ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

(পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট । ১৯৭২ সালে ৩১ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এটি প্রচারিত হয়।)

ডেভিট ফ্রস্ট: সে রাতের কথা আপনি বলুন। সেই রাত, যে রাতে একদিকে আপনার সঙ্গে চলছিল আলোচনা এবং সেই আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল, সেই রাতের কথা বলুন। সেই ২৫ মার্চ, রাত আটটা। আপনি আপনার বাড়িতে ছিলেন। সেই বাড়িতেই পাকিস্তান বাহিনী আপনাকে গ্রেফতার করেছিল। আমরা শুনেছিলাম, টেলিফোনে আপনাকে সাবধান করা হয়েছিল, সামরিক বাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করেছে। তবু আপনি আপনার বাড়ি পরিত্যাগ করলেন না। আপনি গ্রেফতার হলেন। কেন আপনি আপনার বাড়ি ছেড়ে অপর কোথাও গেলেন না এবং গ্রেফতার বরণ করলেন? কেন এই সিদ্ধান্ত? সে কথা বলুন।
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, সে এক কাহিনী। তা বলা প্রয়োজন। সে সন্ধ্যায় আমার বাড়ি পাকিস্তান সামরিক জান্তার কমান্ডো বাহিনী ঘেরাও করেছিল। ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে ওরা আমায় হত্যা করবে এবং প্রচার করে দেবে যে, ‘তারা যখন আমার সঙ্গে রাজনীতিক আপোষের আলোচনা করছিল, তখন দেশের চরমপন্থীরাই আমাকে হত্যা করেছে।’ আমি বাড়ি থেকে বেরুনো নিয়ে চিন্তা করলাম। আমি স্থির করলাম, আমি মরি, তবু আমার প্রিয় দেশবাসী রক্ষা পাক।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি হয়তো কলকাতা চলে যেতে পারতেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: আমি ইচ্ছা করলে যে কোন জায়গায় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দেশবাসীকে পরিত্যাগ করে আমি কেমন করে যাবো? আমি তাদের নেতা। আমি সংগ্রাম করবো। মৃত্যুবরণ করবো। পালিয়ে যাবো কেন? দেশবাসীর কাছে আমার আহ্বান ছিল তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার সিদ্ধান্ত অবশ্যই সঠিক ছিল। কারণ এই ঘটনাই বিগত নয় মাস ধরে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনাকে তাদের একটি বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত করেছে। আপনি এখন তাদের কাছে প্রায় ঈশ্বরবৎ।
শেখ মুজিবুর রহমান: আমি তা বলি না। কিন্তু এ কথা সত্য, তারা আমাকে ভালোবাসে। আমি আমার বাংলার মানুষকে ভালোবেসেছিলাম। আমি তাদের জীবনকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হানাদার বর্বর বাহিনী আমাকে সে রাতে আমার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করল। ওরা আমার নিজের বাড়ি ধ্বংস করে দিল। ওরা গ্রামে ফৌজ পাঠিয়ে আমার বাবা-মাকেও বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে তাদের চোখের সামনে সে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল। বাবা-মার আর কোনো আশ্রয় রইল না। কিন্তু আমি জানতাম, আমাদের সংগঠনের শক্তি আছে। আমি একটি শক্তিশালী সংগঠনকে জীবনব্যাপী গড়ে তুলেছিলাম। জনগণ তার ভিত্তি। আমি জানতাম, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা প্রতি ইঞ্চিতে লড়াই করবে। আমি বলেছিলাম, হয়তো এটাই আমার শেষ নির্দেশ। মুক্তি অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের লড়াই করতে হবে। লড়াই তোমাদের চালিয়ে যেতে হবে।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনাকে ওরা ঠিক কিভাবে গ্রেফতার করেছিল? তখন তো রাত ১-৩০ মি: ছিল? তাই নয় কি? তখন কি ঘটলো?
শেখ মুজিবুর রহমান: ওরা প্রথমে আমার বাড়ির ওপর মেশিনগানের গুলি চালিয়েছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট: ওরা যখন এলো, তখন আপনি বাড়ির কোনখানটাতে ছিলেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: এই যেটা দেখছেন, এটা আমার শোবার ঘর। আমি এই শোবার ঘরেই তখন বসেছিলাম। এদিক থেকে ওরা মেশিনগান চালাতে আরম্ভ করে। তারপরে এদিক, ওদিক-সবদিক থেকে গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করে। জানালার উপর গুলি চালায়।

