের মতো কেউ নাই?
জনাব মাহী বি চৌধুরী,আপনি আমাদের তরুন্যের একজন সম্ভাবনাময়ী প্রতিনীধি। চলুন আমরা বাস্তবতাকে ধারন করি। হীন বিদ্বেষ এবং আত্নপ্রবঞ্চনাকে পরিহার করি। বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে তার অবস্থানে,তার সীমার মধ্যে রাখি।আমাদের রাজনীতির চলমান সংঘাত-সহিংসতা,হিংসা-প্রতিহিংসা অনেকাংশেই কমে আসবে। ইহাই হোক আপনার ফেসবুক সংগঠন- ‘ব্লু ব্যান্ড কল’ এর মূল প্রতিপাদ্য।