ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মানব দেহে ও পরিবেশে । এ সম্পর্কে কৃষকের বিস্তারিত ধারণা থাকা প্রয়োজন এবং ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

অধিক জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশকে । জনসংখ্যার তুলনায় আবাদি জমি কম হওয়ার কারণে আমাদের অধিক ফলনের কথা ভাবতেই হচ্ছে। এই ভাবনায় সৃষ্ট ফসলের উচ্চফলনশীল জাত । পাশাপাশি পোকা-মাকড় যাতে ফসলের কোন ক্ষতি করতে না পারে সে জন্য কীটনাশক। আপাতদৃষ্টিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমাদের আদরীয় বস্তু হলেও দিন দিন রাসায়নিক সার জমির উর্বরতা শক্তি কেড়ে নিচ্ছে। কীটনাশক ক্ষতি করছে আমাদের পরিবেশের। কীটনাশকের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রচার প্রচারণার অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশে ৯২টি রাসায়নিক গ্রুপের ৩৭৭টি বালাইনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধীকৃত। রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাকোর, থায়াডিন, ডিডিটি বেশি বিপদজনক। কম বিপদজনকের মধ্যে আছে নগস, সুমিথিয়ন, ডাইমেক্রন, ম্যালাথিওন, অ্যারোম্যাল প্রভৃতি।

সব কীটনাশকেরই প্রয়োগের পর অপেক্ষমাণকাল ৩ দিনে থেকে ২১ দিন – এমনকি ৬ মাস পর্যন্ত হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিষ প্রয়োগের এক-দুই দিনের মধ্যেই শাকসবজি সরবরাহ করা হচ্ছে বাজারে। এভাবেই ভোক্তার দেহে প্রবেশ করছে কীটনাশক।

কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৎস্য সম্পদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ২৫ ভাগ (প্রায় ২,০০০ মে.ট. ) মূলতঃ পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের পানিতে মিশে যায়। তাছাড়া কীটনাশক তৈরির কারখানা, স্প্রে করার যন্ত্রপাতি ও ব্যবহারের পাত্রাদি ধৌত করার মাধ্যমে; নানা প্রক্রিয়ায় জলজ পরিবেশ দূষিত হয়। এ দূষণ মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী, যেমন ফাইটোপ্লাঙ্কটন (উদ্ভিদ কণা) ও জুপ্লাঙ্কটনের (প্রাণিকণা) তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটায়। মাছের প্রজননক্রিয়া দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী অনেক মিঠাপানির মাছই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং বেশ কিছুসংখ্যক বিলুপ্তির পথে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুর কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশে আমদানিকৃত কীটনাশকের প্রায় ৬০% চরম বিষাক্ত, ৩০% অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত এবং মাত্র ১০% বিষাক্ত নয়।

মারাত্মক ধরনের এই কীটনাশকের মধ্যে ফেনভেলারেট ও ডায়াজিনন জাতীয় কীটনাশক আমাদের দেশের নিচু এলাকার ধানের জমিসহ অন্যান্য ফসলের জমিতেও পোকামাকড় দমনের জন্য বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রায় সব প্রকার কীটনাশকই মাছের জন্য ক্ষতিকর। তবে, অর্গানোক্লোরিন ও পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের বেশিরভাগ এবং অর্গানোফসফেট ও কার্বনেট গ্রুপের প্রায় অর্ধেক কীটনাশক মাছের জন্য প্রচণ্ডভাবে ধ্বংসাত্মক। এই শ্রেণীর বিষাক্ত কীটনাশক নিচু এলাকার ধানের জমিতে প্রয়োগের সাথে সাথে উক্ত স্থানসহ পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের মাছের তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে।

শুধু যে পরিবেশ কীটনাশকের শিকার হচ্ছে তা নয়। কৃষকরা শিকার হচ্ছে নানা রকমের দুরারোগ্য ব্যাধিতে। কৃষকরা মুখে মাস্ক না পড়ে দমকা বাতাসের ভেতরে কীটনাশক স্প্রে করে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেতে। যার কারণে কীটনাশক তার নাক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে।

ফসল ক্ষেতের পোকা-মাকড় প্রাকৃতিকভাবে দমন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবহার করতে হবে জৈব সার। তাতে কৃষকের যেমন অর্থের সাশ্রয় হবে তেমনি পরিবেশ ও মানুষ রক্ষা পাবে ক্ষতিকর কীটনাশকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে।