ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

বাহা হচ্ছে সাঁওতালদের প্রধান উৎসব। বাহা শব্দের আক্ষরিক অর্থ ফুল। সেজন্যই বাহা উৎসবকে ফুল বা বসন্ত উৎসব নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর মুণ্ডা বা হো আদিবাসীরা এই উৎসবকে সাহরুল নামে পালন করে থাকে।

সাঁওতালরা হিসাবে ১ মাঘকে নতুন শস্য বর্ষ সূচনার প্রথম দিন হিসাবে পালন করে। সেদিন থেকেই জমিতে লাঙ্গল দিয়ে কৃষি কার্যের সূচনা করা তারা। আর দোল পূর্ণিমার পর চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতিটি সাঁওতাল গ্রামে বাহা উৎসব পালিত হয়।

শাল পলাশ ফুল ফোটার সাথে সাথেই বাহা উৎসবের আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। পুরনো পাতা ঝরে যাওয়ার পর নতুন পাতা ও ফুল দিয়ে যখন প্রকৃতি ভরে ওঠে তখনই সাঁওতাল গ্রামে গ্রামে বাহা উৎসবের সাড়ম্বর ঘোষণা শুরু হয়। মহুল ফুলের কুঁড়ি উদ্গমের সাথে সাথেই যুবক-যুবতীদের মধ্যে উৎসব পালনের প্রস্তুতি শুরু করে। প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সেজে ওঠে শাল পলাশের রঙে ও গন্ধে তখন প্রকৃতির পূজারী আদিবাসীদের মধ্যেও আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়।

কৃষি কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে আদিম সাম্যবাদী সমাজে মানুষ যখন প্রকৃতি নির্ভর ছিল তখন শীতের শেষে গাছের পাতা ঝরে যাওয়ায় নতুন পাতা ও ফুলে গাছগুলো যখন ভরে ওঠে তখনই নতুন প্রকৃতিকে বরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি অধিক ফলমূল দিয়ে মানব জীবনকে নিরাপত্তা দেবে এই কামনাতেই বাহা উৎসবের’ সূচনা।

মেয়েরা খোঁপায় নতুন ফুল গুঁজবে না যতক্ষণ না বাহা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাহা পূজার পূর্বে সাঁওতাল কোন মানুষ নতুন ফল খাবে না। সে জন্য অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে সাহা পূজা বা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

সাহা উৎসবের প্রথম দিন উম অর্থাৎ স্নান বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিন। উৎসবের মাসাধিক কাল পূর্ব থেকেই সাঁওতালদের ঘরবাড়ি পরিস্কার করার কাজ শুরু করে। গিরু মাটি, গোবর এবং খড় পুড়িয়ে নিজ¯^ রঙ তৈরি করে ঘরদোর সাজিয়ে তোলা হয়। যে কোনো গ্রামে এই রঙ এবং দেওয়ালে বিভিন্ন পশুপাখি, ফুল-পাতা-পাতার চিত্র দেখেই সাঁওতাল পাড়া বা গৃহকে পৃথকভাবে চিনে নিতে একটুও অসুবিধা হয় না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গৃহ বা বাসনকোসন সাঁওতাল সংস্কৃতির অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ।

জাহের থান বা উৎসবস্থলও পরিষ্কার করা হয়। চারিদিকে খড় দিয়ে পাকানো দড়িতে আম পাতা গেঁথে সুন্দরভাবে সাজানো হয়। একটি শাল বা মহুয়া গাছকে ঘিরে ছামডা বা গৃহ তৈরি করা হয়। গোবর দিয়ে নিকানো পূজাস্থল তৈরি হয়। সন্ধ্যায় মোড়ল বা মাঝি থানে নাচ গান হয়। প্রতিটি পরিবারেই মেয়ে জামাইকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়।

মধ্যম দিনে সার্দিমাহা পুজা বা মূল উৎসবের দিন। নায়কে বা পুরোহিতকে পূজাস্থলে নিয়ে আসার জন্য গ্রামের যুবক-যুবতীরা সকালেই স্নান সেরে পুরোহিতের বাড়িতে উপস্থিত হয়। পূজার সামগ্রী নতুন কুলার আতপ চাল, শাল ফুল, মহুয়া ফুল প্রভৃতি নিয়ে প্রস্তুত হলে গ্রামের যুবক-যুবতীগণ নৃত্য ও বাদ্য সহযোগে পুরোহিতকে পূজাস্থলে নিয়ে আসে।

শাল ও মহুয়া ফুল এবং নতুন ফুল দেবদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। সারাদিন ধরে পূজা সমাপ্ত হলে নাচগান শুরু হয় এবং নাচতে নাচতে আবার পুরোহিতকে বাড়িতে পৌঁছায়ে দেযা হয়। ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিটি বাড়ির দরজায় বাড়ির মেয়েরা পুরোহিতের পা ধুইয়ে দেয়। পুরোহিত তার ডাল থেকে প্রতিটি বাড়িতে পূজার নতুন ফুল দেন। বাড়িতে মেয়েরা সেই ফুল বণ্টন করে খোপায় গুঁজে নেয় সম্পর্কিত দেওর, বৌদি বা ননদের মধ্যে জল ছিটিয়ে আনন্দ করতে দেখা যায়। গুরুজনরা অন্য সম্পর্কিত লোকেদের মধ্যে জল ছিটানোর খেলা চলে না। সারা রাত গ্রামে নাচগান আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে।

শেষ দিন উৎসবের জালে মাহা। সেদিনও খাওয়া দাওয়া বা উৎসবের রেশ চলতে থাকে। তিন দিন ধরে বাহা উৎসব সাঁওতাল গ্রামে যুব বৃদ্ধ সবাই মেতে ওঠে। বাহা উৎসবের মধ্য দিয়েই নতুন ফুল ফল ও পাতা ব্যবহার সাঁওতাল সমাজ শুরু করে। গেয়ে উঠে

সারজম ইচী : মুরুৎ বাহা বাহায়েনা
বাহা বঁগা ফাগুন চাঁদো সেটেরেনা।
দারেরে মাতদম সারেড়না
আতো রে কড়া কুড়িল রিঝৌওয়েনা।

***
ছবি: জয়নুল আবেদিন ( চিত্রকর্ম : দুজন সাওতাল রমনী, ১৯৫১ )
তথ্যসূত্র: উপেন কিসকুর- ‘সাওতাল উৎসব’ প্রবন্ধ