ক্যাটেগরিঃ কৃষি

পারমাকালচার একটি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে কোনো কিছুই স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে করা হয় না। বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক গতি এবং বিকাশের পরিপূর্ণ সুযোগ রেখে টেকসই চাষাবাদ, পশুপালন, উদ্যানপালন ও জীবনযাপন করা হয়।

পারমাকালচার শব্দটি ইংরেজি ‘পার্মানেন্ট’ ও ‘এগ্রিকালচার’ এর সমন্বিত রূপ যা মূলত স্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাকে বুঝায়। কিন্তু ব্যাপক অর্থে এর দ্বারা স্থায়ী সংস্কৃতিকে বুঝায়। পারমাকালচার হচ্ছে প্রতিবেশগতভাবে সুসজ্জিত, কার্যকরী এবং উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নের একটি বাস্তব ভিত্তিক পদ্ধতি।

পারমাকালচার মূলত একটি স্থায়ী কৃষি ব্যবস্থা যাকে অনেক সময় বাগান করার কিছু কলাকৌশলের সমষ্টিকে বুঝায়; প্রকৃতপক্ষে এটি একটি সামগ্রিক দর্শন পরিকল্পনা এবং কিছু মানুষ একে জীবন দর্শন হিসাবে বিশ্বাস করে। এর প্রধান বিষয়বস্তু শুধুমাত্র মানব জাতির প্রয়োজনের যোগান দানের একটি পদ্ধতি তৈরি করা নয়; বরং প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের প্রতি অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

গত শতাব্দির সত্তর দশকে অস্ট্রেলিয়ার ড. বিল মলিসন এবং ডেভিড হোমগ্রিন গতানুগতিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা পরিহার করে জীবজগতের পারস্পারিক পুষ্টি সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায় সে সম্পর্কিত একটি নতুন ধারণার সূত্রপাত করেন।

শিল্পভিত্তিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় কীটনাশকের যথেচ্ছা ব্যবহারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে যা মূলত মাটির উর্বরতাকেই নষ্ট করছে। মলিসন এবং হোমগ্রিন এমন একটি পদ্ধতির কথা ভাবেন যা কৃষি ব্যবস্থাকে একটি কৃষি সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাবে। তারা এই ব্যবস্থার নামকরণ করেন পারমাকালচার।

প্রথমত তারা পারমাকালচারকে বছরব্যাপী কৃষিপণ্য উৎপাদন পরিকল্পনা, উন্নয়ন এবং প্রকৃতির সকল উপাদানের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলেন। যেখানে প্রকৃতি তার স্বকীয়তা বজায় রেখে উৎপাদকের চাহিদা পূরণ করবে। পরবর্তীতে তারা পারমাকালচার ধারণাকে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে প্রসারিত করার জন্য সচেষ্ট হন যেখানে প্রকৃতির সাথে ব্যক্তি জীবনের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হবে।

পারমাকালচারের মূলনীতিঃ
প্রাথমিকভাবে পারমাকালচার পদ্ধতিতে কার্বন নিঃসরণের হার কম হয় এবং উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়; কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারি। আমরা এমনভাবে যাত্রা শুরু করতে পারি যেখানে জীবন যাত্রা আরো বেশি প্রাকৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ হবে; পরিবেশের সাথে জীবনের সম্পর্ক আরো গভীরতর হবে। পরিণামে যা বিশ্বব্যাপী জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণাকে পাল্টে দিতে পারে এবং আমাদের আচার আচরণে মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। পারমাকালচারের তিনটি মূলনীতি: ১. মাটির যত্ন ২. মানুষের সেবা ৩. সুষম বণ্টন।

মাটির যত্নঃ
গত শতাব্দির সত্তরের দশকে বিল মলিসন এবং ডেভিড হোমগ্রিন প্রাচীন উৎপাদন ক্ষমতাহীন ভঙ্গুর মাটিতে শীতকালীন ইউরোপীয় কৃষির ধ্বংসাত্মক পরিণতি কল্পনা করেন। তারা গত শতকের ত্রিশ দশকে ওকলাহামার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ধূলিঝড়ের অভিজ্ঞতায় খুব সহজেই বুঝতে পারেন প্রকৃতির বিপরীতে গিয়ে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি খুব সহজেই কীভাবে একটি অঞ্চলকে মরুভূমিত পরিণত করতে পারে। একদিকে আমরা অর্গানিক কৃষিপণ্য ব্যবহার করবো; অন্যদিকে জীববৈচিত্র ধ্বংসকারী শিল্পপণ্য ব্যবহার করবো; মাটি রক্ষার মূলনীতি এই ধারণাকে সমর্থন করে না। মাটির যত্ন নীতির প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতির সকল জীব ও জড় বস্তুর মধ্যে নিবিড় ও সমন্বিত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় অনেকগুলো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। পরিধেয় পোশাক থেকে শুরু করে অন্যান্য যে সকল পণ্য আমরা ক্রয় করি সেসব বিষয়ে আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও আমরা সবাই আমাদের বাড়ি তৈরির সকল সামগ্রী উৎপাদন করতে পারি না; আমরা আমাদের পছন্দের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমি কোন পণ্য কীভাবে ক্রয় করবো এবং এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করবো; সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এ বোঝাপড়ার মূলকথা হচ্ছে আমরা শহরের এক টুকরা জমিতে অথবা ছাদে, ঝুলন্ত বারান্দায় উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করতে পারি এবং যা একটি ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারে। পারমাকালচার মানেই ভিন্নতা তৈরি।

মানব সেবাঃ
পারমাকালচারের মৌলিকত্ব হচ্ছে একটি স্থায়ী সংস্কৃতি। জনগণ যেখানে ভোগবাদে অভ্যস্ত, কীভাবে আমরা পারমাকালচারকে উন্নত করবো? মানবসেবা বলতে আমাদের মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যগত সামাজিক সম্পর্কগুলো মিটানো বুঝায়। সত্যিকার মানব সেবা বলতে শুধুমাত্র বিশেষ কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের যত্ন বুঝায় না; প্রতিটি সম্প্রদায়ের সকল মানুষের যত্নকে বিবেচনায় নিতে হয়। পারমাকালচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি সম্প্রদায় কতটা ক্ষমতাবান হতে পারে তা বুঝতে পারা। ব্যক্তিগতভাবে জীবনকে বদলে ফেলে এবং বৈষম্য দূর করে সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করতে পারি এবং সম্প্রদায় হিসাবে অনেক কিছুই করতে পারি। এখানে কিউবার পেট্রল-উত্তর নাগরিক কৃষিকে একটি অনন্য উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায়। তারা সমগ্র দেশকে কৃষি পরিকল্পনার অন্তুর্ভুক্ত করে সাবলম্বী হয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের নগর, শহর ও গ্রামের সম্প্রদায়গত যোগাযোগকে আরো পরিকল্পিত, কার্যকর ও ঘনিষ্ঠ করে সবাই সুবিধা পেতে পারি। ব্যক্তিগতভাবে আমি হয়তো আমার প্রয়োজনীয় সব খাবার উৎপাদন করতে পারবো না; অথবা আমার বাড়িকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব করতে পারবো না; আমার পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো ঘনিষ্ঠ ও উন্নত করে আমার জীবনযাত্রাকে টেকসই করতে পারি। সামাজিক রূপান্তরের এটি একটি বিকেন্দ্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যেখানে তৃণমূল পর্যায়ের পদক্ষেপ শহরগুলোকে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে; একে একটি আন্দোলনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখানে কেন্দ্রীয় সরকার কবে কী পদক্ষেপ নিবে কী প্রক্রিয়ায় করবে সে বিষয়ে অপেক্ষার সময় নেই।

সুষম বণ্টনঃ
সর্বশেষ এই নীতিটি প্রথম দুটি নীতির সমন্বিত রূপ। সুষম বণ্টন স্বীকার করে নেয় যে, আমাদের একটি মাত্র পৃথিবী রয়েছে এবং এই পৃথিবীর সকল শক্তি ও সম্পদকে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সকল জীবের মধ্যে ভাগ করে নিতেই হবে। বিশুদ্ধ পানি ও বাতাস, খাদ্য, বাসস্থান, উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগের নিশ্চয়তা ছাড়া একটি টেকসই পরিবার, সম্প্রদায় বা দেশের নকশা তৈরি সম্ভব নয়। পৃথিবীর উত্তরভাগের শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো দক্ষিণাঞ্চলের গরিব দেশগুলোর তুলনায় তিনগুণ বেশি শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে। সুষম বণ্টন প্রাকৃতিক সম্পদের এই অসম বণ্টনকে চিহ্নিত করে উত্তরের ধনী দেশগুলোকে সীমিত সম্পদ ভোগ করার আহ্বান জানায়।

