ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

খবরে প্রকাশ, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখবে সরকার। এই সম্পর্কে দুই একটি কথা না বলে পারছি না। সরকারের সামনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন ও এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের মতো এত বড় চ্যালেঞ্জ থাকতে ড: ইউনুসের বিরূদ্ধে তদন্ত করা এত জরুরী হয়ে পড়লো কেন? আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাই এর মূল কারণ।

ড: ইউনুসের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এত ক্ষোভ থাকার কারণগুলো খতিয়ে দেখাটা এখানে প্রাসঙ্গিক। অনেকে ধারণা করেন যে, ১/১১ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল গঠন করার ঘোষণা দিয়েই ড: ইউনুস প্রধানমন্ত্রীর বিরাগভাজন হন এবং প্রধানমন্ত্রী তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন। যদিও এই রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রচেষ্টার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড: ইউনুসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা শুরু করেন এবং অসংখ্যবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আক্রমণ করেন, তার ক্ষোভের মূল কারণ আরও অনেক গভীরে।

সম্ভবত, ড: ইউনুসের নোবেল জয় এবং বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঈর্ষান্বিত করে তোলে। তিনি এবং আওয়ামীলীগের কট্টরপন্থী অনুসারীদের ধারণা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অসামাণ্য অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধু্কেই বিশ্ববাসীর বেশি মর্যাদা দেয়া উচিৎ। প্রকৃতপক্ষে, ড: ইউনুসকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তুলনা করা চরম ভুল। ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেছিল। বাঙালি জাতির মনে বঙ্গবন্ধুর স্থান অনেক উপরে।

অন্যদিকে, ড: ইউনুস এক অনন্য বাঙালি যিনি বাংলাদেশকে সমগ্র বিশ্বে অন্য এক উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। অপছন্দনীয় হলেও বাস্তবতা হলো, উপমহাদেশের বাইরে বাংলাদেশ নামক দেশটিকে অনেকেই চেনেন না। যারা চেনেন তাদের মধ্যেও বেশিরভাগই বাংলাদেশকে একটি দরিদ্র ও বন্যাকবলিত দেশ হিসেবেই জানতেন। ড: ইউনুসের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশের পরিচিতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার নোবেল জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ভাল মানের কোনো বিজনেস স্কুল খুজে পাওয়া যাবে না যেখানে ক্ষুদ্র ঋণ সমন্ধে কারিকুলাম নেই। কয়েক বছর আগে ড: ইউনুসের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বিজনেস দুই জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে এমবিএ করার সুযোগ দিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি পৃথিবীর সেরা পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যেখানে পড়াশুনার সুযোগ পাওয়ার মতো মেধাবী এবং এর ব্যয়ভার বহন করার মতো সামর্থ্যবান বাংলাদেশে হাতে গোনা দুই একজন খুজে পাওয়াই কঠিন। যখন বিশ্বের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান (গুগল, ফোর্বস, ওয়াল স্ট্রিট জার্ণাল ইত্যাদি) ড: ইউনুসকে এহেন দুর্লভ সম্মাণ প্রদর্শন করে, কতিপয় আওয়ামীপন্থী এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী ঈর্ষা অনুভব করেন। ড: ইউনুসের নোবেল জয় এবং বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিচিতিই তার প্রতি প্রতিনিয়ত বিষোদগারের মূল কারণ। আওয়ামীপন্থীদের বিশ্বাস, তাদের নেত্রীরই নোবেল প্রাপ্য ছিল।

কথিত আছে, বাংলাদেশের কোন একজন প্রধানমন্ত্রী অনেক লবিয়িং এর পরেও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ পেতে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীতে অনেক কষ্টে সম্মেলনের বিরতিতে একটি ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে সমর্থ হন। একদিকে এক প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থা, অন্যদিকে অধ্যাপক ইউনুসকে হোআইট হাউসে ডেকে নিয়ে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমে ভূষিত করা হয়। আওয়ামী রাজনীতিকদের গোস্যার কারন মূলত এখানেই।

লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের সময় যখন ড: ইউনুসের প্রসঙ্গ উঠে আসে, তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অসংলগ্নভাবে ড: ইউনুসকে একহাত নেন। তিনি দাবি করেন, গ্রামীন ব্যাংক ৩০-৪০ শতাংশ সুদ গ্রহন করে, যা দরিদ্রদের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ায়। এ বিষয়ে গ্রামীন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যখন প্রকৃত তথ্য সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপন করে, তখন তার বক্তব্য যে তথ্য দ্বারা সমর্থিত নয় সেটি নগ্নভাবে প্রকাশ পায় এবং তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে যা পরবর্তীতে ড: ইউনুসের বিরূদ্ধে নতুনভাবে তদন্ত করার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে।

একটি ছোট ঘটনা বলে শেষ করছি। কয়েকমাস আগে আমার এক কানাডিয়ান সহকর্মী এক প্রশিক্ষণ সম্মেলনে জানতে পারে যে আমি একজন বাংলাদেশী। সে আমাকে বললো যে শুনেছি ড: ইউনুস আইনগত ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিশ্চয়ই নিরপরাধ, ঠিক? জবাব না দিয়ে আমি জানতে চাইলাম যে সে মুহম্মদ ইউনুসকে কিভাবে চেনে। সে বললো যে, ড: ইউনুস ইউনিভার্সিটি অব ভ্যানকুয়েবরে একবার বক্তৃতা দিয়েছিলেন যখন সে ওখানে ছাত্র ছিল। তখন তাকে প্রশ্ন করলাম সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে চেনে কিনা। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন, সে চেনে না। এথেকে প্রতীয়মান যে বহির্বিশ্ব ড: ইউনুস সমন্ধে বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ বিশ্বাস করে না। পরিশেষ বলতে চাই, ব্যক্তিগত আক্রোশ ত্যাগ করে ড: ইউনুসকে নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যেমন, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন, তত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌছাতে পারলেই দেশ ও জনগন বেশী উপকৃত হবে। ড: ইউনুসের বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক ব্র্যান্ড ইমেজকে দেশের কাজে লাগাতে মনোনিবেশ করাটাই হতো বুদ্ধিমানের কাজ। এ বিষয়ে সরকারের নীতি যত দ্রুত পরিবর্তন হবে ততই মঙ্গল। মনে রাখতে হবে, যারা বুদ্ধিমান তারা মাঝেমাঝে মত পরিবর্তন করেন, কারণ তারা তাদের ভুল বুঝতে পারেন এবং তা শোধরানোর চেষ্টা করেন; আর মূর্খ্যরা কখনোই তাদের মত পরিবর্তন করেনা।