ক্যাটেগরিঃ কৃষি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

১৯৯৬ সালের ১৭ এপ্রিল ব্রাজিলের এল ডোরাডো ডি কারাজাসে ঘটেছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় নিরস্ত্র নারী, শিশু, সন্তান সম্ভবা জননী, কিষাণ-কিষাণীকে। নিহত হন ১৯ জন, গুরুতর আহত ৬৯ জন ।

প্রথম শহীদ এমানসিও ডোস সানাতোস সিলভা।

ব্রাজিলে কৃষকরা, ভূমিহীনরা দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই করছেন জমির জন্য। সেখানে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী পড়ে আছে।

ব্রাজিলের সংবিধানে উল্লেখ আছে যে, জমি দীর্ঘকাল অনাবাদী রাখা যাবে না, জমিকে উৎপাদনমূলক কাজে লাগাতে হবে। সে দেশে জমির মালিকানার ক্ষেত্রে রয়েছে বিশাল বৈষম্য।

একদিকে, হাজার হাজার মানুষের জমি নেই, জীবিকা অর্জনের উপায় নেই, থাকার জায়গাটুকু নেই।

আরেক দিকে অল্প কিছু লোকের হাতে বিপুল পরিমাণ জমি। সে জমির বেশির ভাগ তারা ফেলে রেখেছে, কোনো কাজে লাগায় না। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জমি । কোথাও কোথাও যতদূর চোখ যায় একজনেরই জমি।

জমির দাম বাড়তে থাকবে, জমি নিয়ে ফটকাবাজি করা যাবে, মুনাফা হবে অনেক, এ মতলবে জমি ধরে রেখেছে এই মালিকরা। অথচ, লাখ লাখ মানুষ ভুখা। জমিতে আবাদ করতে পারলে তাদের খাবার জুটতো, তাদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখতে পারতো, একটু জমি পেলে তারা মাথা খোঁজার ঠাঁই পেত।

গরীব-ভূমিহীনরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেছেন দেশের আইন অনুসারে জমিকে উৎপাদনমূলক কাজে লাগিয়ে নিজেরা একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য। জমি কাজে লাগালে দেশের অর্থনীতির লাভ।

১৯৯৬ সালের ১৭ এপ্রিল এলডোরাডো ডি কারাজাসে সমবেত কৃষকরা দু’বছরের বেশি কাল আগে জমি থেকে উচ্ছেদ হয়। এর পরে থেকে তারা অনাবাদী, পড়ো জমিতে আশ্রয় গড়ার ও আবাদ করার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু, তাদেরকে তেমন কোনো সুযোগই দেয়া হয় না।

এমনই নিরুপায় অবস্থায় কৃষকরা সিদ্ধান্ত নেয় , নিজেদের দাবিগুলো জানাতে তারা রাজধানীতে যাবেন। এদের সংখ্যা পরিবার-পরিজনসহ প্রায় দেড় হাজার। এরা সবাই ভূমিহীন কৃষক আন্দোলনের (এমএসটি) সদস্য।

কৃষকরা রাজধানীতে যাত্রাপথে এলডোরাডো ডি কারাজাস নামের জায়গায় একটি মহাসড়কের ধারে থামেন। কারণ, সঙ্গে থাকা সন্তান সম্ভবা জননী ও শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এদের বিশ্রাম দরকার ছিল।

বিকেল ৪টা নাগাদ ৬৮ জন সামরিক পুলিশ সেখানে আসে। বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ উল্টো দিক থেকে সেখানে আসে ৮৭ জন পুলিশ। এভাবে দু’দিক থেকে আসা দু’দল পুলিশের মাঝে আটকে যান বিশ্রামরত কৃষক, নারী, শিশু। পুলিশরা প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। এর পরেই মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায় কৃষকদের দেহ লক্ষ্য করে।

প্রথমেই মারা যান এমানসিও। তিনি সাথীদের কাছে পরিচিত ছিলেন সারাডো-ম্যাডো নামে। শব্দটির অর্থ বোবা-কালা। তিনি কানে শুনতে পেতেন না। বধীর হওয়ার কারণে ঘটনা বুঝতে অন্যদের চেয়ে তার বেশি সময় লাগে।

ব্রাজিলে এ দিনে মোট হত্যা করা হয়েছিল ১৯ জন কৃষককে। তারা ছিলেন সে দেশের ভূমিহীনদের আন্দোলনের সাথে জড়িত। জমি আর মর্যাদার জন্য তারা লড়াই করছিলেন। তারা সমবেত হয়েছিলেন লড়াইতে। আজো দেশে দেশে সে সংগ্রাম চলছে।

সেদিনের চেতনায় ১৭ এপ্রিলকে আন্তর্জাতিক কৃষক সংগ্রাম দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য দিবসটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ এপ্রিল মহান মুজিবনগর দিবস। প্রথমেই আমরা সেই দিবসটিকে স্মরণ করবো একইসঙ্গে যে গণমানুষের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীন দেশ আমরা পেয়েছি তাদের স্মৃতির প্রতিও বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

কৃষক শহীদদের স্মরণ করে, গরিব-ভূমিহীন কৃষকদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার শপথ উচ্চারণ করে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অষ্ট্রেলিয়ায় হাজার হাজার মানুষ এ দিবসটি পালন করেন। পালিত হয় ৭০টির বেশি দেশে, শত শত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সংগঠন এ দিবসটি নানাভাবে পালন করে। নিজস্ব সাংগঠনিক সামর্থ্য, ধরণ, কর্মসূচি অনুসারে তা উদযাপিত হয়।

তুরস্কে তা বিগত দিনে পালিত হয়েছে ইউকেল সেরেফের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে। তুরস্কে কৃষক আন্দোলনের সংগঠক সেরেফ ২০০৭ সালের ১৭ এপ্রিল মারা যান।

কৃষকদের বেঁচে থাকার, সুস্থ-সুন্দর স্বচ্ছল জীবন যাপনের জন্য, মর্যাদা আর সম্মানের জন্য, সংগ্রামী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক কৃষক সংগ্রাম দিবস পালনের তাগিদ তীব্র হয়ে উঠেছে।

***
তথ্য সূত্র: International Day Of Peasant’s Struggle By Farooque Chowdhury
ছবি সূত্র: MST Warns About New Peasant Massacre in Para
***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট