ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

নেত্রকোণার বারহাট্টা থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে কাশতলা গ্রাম। কবি নির্মলেন্দু গুণের জন্ম স্থান। অস্তিত্বের লড়াইয়ে প্রায় বিলীন এক আদি-জনগোষ্ঠীর বসবাস এই গ্রামে।

চলন বলন বাঙালিত্বের। তারপরও আদি জনগোষ্ঠী। অনেকের কাছেই তারা “লামা গারো” বলে পরিচিত।

তবে নিজেদের মতে তারা ‘হদি’ সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই নামের শেষে শিং বা ত্রিয় উপাধি ব্যবহার করে। নিচু জাত বলে অপবাদ থেকে রক্ষা পেতে ১৯২১ সালের আদম শুমারিতে নিজেদের ত্রিয় জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে হদিরা জামালপুরের মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে আবেদন করেছিল। ম্যাজিস্ট্রেট আই এন ব্যানার্জি ১০ মার্চ ১৯২১ সালে হদিদেরকে ত্রিয় হিসেবে আদম শুমারিতে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেন।

‘আদিপুরুষরা যোদ্ধা ছিলো। ঝগড়া-বিবাদে তারা আড়াই হাত লম্বা লাঠি ব্যবহার করতো। জোতদার প্রভাবশালীরা তাদের ভাড়াটে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করত। তারা ছিল খুবই শক্তিশালী ও সাহসী।’ রামকৃষ্ণ ত্রিয় (৮৫), কিষ্ট চরণ শিং (৭৫), দীন বন্ধু শিং (৫৫) মতো বয়োবৃদ্ধা হদিদের বয়ান।

হদি সম্প্রদায়ের লোকদের গায়ের রং ফর্সা, নাক মাঝারি চেপ্টা। হিন্দু ও অন্য গোত্রের সাথে সামাজিক বন্ধন প্রচলিত হওয়ায় এদের শারিরিক গড়নে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।

হদিদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম হলো বাঁশ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্র বিক্রি। বাঁশের তৈরি কুলা, পাইলা, ধাড়ি, চালুন, ডুলি, কাঁটা, খুচি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীর আসবাবপত্র তারা প্রতিদিন তৈরি করে। তাছাড়া তারা বাঁশের তৈরি ঘোড়াও তৈরি করে বিক্রি করে।

কাশতলা ও পার্শ্ববর্তী সাধুহাটী , ডেমুরা গ্রাম মিলে হদি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার বসবাস করে। মোট হদি প্রায় ৪শ জন। কিছু আছে অস্থায়ী, যারা আত্মীয়তা সূত্রে এখানে এসেছে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় চার-পাঁচ হাজার হদি বসবাস করে।

গারো, হাজং, কোচসহ গারো পাহাড় অঞ্চলে বসবাসরত নৃ-গোষ্ঠীর চেহারার সাথে হদিদের দৈহিক গঠন ও চেহারায় মিল আছে। গারো ও হাজংদের মতো হদিদেরও চুল সোজা, গোল মাথা, নাক মাঝারি চেপ্টা।

নৃ-বিজ্ঞানী বিরজা শংকর গুহের মতে, ‘সবচেয়ে নিচু স্তরের হিন্দু বর্ণ দ্বারা গঠিত অধিবাসী উপাজাতি বাগদী এবং হাদি (হদি)। এতে তারা সুস্পষ্টভাবে আদি অষ্ট্রেলিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় ককেশীয় থেকে উদ্ভূত।’ আবার অনেক নৃ-তাত্ত্বিক হদিদেরকে মঙ্গোলিয়ান নরসমাজের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

উত্তর পূর্ব সীমান্তের চীন-মঙ্গোলিয় বংশের উপজাতীয় গোষ্ঠী যারা আসাম থেকে এসে বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল, হদি সম্প্রদায় তাদের একটি। তাদের ভাষা বোরো (কাচারী) ভাষা গ্রুপের অর্ন্তগত ছিল বলে অনেক নৃ-বিজ্ঞানী মনে করেন।

স্থানীয় লেখক শ্রী স্বর্ণকান্ত হাজং-এর মতে, ‘আদি কালের হৈ হয় ত্রিয়গণ বর্তমানে হদি নামে পরিচিত। হৈ হয়+আদি = হৈহয়াদি নামকরণ থেকেই হয়হয়াদি পরে সংপ্তি আকারে “হদি” নামে পরিচিত স্থায়ী হয়।’

বর্তমানে হদিদের আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, বিবাহ পদ্ধতি, উত্তরাধিকার প্রথা সবই হিন্দুদের মতো। তাদের পোষাক পরিচ্ছদ, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্ম সংস্কৃতি সব হারিয়ে সনাতন ধর্মাশ্রয়ী হিন্দু সমাজের সাথে মিশে গেছে।