টেকসই নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে পারমাকালচার নীতিগুলোকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে এবং প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় এটি একজন ব্যক্তির পছন্দের বা অপছন্দের জীবনযাপন পদ্ধতি হিসাবে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। যে পরিবেশে, যে মাত্রায় যে পারমাকালচার নকশা প্রযোজ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিশ্বব্যাপী এই নীতিমালাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে।

পারমাকালচার নকশা প্রণয়নের নীতিমালাঃ

‘তোমার চোখে যা সুন্দর মনে হয় তাই সুন্দর’
০১। পর্যবেক্ষণ এবং মিথস্ক্রিয়া : সময় নিয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে আমরা সমাধানের ছক প্রণয়ন করতে পারি যা আমাদেরকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াবে। এটা পারমাকালচার নকশার প্রধান উপকরণ। ব্যস্ততম এই পৃথিবীতে ঋতু বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা, সবজি উৎপাদনের এক খন্ড জমির উপর জলবায়ুর সুক্ষ্ম পরিবর্তনের প্রভাব দেখতে পারা, এবং আরো বুঝতে পারা কীভাবে বাতাস, আবহাওয়া এবং হিমবাহ বৃক্ষ উৎপাদনের ক্ষতি করে; আমাদেরকে পৃথিবীর যত্ন নেয়া সম্পর্কে শিখতে শুরু করার একটি সুযোগ করে দেয়।

‘সুযোগ শেষ হবার আগেই কাজ শেষ করো’
০২। শক্তি আহরণ ও সঞ্চয় : প্রক্রিয়ার উন্নতি দ্বারা আমরা সম্পদের সর্বোচ্চ আহরণ করতে পারি যাতে আমরা প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করতে পারি। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য যখনই সুযোগ হয় তখনই আমরা পানি, সৌরশক্তি, তাপ, মাটি, অণুজীব এবং উর্বরতা সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেবো।

‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’
০৩। পুরস্কার লাভ : এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনি যে কাজ করছেন তার যথার্থ কার্যকরী পুরস্কার পাচ্ছেন। পারমাকালচার বাগান সুন্দর পুষ্প সজ্জিত ত্রুটিপূর্ণ একটি ভূচিত্র হলেও উপকারী পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। অবকাঠামোটি হচ্ছে তাপ সংরক্ষণের কার্যকরী স্থান এবং এটা সৌরচুল্লীর অবকাঠামো হিসাবেও কাজ করে। সবশেষে আমাদের বই বা সাময়িকী পড়ে মানুষ যদি তাদের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নততর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংযোগ তৈরি করে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেয় তবে তা প্রকাশকের জন্য একটি ইতিবাচক পুরস্কার।

‘সাত পুরুষ পর্যন্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়’
০৪। নিজের মতবাদ প্রয়োগ করুন এবং মতামত গ্রহণ করুন : পদ্ধতিগুলো যাতে ভালোভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রমকে নিরুৎসাহিতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যখন জীবাস্ম জ্বালানি পোড়াই তখন তা বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণ করে। কার্বন তাপ আটকে দিয়ে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে মেরু অঞ্চলের বরফ গলায় এবং ভূপৃষ্ঠ সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে যায়।

‘প্রকৃতিকে তার নিজের মতো চলতে দাও’
০৫। নবায়নযোগ্য সম্পদ ও সেবার ব্যবহার ও মূল্যায়ন : আমাদের আচরণের ও ভোগের মাত্রা প্রকৃতির প্রাচুর্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অনবায়নযোগ্য সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এটা প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু প্রতিবেশগত নির্মাণ, ছোট ছোট গাছের ঝোপঝাড়, মাটি সংরক্ষণ এবং দেশীয় খাদ্যশস্য একই সাথে বাৎসরিক বীজ সংরক্ষণও এর অন্তর্ভুক্ত।

‘অপচয় করো না অভাব থাকবে না’/ ‘সময়ের এক ফোড় অসময়ের দশ ফোড়’
০৬। কোনো বর্জ্য পদার্থ উৎপাদন না করা : আমাদের সকল সম্পদের মূল্যায়ন ও ব্যাবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে তার অপচয় না হয়। পারমাকালচার প্রথমে পুনঃব্যবহার করে এবং সম্ভব সকল জিনিসের যেমন- কাগজ, কার্ড বোর্ড, পোশাক, কাঁচ এবং পচনশীল সকল অর্গানিক পণ্যের পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে।

‘বাগান নিজে তার গাছের পরিচর্যা করে না’
৭। ছক থেকে বিস্তারিত নকশা করো : পেছনে ফিরে গিয়ে আমরা প্রকৃতি এবং সমাজের কাঠামো পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এগুলো আমাদের নকশার মেরুদন্ড গঠন করতে পারে এবং সেই সাথে আমাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করতে পারে। পরিবারের পাশাপাশি ঋতু বৈচিত্র্য, জলবায়ুর ভিন্নতা, আবহাওয়া, মাটির গঠন এবং আমাদের মানব কার্যক্রমকে পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তু হিসাবে গণ্য করা হয়।

‘দশে মিলে করলে যে কোনো কাজ সহজ হয়’
০৮। খন্ডিতভাবে না করে সমন্বিতভাবে কাজ করো : যে বস্তু যেখানে থাকা দরকার তাকে সেখানেই রেখে এগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন সাধিত হয় এবং তারা একে অপরের সাহায্যে একত্রে কাজ করে। সবজি বাগান এবং ফুলের বাগানকে আলাদা বিবেচনায় না নিয়ে দুটোকে সমন্বয় করা হলে ফুলগুলো উপকারী পতঙ্গকে আকৃষ্ট করে এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে দেয়।

‘যে জিনিস যত বড় তার পতন তত ভয়াবহ’
০৯। স্বল্প এবং ধীর গতিতে সমাধান : ছোট এবং ধীরগতির পদ্ধতি বড় কর্মসূচির পদ্ধতির চেয়ে পরিচালনা করা সহজ। স্থানীয় সম্পদের অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যবহার এবং টেকসই ফলাফল অর্জন করতে হবে। বর্তমানে আমাদের সমাজ ব্যাপকভাবে জীবাস্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা প্রযুক্তির উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সুপার মার্কেটগুলো বর্তমানে তিন দিনের মধ্যে বাধাহীন সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। যদি জ্বালানি সরবরাহের ব্যাত্যয় ঘটে তবে সুপার মার্কেটের পণ্য দ্রুত ফুরিয়ে যায়। আমরা স্থানীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্য চাহিদা পূরণ করলে প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমবে।

‘এক ঝুড়িতে সব ডিম রেখো না’
১০। বৈচিত্র্যের ব্যবহার এবং মূল্যায়ন : বৈচিত্র্য নানা রকম হুমকি মোকাবেলায় ভঙ্গুরতা কমায় এবং অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সুবিধা দেয় যাতে এর অস্তিত্ব রয়েছে। খাদ্য, শক্তির উৎস এবং কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য আমাদের জীবনকে টেকসই করে।

‘পথ মসৃণ বলে ভেবো না তুমি সঠিক পথে আছ’
১১। প্রান্তিক ব্যবহার এবং ন্যূনতম মূল্যায়ন: যেখাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যায় সেই পর্যায়টাই সবচেয়ে ভালো। পদ্ধতিগুলো প্রায়ই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান, বৈচিত্র্যময় এবং উৎপাদনশীল। প্রকৃতির দুটি ভিন্ন উপাদানের প্রান্তিক মিলনের ফলে যে বৈচিত্র্য তৈরি তার বিকাশের সুযোগ রাখতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বনের ঝোপঝাড়ের প্রান্ত সীমায় বাতাস এবং সূর্যালোক প্রবেশের মাধ্যমে ফুলের সমারোহ ঘটায়; নদী ও সাগরের মিলনে মাটি উর্বর হয় যেখানে মাছ এবং পাখিদের জীবনের মিলন ঘটে; পানি ও সমভূমি মিলিত হয়ে উর্বর মাটি তৈরি হয়; এইসব প্রান্তিক সম্পর্ককে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান যেমন মাটি, বায়ু, তাপ এবং পানির পারস্পরিক প্রান্তিক সম্পর্ক প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য তৈরি করে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিকে টিকিয়ে রাখে; প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।

‘যা দৃশ্যমান তা নয় বরং কল্পনায় যে ছক আঁকা হয় তা-ই দূরদৃষ্টি’
১২। সৃজনশীল ব্যবহার এবং পরিবর্তনে সাড়া দেয়া: ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন পেতে পারি। এবং সঠিক সময়ে এই দুইয়ের মধ্যে সঠিকটি বেছে নিতে পারি। প্রকৃতিতে উত্তরাধিকারের প্রক্রিয়া বিদ্যমান। প্রকৃতির এই গতিশীলতা এবং উত্তরাধিকার যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে পারমাকালচার তা নিশ্চিত করে।

পৃথিবীর তথা বাংলাদেশের কৃষির বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। লক্ষ্যণীয় উৎপাদনশীলতায় পৌঁছলেও বর্তমান কৃষির ভবিষ্যৎ পরিণাম বিবেচনা করা হচ্ছে না। পাশাপাশি চলমান ভূমিক্ষয়, পানি দূষণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক কৃষির সমাপ্তিসহ বিভিন্ন ক্ষতির মূল্যও নির্ণয় করা হয় না। প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও চর্চার আমূল পরিবর্তনের ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বল্প মেয়াদী লাভের পাশাপাশি কৃষির ভবিষ্যত চিন্তা করে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। পারমাকালচার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো সমস্যাকে সুযোগে এবং আপাত দৃষ্টির আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তর করা। যেমন স্তুপকৃত গোবর পানি ও পরিবেশ দূষণ করতে পারে কিন্তু গোবর থেকে জৈবসার কিংবা কেঁচো সার তৈরি করা হলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি আয়ের উৎস হতে পারে।

প্রাকৃতিক বাস্তু-সংস্থানের অনুকরণে এমন বাস্তুসংস্থান তৈরি করা সম্ভব যা উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি দূষণমুক্ত। খুব নিবিড়ভাবে প্রাকৃতিক চক্র, শক্তি এবং সম্পদকে লক্ষ্য করে প্রকৃতির অনুকরণে যে পরিকল্পনা করা হয় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে। একবার ব্যবস্থাটি চালু করা হলে তা আপনা আপনিই বহাল থাকবে। এটা গুণগত মানসম্পন্ন খাবার ও শক্তি উৎপাদন করে মানুষের চাহিদা পূরণ করবে। পার্মাকালচারের মূলনীতি সার্বজনীন যা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যে কোনো শহর, গ্রাম, মরুভূমি এমনকি বাড়ির আঙিনায়-পালানে চর্চা করা সম্ভব। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় বাড়িতে এবং ধীরে ধীরে পুরো এলাকায় বিস্তৃত হয়। ঐকান্তিকভাবে শুরু করলে তুলনামূলক কম জায়গায়ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের পর কিছু জায়গা অনাবাদী রাখা যায়।

একটি খামারকে টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তরে পারমাকালচার পদ্ধতি হলো, যথাসম্ভব কম পরিবর্তন করে বৃহৎ ফলাফল পাওয়া। দূরদৃষ্টি, নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও উদ্ভাবনী ভাবনার দ্বারা সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায় যা বিভিন্ন ধাপে কয়েক বছরব্যপী বাস্তবায়ন সম্ভব। নিরীক্ষা দেখায়, কীভাবে শক্তি ও পুষ্টি স্থান পরিত্যগ করে এবং বাইরে থেকে উপাদান যোগ করা আবশ্যক হয়ে উঠে। প্রথম ধাপটি শুরু হয় ফেলে দেয়া আবর্জনা যেমন গোবর, খড়কে কাজে লাগিয়ে সার উৎপাদন ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশিয়ে এবং ভিজা খড়ের আবরণের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বাড়ানো যায় ফলে বাইরে থেকে জমিতে সার প্রয়োগ করা লাগেনা এবং অনেক খরচ বেঁচে যায়।

আমরা পাহাড়ি এলাকায় ক্ষতিকর কাঠের গাছের পরিবর্তে ফুড ফরেস্ট তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করতে পারি। এ ফুড ফরেস্ট থেকে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া যাবে। একদিকে ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত সজীব ফল, মধুসহ বিভিন্ন ফসল যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা যাবে অপরদিকে পাখির আবাস, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাসহ সঠিক বাস্তুসংস্থান। সংকটাপন্ন এসব জায়গা পার্মাকালচারের মাধ্যমে স্থিতিশীল অবস্থায় আনা সম্ভব। আর্থিক সক্ষমতা, স্পৃহা ও সামর্থের বিবেচনায় ছোট পর্যায়ে পারমাকালচার শুরু করে আস্তে আস্তে বড় পর্যায়ের সাফল্য উন্মোচন সম্ভব।