ডেভিড ফ্রস্ট: এগুলো সব তখন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, সব ধ্বংস করেছিল। আমি তখন আমার পরিবার পরিজনদের সঙ্গে ছিলাম। একটা গুলি আমার শোবার ঘরে এসে পড়ে। আমার ছয় বছরের ছোট ছেলেটি বিছানার ওপর তখন শোয়া ছিল। আমার স্ত্রী এই শোবার ঘরে দুটি সন্তান নিয়ে বসেছিলেন।

ডেভিড ফ্রস্ট : পাকিস্তান বাহিনী কোন দিক দিয়ে ঢুকেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: সবদিক দিয়ে। ওরা একবার জানালার মধ্য দিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। আমি আমার স্ত্রীকে দুটি সন্তানকে নিয়ে বসে থাকতে বলি। তারপর তার কাছ থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে আসি।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার স্ত্রী কিছু বলেছিলেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: না, কোনো শব্দ উচ্চারণের পরিস্থিতি তখন ছিল না। আমি শুধু তাকে একটি বিদায় সম্বোধন জানিয়েছিলাম। আমি দুয়ার খুলে বাইরে বেরিয়ে ওদের গুলি বন্ধ করতে বলেছিলাম। আমি বললাম, তোমরা গুলি বন্ধ করো। আমি তো এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমরা গুলি করছো কেন? তোমরা কি চাও? তখন চারিদিক থেকে ওরা আমার দিকে ছুটে এলো, বেয়নেট উদ্যত করে। ওদের একটা অফিসার আমাকে ধরল। ওই অফিসারই বললো, এই! ওকে মেরে ফেলো না? একটা অফিসারই ওদের থামিয়েছিল। ওরা তখন আমাকে এখান থেকে টেনে নামালো। ওরা পেছন থেকে আমার গায়ে, পায়ে বন্দুকের কুদো দিয়ে মারতে লাগল। অফিসারটা আমাকে ধরেছিল। তবু ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে টেনে নামাতে লাগল। আমি বললাম, আমার তামাকের পাইপটা নিতে দাও ওরা একটু থামল। আমি ওপরে গিয়ে আমার তামাকের পাইপটা নিয়ে এলাম। আমার স্ত্রী তখন দুটি ছেলেকে নিয়ে দাড়িয়েছিলেন। আমাকে কিছু কাপড়-চোপড়সহ একটি ছোট স্যুটকেস দিলেন। তাই নিয়ে আমি নেমে এলাম। চারিদিকে তখন আগুন জ্বলছিল। আজ এই যে দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকেই ওরা আমায় নিয়ে গেল।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার ৩২ নং ধানমন্ডির বাড়ি থেকে সেদিন যখন আপনি বেরিয়ে এলেন, তখন কি ভেবেছিলেন, আর কোনো দিন আপনি এখানে ফিরে আসতে পারেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: না, আমি তা কল্পনা করতে পারিনি। আমি ভেবেছি, এই শেষ। কিন্তু আমার মনের কথা ছিল, আজ আমি যদি আমার দেশের নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে মরতে পারি, তাহলে আমার দেশের মানুষের অন্তত লজ্জার কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু আমি ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, আমার দেশবাসী পৃথিবীর সামনে আর মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমি মরি, তাও ভালো। তবু আমার দেশবাসীর যেন মর্যাদার কোনো হানি না ঘটে।

ডেভিড ফ্রস্ট: শেখ সাহেব, আপনি একবার বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মরতে রাজি, তুমি তাকে মারতে পারো না।’ কথাটি কি এমনি ছিল না?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। যে মানুষ মরতে রাজি তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সে তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না, তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস। আমি একজন মুসলমান। এবং একজন মুসলমান একবারই মরে। দু’বার নয়। আমি মানুষ। আমি মনুষ্যত্বকে ভালোবাসি। আমি আমার জাতির নেতা। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি। আজ তাদের কাছে আমার আর কিছু দাবি নেই। তারা আমাকে ভালোবেসেছে। সবকিছুকে বিসর্জন দিয়েছেন। কারণ, আমি আমার সবকিছুকে তাদের জন্য দিবার অঙ্গীকার করেছি। আজ আমি তাদের মুখে হাসি দেখতে চাই। আমি যখন আমার প্রতিটি দেশবাসীর স্নেহ-ভালোবাসার কথা ভাবি, তখন আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই।

ডেভিড ফ্রস্ট: পাকিস্তান বাহিনী আপনার বাড়ির সবকিছু লুট করে নিয়েছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমার সবকিছুই ওরা লুট করেছে। আমার ঘরের বিছানাপত্র, আলমারি, কাপড়-সবকিছুই লুণ্ঠিত হয়েছে। মি: ফ্রস্ট, আপনি দেখতে পাচ্ছেন, এ বাড়ির কোনো কিছুই আজ নেই।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার বাড়ি যখন মেরামত হয়, তখন এসব জিনিস লুণ্ঠিত হয়েছে, না পাকিস্তানীরা সব লুণ্ঠন করেছে?
শেখ মুজিবুর রহমান: পাকিস্তানি ফৌজ আমার সবকিছুই লুণ্ঠন করেছে। কিন্তু এই বর্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, আমার সন্তানদের দ্রব্য-সামগ্রী লুণ্ঠন করেছে। তাতে আমার দুঃখ নেই। আমার দুঃখ ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল। আমার একটি সুন্দর লাইব্রেরী ছিল। বর্বরেরা আমার প্রত্যেকটি বই আর মূল্যবান দলিলপত্র লুণ্ঠন করেছে। সবকিছুই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: তাই আবার সেই প্রশ্নটা আমাদের সামনে আসে কেন ওরা সবকিছু লুণ্ঠন করলো?
শেখ মুজিবুর রহমান: এর কি জবাব দেবো? আসলে ওরা মানুষ নয়। কতগুলো ঠগ, দস্যু, উন্মাদ, অমানুষ আর অসভ্য জানোয়ার। আমার নিজের কথা ছেড়ে দিন। তা নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, ২ বছর ৫ বছরের শিশু, মেয়েরা কেউ রেহাই পেলো না। সব নিরীহ মানুষকে ওরা হত্যা করেছে। আমি আপনাকে দেখিয়েছি সব জ্বালিয়ে দেওয়া, পোড়াবাড়ি, বস্তি। একেবারে গরীব, না-খাওয়া মানুষ সব বাস করতো এই বস্তিতে। বস্তির মানুষ জীবন নিয়ে পালাতে চেয়েছে। আর সেইসব মানুষের ওপর চারিদিক থেকে মেশিনগান চালিয়ে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: কি আশ্চার্য! আপনি বলছেন, ওদের ঘরে আগুন দিয়ে ঘর থেকে বের করে, খোলা জায়গায় পলায়মান মানুষকে মেশিনগান চালিয়ে হত্যা করেছে?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ এমনিভাবে গুলি করে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: কোন মানুষকে মারলো, তারা কোন পরোয়া করলো না?
শেখ মুজিবুর রহমান : না, তার বিন্দুমাত্র পরোয়া করেনি।

ডেভিড ফ্রস্ট: কেবল হত্যা করার জন্য হত্যা-যাকে পেয়েছে, তাকেই হত্যা করেছে?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। ওরা ভেবেছে প্রত্যেকেই শেখ মুজিবের মানুষ। তাই প্রত্যেককেই হত্যা করতে হবে।

ডেভিড ফ্রস্ট: মানুষ মানুষকে এমনিভাবে হত্যা করছে, তখন আপনার কী মনে হয়? আপনি কি মনে করেন, মানুষ আসলে ভালো? কিংবা মনে করেন, মানুষ আসলেই খারাপ?
শেখ মুজিবুর রহমান: ভালো-মন্দ সর্বত্রই আছে । কিন্তু আমি মনে করি, পশ্চিম পাকিস্তানের এই ফৌজগুলো মানুষ নয়। এগুলো পশুরও অধম। কারণ একটা পশু আক্রান্ত হলেই আক্রমণ করে। তা নইলে নয়। পশু যদি মানুষের আক্রমণ করে মেরে ফেলে, তবু সে তাকে অত্যাচার করে না। কিন্তু এই বর্বরের দল আমার দেশবাসীকে কেবল হত্যা করেনি। দিনের পর দিন বন্দী মানুষকে অত্যাচার করেছে। ৫ দিন, ৭ দিন, ১৫ দিন ধরে নির্মম অত্যাচার করে তারপর হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: পাকিস্তানে বন্দী থাকাকালে ওরা আপনার বিচার করেছিল। সেই বিচার সম্পর্কে কিছু বলুন।
শেখ মুজিবুর রহমান: ওরা একটা কোর্ট মার্শাল তৈরি করেছিল। তাতে পাঁচ জন ছিল সামরিক অফিসার। বাকি কয়েকজন বেসামরিক অফিসার।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনলো ওরা?
শেখ মুজিবুর রহমান: অভিযোগ- রাষ্ট্রদ্রোহিতা, পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র- আরও কতো কি?

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার পক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন? আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় ছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: সরকারের তরফ থেকে গোড়ায় এক উকিল দিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন দেখলাম অবস্থাটা এমনি যে, যুক্তির কোনো দাম নেই। এ হচ্ছে বিচারের নামে প্রহসন মাত্র। তখন আমি কোর্টে নিজে দাঁড়িয়ে বললাম- ‘জনাব বিচারপতি, দয়া করে আমাকে সমর্থনকারী উকিল সাহেবকে যেতে বলুন। আপনারা বিলক্ষণ জানেন, এ হচ্ছে এক গোপন বিচার। আমি বেসামরিক লোক। আর আপনারা করছেন আমার কোর্ট মার্শাল!’ ইয়াহিয়া খান কেবল যে প্রেসিডেন্ট, তাই নয়।। তিনি প্রধান সামরিক শাসকও। এ বিচারের রায়কে অনুমোদনের কর্তা তিনি। এই আদালতকে গঠন করেছেন তিনি।

ডেভিড ফ্রস্ট : তার মানে তার হাতেই ছিল সব?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, সে ছিল দন্ডমুন্ডের কর্তা। তার ইচ্ছাই সব।

ডেভিড ফ্রস্ট: তার মানে, আপনি আদালতে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: তার তো কোনো উপায় ছিল না। আমি তো বন্দী।

ডেভিড ফ্রস্ট: হ্যাঁ, তাতো বটেই। আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তো কোনো উপায় ছিল না। ওরা কি বিচার শেষ করে, সরকারীভাবে কোন রায় তৈরি করেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: ৪ঠা ডিসেম্বর (১৯৭১) ওরা আদালতের কাজ শেষ করে। সাথে সাথে ইয়াহিয়া খান সব বিচারক রাওয়ালপিন্ডি ডেকে পাঠালো রায় তৈরি করার জন্য। সেখানে ঠিক করল, ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে।

ডেভিড ফ্রস্ট: আর তাই সেলের পাশে কবর খোঁড়া দেখে আপনি বুঝতে পেরেছিলেন, ওরা ওখানেই আপনার কবর দিবে?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমার সেলের পাশে ওরা কবর খুড়ল। আমার চোখের সামনে।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি নিজের চোখে তাই দেখলেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমি আমার নিজের চোখে দেখলাম ওরা কবর খুড়ছে। আমি আপন মনে বললাম- এ কবর আমার কবর। ঠিক আছে। কোন পরোয়া নেই। আমি তৈরি আছি।

ডেভিট ফ্রস্ট: ওরা কি আপনাকে বলেছিল, এ তো তোমার কবর?
শেখ মুজিবুর রহমান: না, ওরা তা বলেনি।

ডেভিড ফ্রস্ট: কি বলেছিল ওরা?
শেখ মুজিবুর রহমান: তোমার কবর নয়। ধর যদি বোম্বিং হয়, তাহলে তুমি এখানে শেলটার নিতে পারবে।

ডেভিট ফ্রস্ট: সেই সময়ে আপনার মনের চিন্তা কি ছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: আমি জানতাম, যে কোনো দিন ওরা আমায় শেষ করে দিতে পারে। কারণ ওরা অসভ্য, বর্বর।

ডেভিড ফ্রস্ট: এমনি অবস্থায় আপনার কেমন করে কাটতো? আপনি কি প্রার্থনা করতেন।
শেখ মুজিবুর রহমান: এমন অবস্থায় আমার নির্ভর ছিল আমার বিশ্বাস, আমার জাতি, আমার পৌনে আট কোটি মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস। তারা আমায় ভালোবেসেছে- ভাইয়ের মতো, পিতার মতো। আমাকে তাদের নেতা বানিয়েছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি যখন দেখলেন, ওরা কবর খনন করেছে, তখন আপনার মনে কার কথা আগে জাগল? আপনার দেশের কথা? না, আপনার স্ত্রী-পুত্র পরিজনের কথা?
শেখ মুজিবুর রহমান: আমার প্রথম চিন্তা আমার দেশের জন্য। আমার যা কিছু সুখদুঃখ, সে তো আমার দেশেরই জন্য। আপনি তো দেখেছেন, আমাকে তারা কি গভীরভাবে ভালোবাসে।

ডেভিড ফ্রস্ট: হ্যাঁ, এ কথা আমি বুঝি। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত বাংলাদেশের আপনি নেতা। আপনার প্রথম চিন্তা অবশ্যই আপনার দেশের চিন্তা। পারিবারিক চিন্তা পরের চিন্তা।
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, জনতার প্রতিই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি তো জানি, আমি অমর নই। আজ, কিংবা কাল, কিংবা পরশু আমাকে মরতেই হবে। মানুষ মাত্রই মরতে হয়। কাজেই আমার বিশ্বাস, মানুষ মৃত্যুবরণ করবে সাহসের সঙ্গে।

ডেভিড ফ্রস্ট: কিন্তু ওরা তো আপনাকে কবর দিতে পারেনি। কে আপনাকে রক্ষা করেছিল সেদিন আপনার ভবিষ্যৎ থেকে।
শেখ মুজিবুর রহমান: আমার বিশ্বাস সর্বশক্তিমান আল্লাহই আমাকে রক্ষা করেছেন।

ডেভিড ফ্রস্ট: আমি একটা বিবরণে দেখলাম, আপনাকে নাকি জেলার এক সময়ে সরিয়ে রেখেছিল। ইয়াহিয়া খান যখন আপনাকে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন আপনাকে স্থানান্তরে নিয়ে গিয়েছিল। একি যথার্থ?
শেখ মুজিবুর রহমান: ওরা জেলাখানায় একটা অবস্থা তৈরি করেছিল, মনে হচ্ছিল কতগুলো কয়েদিকে ওরা সংগঠিত করেছিল। যেন সকালের দিকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা আমাকে হত্যা করে ফেলতে পারে। আমার মনে হয়, আমাকে তত্ত্বাবধানের ভার যে অফিসারের ওপর পড়েছিল, আমার প্রতি তার কিছুটা সহানুভূতি জেগেছিল। হয়তো-বা সে অফিসার এমনও বুঝতে পেরেছিল যে, ইয়াহিয়া খানের দিন শেষ হয়ে আসছে। আমি দেখলাম, হঠাৎ রাত তিনটার সময়ে সে এসে আমাকে সেল থেকে সরিয়ে নিয়ে তার নিজের বাংলাতে দুদিন যাবৎ রক্ষা করল। এ দুদিন আমার ওপর কোনো সামরিক পাহারা ছিল না। দুদিন পরেই এই অফিসার আমাকে আবার একটা আবাসিক কলোনির নির্জন এলাকায় সরিয়ে নিল। সেখানে আমাকে হয়তো চার-পাঁচ কিংবা ছয় দিন রাখা হয়েছিল। এই সময়টাহেত আমার অবস্থান সম্পর্কে নিম্নপদস্থ কিছু অফিসার ছাড়া আর কেউ জ্ঞাত ছিল না।

