ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

গোটা আরব দুনিয়ার একনায়কতন্ত্রগুলির বিরুদ্ধে গত এক-দেড় মাস জুড়ে ঘটে চলা বিশালাকার জনবিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গের নাম মুহাম্মদ বোয়াজিজি।

আফ্রিকার উত্তর প্রান্তের দেশ তিউনিসিয়ার একটি গঞ্জ শহর সিদি বৌজিদ-এর যুবক বোয়াজিজি-র বাবা ছিলেন পাশের দেশ লিবিয়াতে কর্মরত এক নির্মাণকর্মী। বাবা যখন মারা যান, তখন বোয়াজিজি-র বয়স তিন। দশ বছর বয়স থেকেই সে অভাবের সংসারের হাল ধরে, পড়াশুনার পাশাপাশি ফল এবং শাকসব্জি বিক্রি করত রাস্তায়। বোনেদের পড়াশুনার খরচও চালাত সে।

এক কোটি মানুষের বসতি তিউনিসিয়া দেশটি মুসলিম প্রধান। কিন্তু পশ্চিমি সংস্কৃতির প্রভাব আছে এদেশে। ১৯৫৬ সালে ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্তির পর ১৯৮৭ সাল থেকে এই দেশের রাষ্ট্রপতি বেন আলি। প্রতিবার ভোটে এই লোকটিই জেতে প্রচুর ব্যবধানে। এই বেন আলির নেতৃত্বাধীন তিউনিসিয়া মার্কিন-ব্রিটিশ বাহিনীর আফগানিস্তান-ইরাক আগ্রাসনের অন্যতম শরিক। এই দেশটির অর্থনীতি নয়া উদারবাদী, কর্পোরেট পুঁজির ভালোই আনাগোনা এখানে। ২০০৯ সালে কর্পোরেটদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়র্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’ এই দেশটিকে আফ্রিকার সবচেয়ে ‘প্রতিযোগিতাপ্রবণ’ দেশ আখ্যা দিয়ে বাহবা দিয়েছিল।

বেন আলির একনায়কতন্ত্র ধর্মীয় নয়, বরং কখনও সখনও ধর্মীয় স্বাধীনতাও ক্ষতিগ্রস্ত এখানে। যেমন, জনবহুল এলাকায় মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরে আসা নিষিদ্ধ। নেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও। দেশের উত্তরাঞ্চলের ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী অংশে পর্যটন, কৃষি, বস্ত্র শিল্প, এবং ভারী শিল্পের জন্য লোকের কিছুটা সচ্ছলতা থাকলেও, মধ্য ও দক্ষিণভাগের সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন অংশে কৃষিপ্রধান মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ সঙ্গীন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি বেন আলি এবং তার দলের লোকেরা দুর্নীতি করে সরকারি কোষাগারের টাকা আত্মসাৎ করে — এটাই দেশটার নিয়ম ছিল। দেশটিতে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী রয়েছে, এক তৃতীয়াংশ লোকের ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। রয়েছে এক শিক্ষিত বেকার যুবক শ্রেণী। যদিও বোয়াজিজি নিচের তলার মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ না মাড়ানো রাস্তার ফেরিওয়ালা।

বোয়াজিজি-র সঙ্গে সিদি বৌজিজ শহরের পুলিশ-প্রশাসনের সম্পর্ক কোনদিনই ভালো ছিল না। পুলিশকে ঘুষ না দিলে রাস্তার হকারদের জীবন দুর্বিষহ করে ফেলত পুলিশ, বোয়াজিজি ঘুষ দিতে চাইত না। ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ সকালবেলা ধার করে কেনা ফল-সব্জি ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে রাস্তায় বিক্রি করতে বসলে স্থানীয় পুলিশ পারমিট না থাকার জন্য তার ঠেলা ও মাল আটকে দেয়। শহর প্রশাসনের এক মহিলা অফিসার তাকে প্রকাশ্যে চড় মারেন।

তখন বোয়াজিজি বিচার চাইতে যান গভর্নরের অফিসে। গভর্নর তার সাথে দেখাই করেনি। তখন সে এক টিন গ্যাসোলিন জোগাড় করে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় ওই গভর্নরের অফিসের সামনেই। তড়িঘড়ি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে আঠারো দিন পর সে মারা যায়।

কিন্তু তার জ্বলে যাওয়ার পরদিনই বোয়াজিজি-র মা এবং কিছু বন্ধুবান্ধব তার প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখান সিদি বৌজিজ শহরে। সেই বিক্ষোভের ভিডিও ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশিত হলে, এবং আরব দুনিয়ায় অন্যতম বড়ো জনমুখী কর্পোরেট মিডিয়া আল জাজিরা টিভিতে সেই ভিডিও পুনঃসম্প্রচারিত হলে, তা তিউনিসিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একের পর এক বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব, বেন আলির একনায়কত্ব, লাগামছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এই বিক্ষোভ সংগঠনে ইন্টারনেটের সামাজিক পরিসরের ভূমিকা ছিল এবং এই বিক্ষোভে মধ্যবিত্ত যুবকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানী তিউনিস সহ অনেক শহরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে বিক্ষোভকারীদের। বৃহত্তম শ্রমিক ইউনিয়ন, আইনজীবীরা স্ট্রাইক শুরু করে। অবস্থা এমনই দাঁড়ায়, বেন আলির পার্টির লোকেরা এবং প্রশাসনের মাথারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে।

১৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে ফ্রান্স পালিয়ে যান এবং তারপর সৌদি আরবে আশ্রয় পান। ২১ জানুয়ারি একটি তদারকি সরকার তৈরি হয়, ৬০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বিক্ষোভকারীরা এবার দাবি করে, বিগত সরকারের একজনকেও এই তদারক সরকারে রাখা যাবে না এবং সেই দাবি মেনে নেয় তদারকি সরকার, ২৭ জানুয়ারি। বিক্ষোভ আন্দোলন এখনও চলছে তিউনিসিয়াতে। আরব দুনিয়ায় এই ঘটনা ‘সিদি বৌজিজ ইন্তিফাদা’ বা সিদি বৌজিজ বিপ্লব বলে পরিচিতি পাচ্ছে। গোটা আরব দুনিয়ায় কয়েক দশক পরে জনবিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে একটি একনায়কতান্ত্রিক সরকারের পতন আশেপাশের দেশগুলিতে সরকার বিরোধী যুব বিক্ষোভের দরজা খুলে দিয়েছে। তিউনিসিয়ার এই ইন্তিফাদায় পুলিশ জনতা খণ্ডযুদ্ধে এখনও অবধি মারা গেছে ৭৮ জন, আহত হয়েছে শ’খানেক।

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনেই জাইন এল আবিদিন বেন আলীর পতন ঘটেছে। কোনো একক দল বা নেতা এই আন্দোলন গড়ে তোলেননি। ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রনায়কের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন অখ্যাত যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি।

নিজের জীবন দিয়ে তিনি জাইন এলের অপশাসনের চিত্র তুলে ধরেছেন দেশবাসীর সামনে। তাই সরকার পতনের পর বোয়াজিজি পাচ্ছেন জাতীয় বীরের মর্যাদা।
তিউনিসিয়ায় গণ-আন্দোলন শুরু হয় বোয়াজিজির প্রতিবাদের মাধ্যমেই। ২৬ বছর বয়সী এ যুবক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েও চাকরি পাচ্ছিলেন না। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় ফল বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে দোকানদারির অনুমতি নেননি বলে ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ তাঁর ফলের ঝুড়ি ও টাকাপয়সা কেড়ে নেয় এবং নির্যাতন করে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে বোয়াজিজি প্রতিবাদ জানালেও কেউ তাঁকে সহায়তা করেননি।

ক্ষোভ-দুঃখ আর অপমানে ওই দিনই সিদি বোজিদ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। এ ঘটনার পরই বেকারত্ব দূর করার দাবিতে তিউনিসিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে। গত ৪ জানুয়ারি যখন হাসপাতালে বোয়াজিজির মৃত্যু হয়, তখন প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তিউনিসিয়ার অলি-গলিতে।

তিন সপ্তাহের আন্দোলনে তিউনিসিয়ায় ৬৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হযেছে বলে দাবি করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এত মৃত্যুর মধ্যেও বোয়াজিজির আত্মাহুতির বিষয়টি বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে। মানুষকে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করার জন্য তাঁর শরীরে আগুন লাগানোর ছবিটিই ব্যবহার করেছে বিক্ষোভকারীরা। বোয়াজিজির নামে ফেইসবুকে একটি পেইজ খোলা হয়েছে, যাতে তাঁর পরিচয় দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়ার বিপ্লবের প্রতীক’। আর বোয়াজিজির মতো সাহসী ও প্রতিবাদী যুবকের অপেক্ষা করছে অন্যান্য আরব দেশের নিপীড়িত মানুষ।

এক নজরে –

Name- Mohamed Bouazizi
Born – Tarek el-Tayyib Mohamed Ben Bouazizi
March- 29, 1984
Sidi Bouzid, Tunisia
Died January 4, 2011 (aged 26)
Ben Arous, Tunisia
Resting place Garaat Bennour cemetery
Nationality Tunisian
Occupation Street vendor