ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

আজ মনটা খুব খারাপ। অনেক আগে থেকেই জানতাম যে স্টিভ জবস ক্যান্সারে ভুগছেন। তার সময় যে আস্তে আস্তে ফুরিয়ে আসছে তা আঁচ করতে পারছিল সবাই। আমিও জানতাম এই দানবীয় জরা তাকে নিঃশেষ করছে খুব দ্রুত। এত জানা-জানি, এত নিশ্চিত একটা ঘটনা, তারপর ও কেউ যেন মেনে নিতে পারছে না এই অকালমৃত্যুকে। আমার মনে হচ্ছে আমার খুব আপন কেউ মারা গেছে।

যারা আমাকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থেকে চেনে তারা আমার এই লেখা দেখে যারপরনাই অবাক হবে। এই পোলার সাথে স্টিভ জবসের তো দূরতম সম্পর্কও থাকার কথা না। ছাত্রজীবনে আমি ছিলাম একজন আপাদমস্তক টেকনো-বিদ্বেষী অভদ্রলোক। আমার এবং আমার অনেক বন্ধুর ধারনা ছিল টেকনোলজির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের এই মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনবে। টেকনোলজি মানুষের নান্দনিকতা, মূল্যবোধ এবং নৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে অন্য মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমরা আরও বিশ্বাস করতাম এমন একদিন আসবে যখন টেকনোলজি মানুষকে নিয়ন্ত্রন করবে। আমাদের প্রিয় পৃথিবী করায়ত্ত্ব করবে কিছু মেশিন। ফলে টেকনোলজি থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। বোধকরি সায়েঞ্চফিকশন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল আমাদের চিন্তা চেতনায়। এখন অবশ্য এইজাতীয় একধরনের দর্শন ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে ‘সিংগুলারিটি’ নামে। যাই হোক, সেই সময় আমার নগর পরিকল্মনার পাঠ্যসূচীতে প্রচুর কম্পিউটার-ল্যাব নির্ভর কোর্স ছিল। আমার কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় জায়গা ছিল কম্পিউটার-ল্যাব। নিতান্ত পাশ করতে যতোটুকু কম্পিউটার ব্যবহার করতে হত আমি তারচেয়েও কম করতাম। ফলে জিআইএস এর কোন কোন কোর্স পাশ করেছি দু-তিন বার এক্সাম রিটেক নিয়ে। এই কারনেই যখন নব্বই-ভাগ নগর পরিকল্পনাবিদ জিআইএস এবং অন্যসব সফটওয়্যারে দক্ষ আমি যে শুধু অদক্ষ তা-ই নয়, আমি একজন নখদন্তহীন পরিকল্পনাবিদ। এই জন্য আমি পরিকল্পনাবিদের রাস্তা ছেড়েছি অনেক আগেই। এরপর যখন মোবাইল খুব জনপ্রিয় হয়েছে আমি শেষমেশ না পেরে সবার চাপে একটা মোবাইল কিনলাম। নিতান্ত বেসিক। তখন নোকিয়া এন সিরিজ এর জোয়ার। সামর্থ্য থাকলেও কোনদিন ইচ্ছে হয়নি ওইসব ফোন ছুয়ে দেখি। বরং একধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করতাম এই ভেবে যে টেকনোলজি আমাকে এখনও কাবু করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের আগপর্যন্ত আমি অফিসের কম্পিউটার এ মাইক্রোসফট অফিস আর পকেটে আমার সামসং সি ৬০ নিয়েই দিব্বি সুখে কাটিয়ে দিয়েছি।

আমি দেশ ছেড়েছি এখন চার বছর পেরিয়েছে। এই চার বছরে পৃথিবীতে চারশ বছরের পরিবর্তন হয়েছে। আমেরিকায় একজন কালো লোক প্রেসিডেন্ট হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মন্দার প্রভাবে পরাশক্তিগুলোর এখন নাজেহাল অবস্থা। মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে। লাদেন মারা গেছেন। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত ঘটনার শেষ নেই। স্টিভ জবস নামের এক ভদ্রলোক এই চার বছর ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং এই চার বছরে একের পর চমকে দিয়েছেন পৃথিবীকে। বছর বছর আইফোন, আইপেড, ম্যাকবুক, আইওএস, অ্যাপ্লিকেশান। কখনও মনেই হয়নি এই লোকটি একটি ঘাতক ব্যাধির সাথে ক্রমাগত যুদ্ধের আঘাতে ক্লান্ত। বরং মনে হয়েছে প্রতিটি উৎসবে তিনি নতুনভাবে উজ্জীবিত।

এই চার বছরে আমারও পরিবর্তন হয়েছে। আমি কবি থেকে শ্রমিক হয়েছি। তত্ত্বগতভাবে মার্কসবাদ ছেড়েছি। আরও অনেক পরিবর্তন। একটা পরিবর্তনের কথা একটু আলাদা ভাবে বলা প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে আমার হাতে এসেছে একটা আইফোন। গত বছরখানেক আগে এই ফোনটা কেনার পর থেকে আমি ধীরে ধীরে আমার টেকনো-বিদ্বেষ ভুলতে শুরু করেছি। কিভাবে একটা ফোন মানুষের এত কাছাকাছি থাকতে পারে ভেবে আমি খুবই আনন্দিত বোধ করি। আমি কি না করি? টর্চ লাইট থেকে শুরু করে ইয়েল লেকচার। মাঝে মাঝে কাজে যাওয়ার সময় ট্রেনে ছবি আঁকি, নোট করি। কতো ছোটো ছোটো চিন্তাকে আমি বৃক্ষে রুপান্তর করেছি আমি আমার আইফোনে তার ইয়ত্তা নেই। শুধু আই ফোনের জন্য আমি স্টিভ জবস এর ভক্ত ব্যাপারটা সেরকম নয়। এই লোকটির স্বপ্ন আমাকে বিমহিত করে। বারাক ওবামা বলেছেন এই লোকটি স্বপ্ন দেখেছেন, সাহস নিয়ে স্বপ্নকে তাড়া করেছেন, এবং তার সক্ষমতা দিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন। আমার মতো অনেকে আছেন যারা খুব স্বপ্ন দেখেন কিন্তু কখনই তাড়া করেন না সাহসের অভাবে। আমি যেখানে সীমাবদ্ধ, ঠিক সেইজায়গাতেই আমি স্রদ্ধাবনত। এই জন্যই জবসকে আমি প্রানভরে শ্রদ্ধা করি। এই একই কারনে আমার বুক ফেটে যায়, মনে হয় আমার অতি পরিচিত কোন বন্ধু যে আমার চেয়ে অনেক বেশি সাহসী, অকালে মারা গেছেন।

এই মৃত্যু কষ্টের!