ডেভিড ফ্রস্ট: এ তাদের সাহসেরই কাজ। এখন তাদের কী হয়েছে, তাই ভাবছি।
শেখ মুজিবুর রহমান: আমিও জানি না। ওদের জন্য যথার্থ শুভ কামনা রয়েছে। এমন কি শেষ মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান যখন ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তখন ইয়াহিয়া বলেছিল, মিস্টার ভুট্টো, আমার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল হচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি না দেওয়া।

ডেভিড ফ্রস্ট: ইয়াহিয়া এমন কথা বলেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, ভুট্টো একথা আমায় বলে, তার পরে বলেছিল: ইয়াহিয়ার দাবি ছিল, ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে সে পেছনের তারিখ দিয়ে আমাকে ফাঁসি দিবে। কিন্তু ভুট্টো আর এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

ডেভিড ফ্রস্ট: ভুট্টো কী জবাব দিয়েছিল? তার জবাবের কথা কি ভুট্টো আপনাকে কিছু বলেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, বলেছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট: কী বলেছিল ভুট্টো?
শেখ মুজিবুর রহমান: ভুট্টো ইয়াহিয়াকে বলেছিল- ‘না, আমি তা হতে দিতে পারি না। তাহলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ঘটবে। বাংলাদেশে এখন আমাদের এক লাখ তিন হাজার সামরিক লোক বাংলাদেশ আর ভারতীয় বাহিনীর হাতে বন্দী রয়েছে। তাছাড়া পাচ থেকে দশ লাখ অবাঙালি বাংলাদেশে আছে। মিস্টার ইয়াহিয়া এমন অবস্থায় আপনি যদি শেখ মুজিবকে হত্যা করেন আর আমি ক্ষমতা গ্রহণ করি, তাহলে একটা লোকও আর জীবিত অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত আসতে সক্ষম হবে না। আর প্রতিক্রিয়া পশ্চিম পাকিস্তানেও ঘটবে। তখন আমার অবস্থা হবে সংকটজনক।’ ভুট্টো একথা আমাকে বলেছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট: শেখ সাহেব, আজ যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ ঘটে, আপনি তাহলে তাকে কী বলবেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: ইয়াহিয়া খান একটা জঘন্য খুনি। তার ছবি দেখতেও আমি রাজি নই। তার বর্বর ফৌজ দিয়ে সে আমার ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: নিহতদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ একথা আপনি সঠিকভাবে জানেন?
শেখ মুজিবুর রহমান: মিস্টার ফ্রস্ট, আপনি জানেন, আমার বাংলাদেশে কী ঘটেছে? শিশু, মেয়ে, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সকলকে ওরা হত্যা করেছে। ৩০ লাখ বাঙালিকে ওরা হত্যা করেছে। অন্ততপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ঘরবাড়ি ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং তারপর সবকিছু ওরা লুট করেছে। খাদ্যের গুদামগুলিকে ওরা ধ্বংস করেছে। আমার লোকজন তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। এখনও আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসিনি। সংখ্যা হয়তো একেও ছাড়িয়ে যাবে। ত্রিশ লক্ষের কম তো নয়ই।

ডেভিড ফ্রস্ট: কিন্তু এমন হত্যাকান্ড তো নিরর্থক। মানুষকে ঘর থেকে টেনে এনে এনে হত্যা করা।
শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, কাদের ওরা হত্যা করেছে, একেবারেই নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষকে। গ্রামের মানুষকে, যে গ্রামের মানুষ পৃথিবীর কথাই হয়তো কিছু জানত না, সে গ্রামে ঢুকে পাকিস্তানি ফৌজ পাখি মারার মতো গুলি করে এই মানুষকে ওরা হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: আমার মনেরও প্রশ্ন : আহা! কেন এমন হলো?
শেখ মুজিবুর রহমান: না, আমিও জানি না বা বুঝি না। এ রকম পৃথিবীর আর ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।

ডেভিড ফ্রস্ট: আর এতো ছিল মুসলমানের হাতেই মুসলমানের হত্যা?
শেখ মুজিবুর রহমান: ওরা নিজেরা নিজেদের মুসলমান বলে। অথচ ওরা হত্যা করেছে মুসলমান। আমাদের ত্রানশিবিরে এখনও অনেক রয়েছে। নির্যাতিত মেয়েদের, অনেককে উদ্ধার করেছি। এদের স্বামী, পিতা-সকলকে হত্যা করা হয়েছে। মা আর বাবার সামনে ওরা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। পুত্রের সামনে মাকে ধর্ষণ করেছে। আপনি চিন্তা করুন। আমি এ কথা চিন্তা করে চোখের অশ্রুকে রোধ করতে পারি না। এরা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে কীভাবে? এরা তো পশুরও অধম। মনে করুন, আমার বন্ধু মশিউর রহমানের কথা। আমাদের দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন তিনি। আমাদের সরকারের একজন প্রাক্তন মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২৪ দিন ধরে তার উপর নির্যাতন চালিয়েছে। প্রথমে তাঁর এক হাত কেটেছে। তারপর পা কেটেছে। ২৪ দিনব্যাপী চলছে এমন নির্যাতন (শেখ মুজিব কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন) কিন্তু এতো একটা কাহিনী। আমাদের নেত, কর্মী, বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মচারীদেরকে জেলখানায় আটক করে; সেখান নিয়ে দিনের পর দিন অত্যাচার করে তারপর হত্যা করেছে। এমন অমানুষিক নির্যাতনের কাহিনী আমি ইতিহাসে কোথাও শুনিনি। একটা পশু একটা বাঘও তো মানুষকে হত্যা করলে এমনভাবে হত্যা করে না।

ডেভিড ফ্রস্ট: ওরা কী চেয়েছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান: ওরা চেয়েছিল আমাদের এই বাংলাদেশকে একেবারে উপনিবেশ করে রাখতে। আপনি তো জানেন, মিস্টার ফ্রস্ট, ওরা বাঙালি পুলিশ বাহিনীর লোককে, বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে। ওরা বাঙালি শিক্ষক, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, বাঙালি ডাক্তার, যুবক, ছাত্র-সবাইকে হত্যা করেছে। যুদ্ধের শেষ অবস্থাতেও ১৪ ডিসেম্বর ওরা ১৩০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট: মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, পৃথিবীর মানুষের জন্য কী বাণী আমি আপনার কাছ থেকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি?
শেখ মুজিবুর রহমান: আমার একমাত্র প্রার্থনা-বিশ্ব আমার দেশের মানুষের সাহায্যে অগ্রসর হয়ে আসুক। আমার হতভাগ্য দেশবাসীর পাশে এসে বিশ্বের মানুষ দাঁড়াক। আমার দেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দুঃখ ভোগ করেছে, এমন আত্মত্যাগ পৃথিবীর খুব কম দেশের মানুষকেই করতে হয়েছে। মিস্টার ফ্রস্ট, আপনাকে আমি আমার একজন বন্ধু বলে গণ্য করি। আমি আপনাকে বলেছিলাম, আপনি আসুন। নিজের চোখে দেখুন। আপনি নিজের চোখে অনেক দৃশ্য দেখেছেন। আরো দেখুন। আপনি আমার এই বাণী বহন করুন- সকলের জন্যই আমার শুভেচ্ছা। আমি বিশ্বাস করি, আমার দেশের কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে এসে বিশ্ব দাঁড়াবে। আপনি আমার দেশের বন্ধু। আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।

ডেভিড ফ্রস্ট: জয় বাংলা । আমিও বিশ্বাস করি, বিশ্ববাসী আপনাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। আপনাদের পাশে এসে আমাদের দাঁড়াতে হবে। নয়তো ঈশ্বর আমাদের কোনো দিন ক্ষমা করবেন না।

***
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রকাশনা ‘মাতৃভূমি’ ১৫ আগস্ট ২০০৬ শোকদিবস সংখ্যা।
২. নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন’ বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠান।
৩. টিভি ডট কম: দ্য ডেভিড ফ্রস্ট শো
৪. ছবি- আওয়ামী লীগ আর্কাইভ
৫. ভিডিও- ইউ টিউব ও নিউইয়র্ক টেলিভিশন

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট